২০০৮ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত এমন কম প্রবাহের ২৭টি ঘটনার মধ্যে ১৫টিতেই বাংলাদেশের জন্য নির্ধারিত ন্যূনতম পানি ছাড়েনি ভারত। অর্থাৎ জরুরি প্রয়োজনের সময় ৫৫ দশমিক ৫ শতাংশ ক্ষেত্রেই চুক্তি অনুযায়ী পানির হিস্যা থেকে বঞ্চিত হয়েছে বাংলাদেশ। চুক্তিটির ৩০ বছরের মেয়াদ আগামী ডিসেম্বরে শেষ হচ্ছে। চুক্তি নবায়নের ক্ষেত্রে শুধু ফারাক্কা থেকে ছাড়া পানির হিসাব নয়, বাংলাদেশে বাস্তবে কত পানি পৌঁছেছে, সেটিও বিবেচনায় নেয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
নয়াদিল্লিভিত্তিক নীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইমপ্যাক্ট অ্যান্ড পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (আইএমপিআরআই) সাম্প্রতিক এক পর্যালোচনায় এসব তথ্য উঠে এসেছে। ‘রিভিজিটিং ইন্ডিয়া-বাংলাদেশ গঙ্গা ওয়াটার ট্রিটি (১৯৯৬)’ শিরোনামের পর্যালোচনাটি তৈরি করা হয়েছে বিভিন্ন গবেষণার তথ্যের ভিত্তিতে। এতে ২০০৮-১৬ সময়ে ফারাক্কা থেকে বাংলাদেশকে দেয়া পানির পরিমাণ নিয়ে গবেষণাগুলোর ফল বিশ্লেষণ করা হয়েছে। আইএমপিআরআই বলছে, গঙ্গার পানি নিয়ে দুই দেশের বিরোধ নিয়ন্ত্রণে চুক্তিটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশের হিস্যার পানি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে চুক্তিটির সাফল্য সীমিত।
কিম্বারলি এ থমাসের গবেষণা উদ্ধৃত করে আইএমপিআরআইয়ের পর্যালোচনায় বলা হয়, শুষ্ক মৌসুমে গঙ্গার প্রবাহ কমে গিয়ে বাংলাদেশে পানির প্রয়োজন যখন সবচেয়ে বেশি ছিল, তখনই অধিকাংশ ক্ষেত্রে চুক্তি অনুযায়ী ন্যূনতম পানি ছাড়েনি ভারত। ২০০৮ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত এমন কম প্রবাহের ঘটনা ঘটেছে ২৭ বার। এর মধ্যে ১৫ বারই নির্ধারিত ন্যূনতম পানি পায়নি বাংলাদেশ। অথচ নদীতে পানির প্রবাহ স্বাভাবিক থাকা এবং বাংলাদেশের জরুরি প্রয়োজন না থাকার সময়ে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই চুক্তির পানি বণ্টন সূচি অনুসরণ করেছে ভারত। কোনো কোনো সময় নির্ধারিত পরিমাণের চেয়ে বেশিও পানি ছাড়া হয়েছে। ফলে পর্যালোচনাটির মূল্যায়ন, চুক্তির মূল দুর্বলতা সামগ্রিক পানি বণ্টনে নয়; বরং বাংলাদেশের প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি থাকার সময় ন্যূনতম পানি নিশ্চিত করতে না পারায়।
‘ওয়াটার পলিসি’ জার্নালে প্রকাশিত ‘আ ক্রিটিক্যাল রিভিউ অব দ্য গঙ্গাস ওয়াটার শেয়ারিং অ্যারেঞ্জমেন্ট’ শীর্ষক গবেষণার তথ্যও আইএমপিআরআইয়ের পর্যালোচনায় তুলে ধরা হয়েছে। ১৯৯৭ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত ফারাক্কা থেকে ছাড়া পানি এবং বাংলাদেশের হার্ডিঞ্জ ব্রিজে পৌঁছানো পানির পরিমাণ তুলনা করা হয় ওই গবেষণায়। পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, চুক্তি অনুযায়ী প্রতি ১০ দিনের পানিপ্রবাহ আলাদাভাবে হিসাব করা হয়। ১৯৯৭ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত এমন ৩০০টি হিসাবের মধ্যে ৩১ শতাংশ সময় হার্ডিঞ্জ ব্রিজে প্রত্যাশার চেয়ে কম পানি পাওয়া গেছে। পানির ঘাটতি সবচেয়ে বেশি ছিল শুষ্ক মৌসুমে—১১ মার্চ থেকে ১০ মে পর্যন্ত। এ সময়ের ১২০টি হিসাবের মধ্যে ৫২টিতেই প্রত্যাশিত পানি পাওয়া যায়নি। ঘাটতির হার ছিল ৪৩ শতাংশ। আর বাংলাদেশের জন্য ৩৫ হাজার কিউসেক পানি নিশ্চিত থাকার কথা ছিল এমন ৬০টি হিসাবের মধ্যে ৩৯টিতেই প্রত্যাশিত পানি হার্ডিঞ্জ ব্রিজে পৌঁছেনি। এক্ষেত্রে ঘাটতির হার ৬৫ শতাংশ। ফারাক্কা ও হার্ডিঞ্জ ব্রিজের মধ্যবর্তী স্থানে পানি প্রত্যাহার, উপনদীর প্রবাহ, নদীর গতিপথ ও গঠনগত পরিবর্তন এবং পানি পরিমাপে সীমাবদ্ধতার কারণেও দুই স্থানের হিসাবে পার্থক্য হতে পারে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
বাংলাদেশ ও ভারত ১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি সই করে। এতে প্রতি বছর ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ মে পর্যন্ত শুষ্ক মৌসুমে ফারাক্কা পয়েন্টের পানি দুই দেশের মধ্যে ভাগ করার নিয়ম রয়েছে। প্রতি ১০ দিনের প্রবাহ হিসাব করে পানির ভাগ নির্ধারণ করা হয়। চুক্তি অনুযায়ী, ফারাক্কায় পানির প্রবাহ ৭০ হাজার কিউসেক বা তার কম হলে বাংলাদেশ ও ভারত সমান ভাগ পাবে। প্রবাহ ৭০ থেকে ৭৫ হাজার কিউসেকের মধ্যে থাকলে বাংলাদেশ পাবে ৩৫ হাজার কিউসেক, অবশিষ্ট পানি পাবে ভারত। আর প্রবাহ ৭৫ হাজার কিউসেকের বেশি হলে ভারত পাবে ৪০ হাজার কিউসেক এবং বাকি পানি পাবে বাংলাদেশ। ১১ মার্চ থেকে ১০ মে পর্যন্ত সময়কে সবচেয়ে সংকটপূর্ণ বা খরার সময় হিসেবে ধরা হয়েছে। এ সময়ে পর্যায়ক্রমে উভয় দেশের জন্য ৩৫ হাজার কিউসেক পানি নিশ্চিত রাখার কথা বলা হয়েছে। কোনো ১০ দিনে ফারাক্কায় প্রবাহ ৫০ হাজার কিউসেকের নিচে নেমে গেলে দুই দেশকে জরুরি আলোচনায় বসার বিধানও রয়েছে।
৩০ বছর মেয়াদি চুক্তিটি চলতি বছরের ডিসেম্বরে শেষ হবে। আইএমপিআরআই চুক্তি নবায়নের ক্ষেত্রে স্বাভাবিক সময়ের পাশাপাশি খরা ও কম প্রবাহের সময় পানি বণ্টনের সুস্পষ্ট নিয়ম রাখার সুপারিশ করেছে। গঙ্গার প্রবাহ কতটা কমলে দুই দেশ জরুরি আলোচনায় বসবে, কী তথ্য বিনিময় করবে, কত সময়ের মধ্যে সিদ্ধান্ত নেবে এবং দীর্ঘস্থায়ী সংকটে কম পানি কীভাবে ভাগ হবে—এসব আগেই নির্ধারণ করতে বলেছে প্রতিষ্ঠানটি। এর লক্ষ্য হবে সংকটপূর্ণ সময়ে ন্যায্যতা বজায় রেখে কোনো দেশ যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।
প্রতিষ্ঠানটি বলেছে, বর্তমান চুক্তির পানি বণ্টন সূত্র ১৯৪৯-৮৮ সালের প্রবাহের তথ্যের ওপর তৈরি। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এখন বৃষ্টিপাত, হিমবাহ গলন ও শুষ্ক মৌসুমের প্রবাহে পরিবর্তন এসেছে। তাই পুরনো হিসাবের সঙ্গে সাম্প্রতিক প্রবাহ, হালনাগাদ নদী অববাহিকা মডেল ও জলবায়ু ঝুঁকির তথ্য যুক্ত করে একটি পরিবর্তনশীল বণ্টন ব্যবস্থা চালু করতে হবে। নির্দিষ্ট সময় পরপর তথ্য ও বণ্টন সূত্র পর্যালোচনার বিধানও রাখতে হবে।
ফারাক্কা থেকে কত পানি ছাড়া হয়েছে, শুধু সেই হিসাবের ভিত্তিতে চুক্তি বাস্তবায়ন মূল্যায়ন না করার পরামর্শ দিয়েছে আইএমপিআরআই। হার্ডিঞ্জ ব্রিজ দিয়ে বাংলাদেশে বাস্তবে কত পানি পৌঁছেছে, সেটিও বিবেচনায় নিতে বলেছে প্রতিষ্ঠানটি। তবে এ হিসাবের ক্ষেত্রে মধ্যবর্তী স্থানে পানি প্রত্যাহার, উপনদীর প্রবাহ, নদীর গঠনগত পরিবর্তন ও পরিমাপের সীমাবদ্ধতার প্রভাব সমন্বয় করতে হবে।
দুই দেশের যৌথ ব্যবস্থাপনায় একটি রিয়েল টাইম ডিজিটাল তথ্যভাণ্ডার তৈরির সুপারিশও করা হয়েছে। সেখানে ফারাক্কা ও হার্ডিঞ্জ ব্রিজের পানিপ্রবাহের পাশাপাশি বৃষ্টিপাত, নদীর পানির উচ্চতা এবং পানি ছাড়ার যাচাইকৃত তথ্য প্রকাশ করতে হবে। পরিমাপের যন্ত্র যৌথভাবে পরীক্ষা এবং দুই দেশের হিসাবে অমিল দেখা দিলে তা সমাধানের অভিন্ন পদ্ধতিও নির্ধারণ করতে হবে।
গঙ্গার শুষ্ক মৌসুমের প্রবাহে প্রভাব ফেলতে পারে এমন বড় বাঁধ, অবকাঠামো বা পানি প্রত্যাহার প্রকল্প গ্রহণের আগে অন্য দেশকে জানানোর বাধ্যবাধকতা রাখার কথা বলেছে প্রতিষ্ঠানটি। এ ধরনের প্রকল্প নেয়ার আগে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা করতে হবে, যাতে এক দেশের সিদ্ধান্তে অন্য দেশের পানিপ্রাপ্তি ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।
চুক্তি নবায়নে শুধু পানি ভাগের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রাখার পরামর্শও দিয়েছে আইএমপিআরআই। এতে লবণাক্ততা, মৎস্যসম্পদ, পলি পরিবহন, পানির মান ও নদীর স্বাভাবিক পরিবেশ বজায় রাখতে প্রয়োজনীয় ন্যূনতম প্রবাহের সূচক যুক্ত করতে হবে। এসব সূচক দুই দেশকে যৌথভাবে পর্যবেক্ষণ ও নির্দিষ্ট সময় পরপর পর্যালোচনা করতে হবে।
এছাড়া গঙ্গা-পদ্মা নদী ব্যবস্থার সামগ্রিক ব্যবস্থাপনাকে নতুন চুক্তির আওতায় আনার প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। পানি বণ্টনের পাশাপাশি বন্যার পূর্বাভাস, নৌ-চলাচল, দূষণ নিয়ন্ত্রণ ও নদী পুনরুদ্ধারে দুই দেশের সহযোগিতা বাড়াতে হবে। আইএমপিআরআইয়ের মতে, চুক্তি নবায়ন যেন শুধু বর্তমান ব্যবস্থার মেয়াদ বাড়ানোর দলিল না হয়ে জলবায়ু পরিবর্তন ও ভাটির মানুষের প্রয়োজন বিবেচনায় নেয়া একটি সমন্বিত নদী ব্যবস্থাপনা কাঠামো হওয়া প্রয়োজন।