চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশে গড় মূল্যস্ফীতি আরো বেড়ে ৯ শতাংশে পৌঁছতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)। এটি হবে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি। সদ্য সমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এ গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৭ শতাংশ। মূল্যস্ফীতি বাড়ার পূর্বাভাসের পাশাপাশি দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি কমার ইঙ্গিত দিয়েছে ম্যানিলাভিত্তিক আন্তর্জাতিক ঋণদাতা সংস্থাটি। এডিবির নতুন হিসাব অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমে ৪ শতাংশে নেমে আসতে পারে। এর আগে গত জুলাইয়ে দেয়া পূর্বাভাসে সংস্থাটি ৪ দশমিক ৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধির প্রাক্কলন করেছিল।
গতকাল এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট আউটলুকের (এডিও) হালনাগাদ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে এডিবি। এতে দেখা যায়, চলতি বছর শেষে মূল্যস্ফীতি হতে পারে ৯ শতাংশ। যদিও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যমতে আগস্টে মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৩১ শতাংশ। প্রতিবেশী দেশগুলোয় মূল্যস্ফীতি কমলেও বাংলাদেশে তা বাড়ছে। কয়েক বছর ধরে ৮ শতাংশের নিচে নামানো যায়নি। যদিও আগামী পাঁচ বছরে সরকার এ হার ৫ শতাংশে নিয়ে আসার পরিকল্পনা করছে।
এডিবির পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি অর্থবছর শেষে দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে বেশি মূল্যস্ফীতি হবে বাংলাদেশের। প্রতিবেশী দেশ ভারতের ৪ দশমিক ৫, পাকিস্তানের ৬ দশমিক ৪, শ্রীলংকার ৫ দশমিক ২, নেপালের ৩ দশমিক ৭, ভুটানের ৩ দশমিক ৯, মালদ্বীপের মূল্যস্ফীতি হবে ৫ শতাংশ। এমনকি যুদ্ধবিধস্ত আফগানিস্থানের অবস্থাও বাংলাদেশের চেয়ে ভালো অবস্থানে থাকবে বলে আশা করা হচ্ছে। পূর্বাভাস অনুযায়ী দেশটির মূল্যস্ফীতি বর্তমান সময়ের চেয়ে সামান্য বেড়ে ৪ দশমিক ৬ শতাংশে দাঁড়াতে পারে।
এডিবি ডেভেলপমেন্ট আউটলুকে বলছে, এল নিনোর প্রভাব, জ্বালানি সংকট, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি ও জাহাজ চলাচলে সম্ভাব্য বিঘ্নের কারণে পণ্যের দাম বাড়তে পারে। বিশ্ববাজারে জ্বালানি ও পণ্য পরিবহনের ব্যয় বাড়ায় আমদানি খরচও বেড়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে দেশের বাজারে। ধীরে ধীরে মুদ্রানীতি কিছুটা শিথিল করা এবং ব্যাংক খাতে তারল্য সহায়তা বাড়ানোর কারণেও মূল্যস্ফীতির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে বলে মনে করছে এডিবি। তবে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ধীরগতি ও ঋণের প্রবাহ কম থাকায় চাহিদা থেকে তৈরি মূল্যস্ফীতির চাপ কিছুটা কম থাকবে।
এডিবি আরো বলছে, বাংলাদেশে সম্প্রতি ডিজেল, অকটেন ও পেট্রলের খুচরা দাম বাড়ানো হয়েছে। এতে মূল্যস্ফীতির চাপ আরো বাড়ছে। সড়ক পরিবহন, পণ্য পরিবহন ও নৌযানের ভাড়াও এরই মধ্যে বাড়তে শুরু করেছে। এতে কৃষকের উৎপাদন খরচ এবং খাদ্য পরিবহনের ব্যয়ও বাড়ছে।
এদিকে মূল্যস্ফীতি বাড়লেও কমবে প্রবৃদ্ধি। পূর্বাভাসে এডিবি বলছে দেশের প্রবৃদ্ধি কমে ৪ শতাংশে দাঁড়াবে, যা ভারত ও ভুটানের তুলনায় পিছিয়ে। ২০২৬ সালের শুরুর দিকে জাতীয় নির্বাচন হওয়ার পর রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা কমেছে। ফলে অভ্যন্তরীণ ভোগ ও বিনিয়োগ শক্তিশালী হওয়ায় তার প্রতিফলন ঘটেছে প্রবৃদ্ধির এ ইতিবাচক পূর্বাভাসে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রবৃদ্ধিতে প্রধান ভূমিকা রাখবে সেবা ও কৃষি খাত। তবে চড়া সুদহার, ঋণের সীমিত সুযোগ, জ্বালানি সংকট, দুর্বল বৈশ্বিক চাহিদা ও অন্যান্য কাঠামোগত চ্যালেঞ্জের কারণে শিল্প ও বিনিয়োগ খাত কিছুটা চাপের মুখে থাকতে পারে। রেমিট্যান্সের ওপর ভর করে ব্যক্তিগত ভোগ ব্যয় প্রবৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করবে। যদিও উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা সংকুচিত হওয়া অব্যাহত থাকবে।