বাংলাদেশের মানুষের মাথাপিছু প্রাইমারি এনার্জি ব্যবহার ৩ হাজার ৪৮ কিলোওয়াট-ঘণ্টা (২০২৪)। আর বিদ্যুতের ব্যবহার বছরে মাথাপিছু ৬৬১ কিলোওয়াট-ঘণ্টা (২০২৪-২৫ অর্থবছর)। উন্নত দেশের বিবেচনায় তো বটেই সমআকারের অর্থনীতির দেশগুলোর তুলনায়ও বাংলাদেশীদের এ জ্বালানি-বিদ্যুৎ ব্যবহারের পরিমাণ বেশ কম। কিন্তু এর সংস্থান করতেই সরকারের রাজস্ব ব্যয়ের এক-তৃতীয়াংশ চলে যাচ্ছে। জ্বালানির আমদানি ব্যয় মেটাতে ভোক্তার ওপর দামের চাপ বাড়ানো হচ্ছে। আমদানিনির্ভর নীতি অনুসরণ করতে গিয়ে পেট্রোবাংলার আর্থিক সক্ষমতা নাজুক। অন্যদিকে চাহিদা না থাকলে গত ১৫ বছরে ক্রমান্বয়ে বাড়ানো হয়েছে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা। বাড়তি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ক্যাপাসিটি চার্জ মেটাতে অর্থের সংকুলান করতে পারছে না বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি)। এ অর্থের জন্য তাদের নির্ভর করতে হচ্ছে সরকারের ওপর। এ ধরনের আমদানিনির্ভর ও ভুল নীতি অনুসরণ করতে গিয়ে অর্থনীতিতে ব্যবসা-বাণিজ্যের ব্যয় ক্রমাগতভাবে বাড়ছে। এতে উদ্যোক্তারা বিনিয়োগ করে ভোগান্তিতে পড়ছেন, নতুন বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হচ্ছে। অন্যদিকে ভোক্তাকে ক্রমাগতভাবে মূল্যবৃদ্ধির চাপে পড়তে হচ্ছে। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী সরকার জ্বালানি খাতে যে বকেয়ার চাপ রেখে গিয়েছিল, অন্তর্বর্তী সরকারও সেই বকেয়ার চাপ থেকে বের হতে পারছে না। ফলে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের ভুল নীতি দেশের অর্থনীতির জন্য বড় চাপ তৈরি করেছে বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।
তাদের ভাষ্যমতে, অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর প্রায় দেড় বছর অতিবাহিত হতে চলেছে। অথচ বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে আর্থিক চাপ সেই অর্থে কমানো যায়নি। গ্রাহকের প্রত্যাশা ছিল সরকার আমদানিনির্ভরতা, দুর্নীতি-অনিয়ম, পদ্ধতিগত সংস্কার করে এ খাতে ব্যয় সাশ্রয়ের পথ তৈরি করবে। কিন্তু আইনগত কিছু সংস্কার হলেও বড় আকারে আর্থিক সাশ্রয়ের পথ তৈরি করতে পারেনি অন্তর্বর্তী সরকার। এছাড়া অতীতে এ খাতে যেসব অসংগতি ও অনিয়ম, দুর্নীতি হয়েছে, সেগুলোর বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেয়ার উদাহরণও দেখা যাচ্ছে না।
দেশের বিদ্যুৎ খাত উন্নয়নে ২০১০ সালে প্রথম মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন করে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকার। এ পরিকল্পনার সাত বছর পর গ্যাস খাতের মহাপরিকল্পনায় ‘গ্যাস সেক্টর মাস্টার প্ল্যান-২০১৭’ প্রণয়ন করা হয়। দুটি মহাপরিকল্পনার মাধ্যমে দেশে জ্বালানি সরবরাহে স্থানীয় ও টেকসই ব্যবস্থাপনা তৈরি হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বাস্তবে এগুলো বাস্তবায়ন করতে গিয়ে দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বিপুল পরিমাণ দায়-দেনা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে বিদ্যুতের বাড়তি সক্ষমতা তৈরি, প্রাক্কলন অনুযায়ী বিদ্যুতের ব্যবহার না বাড়া, গ্যাস সংকটে জ্বালানি আমদানি বাড়িয়ে অর্থের সংকট কাটাতে বছরের পর বছর গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে। আর এ বাড়তি দামের অর্থ গেছে ভোক্তার পকেট থেকে। বিশেষজ্ঞরা এ নীতি ও পরিস্থিতির সমালোচনা করছেন অনেক দিন ধরে। অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর প্রত্যাশা ছিল বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি কাঠামোগত সংস্কারের। যার মাধ্যমে এ খাতের টেকসই ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি দেশের আর্থিক খাতের ওপর চাপও কমিয়ে আনার সুযোগ ছিল বলে মনে করেন জ্বালানি খাতসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।
দেশের অর্থনীতিতে সবচেয়ে বড় চাপ এখন বিদ্যুৎ ও জ্বালানির আমদানি। প্রতি বছর চাহিদা মেটাতে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি তেল আমদানি করা হচ্ছে। দেশে প্রতি বছর যে পরিমাণ বিদ্যুৎ ও জ্বালানি আমদানি করা হচ্ছে তা জাতীয় বাজেটের প্রায় ১৯ শতাংশ। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ঠিক কী পরিমাণ জ্বালানি তেল আমদানি হবে তার চূড়ান্ত হিসাব এখনো করা হয়নি। তবে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) ২০২৪-২৫ অর্থবছরে অন্তত ৭৬ হাজার কোটি টাকার জ্বালানি তেল আমদানি করেছে। বিপুল পরিমাণ এ আমদানিতে বড় সুযোগ ছিল দামে। কিন্তু দেশের মজুদ সক্ষমতা ও রিফাইনারি না থাকায় আমদানিতে আন্তর্জাতিক কোনো সুবিধা নেয়া যাচ্ছে না। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম ডব্লিউটিআই (ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট) ৬০ ডলারের নিচে, যা বিগত পাঁচ বছরের তুলনায় সবচেয়ে কম। কিন্তু দেশে রিফাইনারি ও মজুদ সক্ষমতা পর্যাপ্ত না থাকায় এ সুযোগ কাজে লাগানো যাচ্ছে না। যে কারণে বেশি দামে পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি করে বাজারে সমন্বয় করা হচ্ছে। এতে ভোক্তা পর্যায়ে জ্বালানি তেলের দাম কমছে না।
দেশে গ্যাসের সংকট চলছে দীর্ঘদিন ধরে। শিল্প খাত গ্যাসনির্ভর হলেও গ্যাস সংকটের কারণে উৎপাদন কমেছে। বিশেষ করে বস্ত্র শিল্পের উৎপাদন। ব্যবসায়ীরা বলছেন, বিগত সরকার শিল্পে গ্যাসের দাম বাড়িয়েছিল নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ দেবে এমন নিশ্চয়তায়। কিন্তু সেটা তারা দিতে পারেনি। অন্তর্বর্তী সরকারও মেটাতে পারেনি শিল্পে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহের প্রত্যাশা।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘শিল্প খাতে আমাদের অতীতে যে প্রধান সমস্যা ছিল তা হলো গ্যাস সংকট। অতীতের সরকার বিভিন্ন সময় নিরবচ্ছিন্নভাবে গ্যাস দেয়ার কথা বলে দাম বাড়িয়েছে। শিল্পমালিকরা দাম দিয়েছেন। অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে প্রত্যাশা ছিল শিল্পে গ্যাস নিয়ে অনিয়ম-দুর্নীতি ও ঘুস লেনদেন কমানো। কিন্তু সংস্কার বলতে এ খাতে আমরা শুধু শ্রম সংস্কারটা দেখলাম। গ্যাস সংকটের কারণে কারখানার উৎপাদন ৩৫-৪০ শতাংশ কমে গেছে। এটি কীভাবে বাড়ানো যায়, তার প্রধান অন্তরায় গ্যাস। সেটির সরবরাহ নিশ্চিত ছিল বড় প্রত্যাশা, তা হয়নি।’
দেশে গ্যাস খাতে বহু বছর ধরে সংকট কাটানোর কথা বলা হলেও সেটি করা যায়নি। বরং দাম বাড়িয়ে শিল্প খাতকে আরো চাপের মধ্যে ফেলা হয়েছে। প্রিমিয়ার সিমেন্ট মিলস পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমিরুল হক এ প্রসঙ্গে বণিক বার্তাকে বলেন, ‘গ্যাসের দাম বাড়ানোকে সহজ সমাধান হিসেবে দেখা হয়, কিন্তু তার বিপরীতে শিল্প-কারখানায় সরবরাহ সংকট আরো তীব্র হয়েছে। বহু বছর ধরে একই প্রতিশ্রুতি থাকলেও বাস্তবে ঘটে চলেছে উল্টোটা। পরিকল্পনার ঘাটতি তো আছেই, এছাড়া নানান ভুল কৌশলের কারণে আজ শিল্প খাতে ভয়াবহ অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।’
দেশের বিদ্যুৎ খাতে পরিকল্পনায় ছিল বিদ্যুতের উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি। বছরভিত্তিক বিদ্যুতের উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো হয়েছিল চাহিদা তৈরি হবে বিবেচনায়। কিন্তু দেখা গেছে, প্রাক্কলন অনুযায়ী বিদ্যুতের চাহিদা তৈরি হয়নি। কিন্তু সক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে। বর্তমানে বিদ্যুতের মোট সক্ষমতা (অনগ্রিড-অফগ্রিড) ২৮ হাজার ৯৪৯ মেগাওয়াট। অথচ তীব্র বিদ্যুৎ চাহিদায় উৎপাদন হয়েছে ১৬ হাজার ৭৯৪ মেগাওয়াট। অতিরিক্ত সক্ষমতার কারণে বিদ্যুৎ কেন্দ্র বসিয়ে রেখে বছরের পর বছর ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হয়েছে। ২০০৯-১০ অর্থবছর থেকে ২০২৩-২৪ অর্থবছর পর্যন্ত অন্তত ১ লাখ ৩৩ হাজার ৩৭৭ কোটি টাকা ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হয়েছে। এ খাতের উদ্যোক্তাদের অনেকেই কেন্দ্র না চালিয়ে অর্থ তুলে নিয়েছে। বিদ্যুৎ খাতের সরকারকে ১৬ বছরে ভর্তুকি দিতে হয়েছে ২ লাখ ৩৭ হাজার ৫৮৫ কোটি টাকা।
দেশের বিদ্যুৎ খাতে জ্বীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমিয়ে নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের উৎপাদন বাড়ানোর পরিকল্পনা কথা বলা হচ্ছে। বিগত সরকারের সময়ে সেই চেষ্টা ছিল খাতাকলমে। যে কারণে এখন পর্যন্ত জ্বীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার বিদ্যুৎ খাতে সবচেয়ে বেশি। অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর বিদ্যুৎ খাতে প্রতিযোগিতা বাড়াতে বিশেষ আইন বাতিল করে দেয়। এ আইনের আওতায় যেসব বিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রাথমিক অনুমোদন দেয়া হয়েছিল তা বাতিল হয়ে যায়। উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে পুনরায় নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের প্রকল্প বাড়ানোর কথা বলা হলেও নতুন দরপত্রে কেউ আগ্রহ দেখাচ্ছে না। এর ফলে নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের অগ্রগতি শ্লথ হয়ে যায়। জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন সরকারের উচিত ছিল এ খাতে কৌশল অবলম্বন করে দ্রুত ও স্পষ্ট নীতি প্রণয়নের মাধ্যমে অগ্রসর হওয়া, যা তারা করতে পারেনি। দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে আর্থিক চাপ না কমানোর পেছনে মূলত দায়ী প্রাথমিক জ্বালানি আমদানি কমাতে না পারা এবং এ খাতের কাঠামোগত সংস্কার না হওয়া।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত সংস্কারের মধ্য দিয়ে এ খাতের আর্থিক চাপ কমে গেছে এমনটি মনে করছি না। এ খাতের সামগ্রিক চাপের মধ্যে রয়েছে প্রাথমিক জ্বালানি আমদানি। অন্যদিকে স্থানীয় জোগান বাড়ানো যায়নি। সরকার যেটি করতে পেরেছে তা হলো কিছু আইনগত সংস্কার, বকেয়া পরিশোধ ও কৃচ্ছ্রসাধন। তার মধ্য দিয়ে যে এ খাতের বড় কোনো পরিবর্তন হয়েছে বিষয়টি এমন নয়।’
দেশের বিদ্যুৎ খাত সংস্কারে বিদেশী দাতা সংস্থাগুলোর কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক ঋণ নেয়া হয়েছে। বিশেষ করে মাতারবাড়ী ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট কয়লাবিদ্যুৎ কেন্দ্র, রূপপুর, রামপাল, পায়রার মতো বৃহৎ বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণে। এসব ঋণের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ অনিয়ম-দুর্নীতি করে সরিয়ে নেয়ার অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া আদানির বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণে অনিয়ম-দুর্নীতি হয়েছে এমন অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এসব অনিয়ম তদন্তে কমিটি গঠন করা হলেও ব্যবস্থা নেয়ার ক্ষেত্রে অন্তর্বর্তী সরকার দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি এখনো দেখাতে পারেনি।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর এ খাতের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল আর্থিক দায়-দেনা।অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বিগত সরকার অন্তত ৩ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারের বকেয়া রেখে গিয়েছিল, যা এখন ৬০০ মিলিয়নের মধ্যে চলে এসেছে। এসব বকেয়ার অর্থ নিয়েও বড় ধরনের সমালোচনা ছিল। অন্তর্বর্তী সরকার পরিশোধ করে এ খাতের দায়-দেনা কমিয়ে আনলেও আদতে যে পরিমাণ অর্থ কোম্পানিগুলো পাচ্ছে, তা কতটুকু যৌক্তিক সেটা খতিয়ে দেখার সুযোগ ছিল। কিন্তু করা হয়নি।
বর্তমানে বিদেশী দায় পরিশোধ হলেও এ খাতে আবার স্থানীয় বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর কাছে বকেয়ার পরিমাণ ২৭ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে।
দেশের জ্বালানি চাহিদার বড় অংশই এখন আমদানিনির্ভর। বিশেষ করে গ্যাস খাতে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ এলএনজি আমদানি করা হচ্ছে। স্থানীয় গ্যাসের উত্তোলন অনুসন্ধানে বড় বিনিয়োগ করে পর্যায়ক্রমে এলএনজি আমদানি কমানোর চেষ্টার কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু দেখা গেছে, ক্রমান্বয়ে স্থানীয় জ্বালানি চাহিদার বিপরীতে এলএনজি আমদানি করা হচ্ছে। ২০১৮-১৯ থেকে ২০২৫-২৬ এই আট অর্থবছরে এলএনজি আমদানি ২ লাখ ৫৬ হাজার কোটি টাকা। বিপুল পরিমাণ অর্থ এলএনজি আমদানিতে ব্যয় করার কারণে দেশ থেকে বৈদেশিক মুদ্রা চলে গেছে, যা পেট্রোবাংলাকে আর্থিকভাবে পঙ্গু করেছে।
দেশের জ্বালানি খাতের সামঞ্জস্যহীন পরিকল্পনার কারণে একদিকে যেমন বিদ্যুতের সক্ষমতা বেড়েছে, অন্যদিকে গ্যাসের সংকট তৈরি হয়েছে। বিদ্যুৎ কেন্দ্রে গ্যাস দিতে না পারায় বছরের পর বছর বসিয়ে রেখে কেন্দ্রগুলোকে ভাড়া দিতে হয়েছে বিপিডিবির। আর তা করতে গিয়ে আর্থিকভাবে সংকটে পড়ে এককভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বিপিডিবি। বর্তমানে বিশেষ আইন স্থগিত হলেও আওয়ামী লীগের সময় অনুমোদন হওয়া বিদ্যুৎ প্রকল্পগুলো বাতিল করা যায়নি। যে কারণে আগামী ২০২৮ সালের মধ্যে আরো অন্তত ৭ হাজার ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কেন্দ্র উৎপাদনে আসছে। যদিও এ সময়ে কিছু বিদ্যুৎ কেন্দ্র অবসরে যাবে। তবে যেসব কেন্দ্র উৎপাদনে আসবে তার বেশির ভাগই কয়লা ও গ্যাসভিত্তিক। কেন্দ্রগুলোর জন্য আগামীতে কীভাবে গ্যাস দেয়া যাবে তা নিয়ে এখনো কোনো পথরেখা দেখা যায়নি।
দেশের বিদ্যুৎ খাত সচল রাখতে গিয়ে বিগত কয়েক বছর দেশের সার কারখানাগুলো ঠিকমতো উৎপাদন করতে পারেনি। স্থানীয় উৎপাদন না হওয়ায় বিদেশ থেকে বিপুল পরিমাণ সার আমদানি করতে হয়েছে। এখন সরকার সার কারখানায় গ্যাস দেয়ার কথা বলে ইউনিটপ্রতি ১৩ টাকার বেশি দাম বাড়িয়েছে। অথচ সুনির্দিষ্ট ও পরিকল্পিতভাবে অনেকগুলো অদক্ষ গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র অবসরে দিয়ে এসব সার কারখানায় গ্যাসের সরবরাহ বৃদ্ধির পথ খোঁজার সুযোগ ছিল বলে মনে করেন খাতসংশ্লিষ্টরা।
মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের (এমজিআই) চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোস্তফা কামাল বণিক বার্তাকে বলেন, ‘কুমিল্লা অর্থনৈতিক অঞ্চলে আমরা ৬০ কোটি ডলারেরও বেশি বিনিয়োগ করেছি। শুধু আমরা নই, আরো অনেক স্থানীয় ও বিদেশী উদ্যোক্তা বিশাল অংকের অর্থ লগ্নি করার জন্য যোগাযোগ করছেন আমাদের সঙ্গে কিন্তু গ্যাস সরবরাহের নিশ্চয়তা না পেয়ে আর অগ্রসর হচ্ছেন না। বছরের পর বছর পেরিয়ে গেলেও গ্যাস-বিদ্যুতের মতো মৌলিক অবকাঠামোই এখনো নিশ্চিত হয়নি। একটি অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগের অর্থ হলো সরকার প্রয়োজনীয় ইউটিলিটি সরবরাহের দায়িত্ব নেবে। এটাই ছিল সরকারের পক্ষ থেকে কমিটমেন্ট। বাস্তবে যদিও সেই প্রতিশ্রুতি পূরণ হয়নি। আমরা একদিকে বিদেশী বিনিয়োগ আহ্বান করছি, অন্যদিকে নিজ দেশের উদ্যোক্তারাই জ্বালানি সংকটে নাজেহাল অবস্থায় আছেন। গ্যাস ও বিদ্যুতের অনিশ্চয়তার কারণে কারখানার উৎপাদন শুরু করা যাচ্ছে না, অথচ প্রকল্পে নেয়া ঋণের সুদ প্রতিনিয়ত জমছে। এ আর্থিক ক্ষতি আমরা কীভাবে সামাল দেব?’
বিদ্যুতের উৎপাদন বাড়ানো হলেও দুর্বল সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থাপনার কারণে অনেক অঞ্চলে বিদ্যুৎ বিতরণ করা এখনো চ্যালেঞ্জ। এসব জায়গায় বিদ্যুৎ সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন করা গেলে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প গড়ে উঠত। তাতে আর্থিক প্রবৃদ্ধি তৈরি হতো। বিদ্যুৎ খাতে সরকারের রাজস্ব বাড়ত। কাঠামোগত পরিকল্পনায় এসব করার সুযোগ ছিল।
যদিও সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে আইনগত ও পদ্ধতিগত অনেকগুলো সংস্কার করা হয়েছে। আরো করার সুযোগ রয়েছে। এ খাতের জন্য সমন্বিত রূপরেখা করা হচ্ছে, যা আগামীতে এ খাতকে টেকসই ও আর্থিকভাবে স্থিতিশীলতা এনে দেবে বলে মনে করেন সরকারের শীর্ষ কর্তাব্যক্তিরা।
বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বিগত সরকার যেসব পরিকল্পনা নিয়েছিল, তার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন ছিল। যে কারণে এ খাতে বিপুল পরিমাণ দায়-দেনা তৈরি হয়েছে। আমরা যখন এসেছিলাম তখন এ খাতে ৩ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারের বকেয়া দায় ছিল, যা এখন ৫০০-৬০০ মিলিয়নে নেমে এসেছে। এখন এ খাত সংস্কারের জন্য আমরা সমন্বিত বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মহাপরিকল্পনা করছি। এ পরিকল্পনা আমরা নিজেরাই করছি। যেখানে দেশী-বিদেশী বিশেষজ্ঞদের মতামত নেয়া হবে। আগামী মাসের ১৫ তারিখে প্রধান উপদেষ্টার সামনে এ পরিকল্পনা উপস্থাপন করা হবে। আমরা দেখাতে চাই কী অবস্থায় বিদ্যুৎ, জ্বালানি খাত পেয়েছিলাম। এখন কী অবস্থায় আছে এবং আগামীকে কোন দিকে যাবে। সুনির্দিষ্ট একটা পথরেখা আমরা তৈরি করে যেতে চাই। যাতে আগামী সরকার সেই পথরেখা অনুযায়ী কাজ করতে পারে। অনেকগুলো জায়গায় (বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে) সংস্কার এরই মধ্যে করা হয়েছে। সবগুলো যেহেতু করতে পারব না, তবে কোথায় কোথায় করা দরকার তার একটা রূপরেখা থাকবে।’
অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির বিশেষ আইন স্থগিত করেছে। এছাড়া নির্বাহী আদেশ বাতিল করে গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম নির্ধারণের ক্ষমতা বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনকে (বিইআরসি) ফিরিয়ে দিয়েছে। আওয়ামী লীগ আমলে করা বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের বিশেষ আইনের আওতায় হওয়া চুক্তিগুলো পর্যালোচনার জন্য জাতীয় কমিটি করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের কোম্পানিগুলোয় চেয়ারম্যান হিসেবে সচিবদের সরিয়ে দেয়ার কাঠামোগত পরিবর্তনও আনা হয়। এছাড়া বেসরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের, বিশেষত ফার্নেস অয়েল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ট্যারিফ পর্যালোচনার উদ্যোগও নেয়া হয়। একই সঙ্গে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে নেয়া গ্যাস অনুসন্ধানে ১০০ কূপ খননের পরিকল্পনা এ সরকার বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে।