দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় গবেষণার সংখ্যা বাড়ানোর প্রবণতায় ‘গবেষণা প্রকাশ করো, নইলে পিছিয়ে পড়বে’ সংস্কৃতি তৈরি হচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ। তিনি বলেছেন, পদোন্নতিতে গবেষণার সংখ্যার বদলে মানকে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) ব্যবহার নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় স্পষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন জরুরি।
ব্র্যাক ইউনিভার্সিটিতে আজ ‘অ্যাকাডেমিক অ্যান্ড রিসার্চ ইন্টিগ্রিটি কনক্লেভ ২০২৬’ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
ইউজিসি চেয়ারম্যান বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে কোন কাজে এআই ব্যবহার করা যাবে, কোথায় ব্যবহার করা যাবে না এবং কোথায় এআই ব্যবহারের বিষয়টি জানাতে হবে—নীতিমালায় তা স্পষ্ট করতে হবে। এআই ব্যবহারে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে ‘এআই ডিসক্লোজার স্টেটমেন্ট’ চালুরও পরামর্শ দেন তিনি। এতে কোন এআই টুল কী কাজে ব্যবহার করা হয়েছে এবং এআই থেকে পাওয়া তথ্য কীভাবে যাচাই করা হয়েছে, তা উল্লেখ থাকবে।
এআইয়ের যুগে বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল্যায়ন পদ্ধতিতেও পরিবর্তন আনার ওপর গুরুত্ব দেন অধ্যাপক মামুন আহমেদ। শুধু এআই শনাক্তকারী সফটওয়্যারের ওপর নির্ভর না করে শিক্ষার্থীর নিজস্ব শেখা, চিন্তা ও কাজের প্রক্রিয়া মূল্যায়নের পরামর্শ দেন তিনি।
এ ক্ষেত্রে মৌখিকভাবে কাজের ব্যাখ্যা নেয়া, গবেষণার খসড়া ও নথি সংরক্ষণ, মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ এবং বাস্তব সমস্যা সমাধানের মতো পদ্ধতি চালুর কথা বলেন তিনি।
এআই ও একাডেমিক অসততা মোকাবেলায় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য চারটি পদক্ষেপের প্রস্তাব দেন ইউজিসি চেয়ারম্যান। এগুলো হলো—এআই ব্যবহারে স্পষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন, পদোন্নতিতে গবেষণার সংখ্যার পরিবর্তে মানকে গুরুত্ব দেয়া, গবেষণার সততা ও যথাযথ উদ্ধৃতি বিষয়ে বাধ্যতামূলক কোর্স চালু এবং গবেষণায় চৌর্যবৃত্তি ও এআই-সহায়তা শনাক্তে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানো।
পদোন্নতিতে গবেষণার মানকে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার ওপর জোর দিয়ে অধ্যাপক মামুন আহমেদ বলেন, পাঁচটি নিম্নমানের গবেষণাপত্রের চেয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও মানসম্মত গবেষণাপত্র বেশি মূল্যবান। শুধু প্রকাশনার সংখ্যা বাড়ানোর প্রবণতার কারণে ‘গবেষণা প্রকাশ করো, নইলে পিছিয়ে পড়বে’ সংস্কৃতি তৈরি হচ্ছে।
তিনি বলেন, এ প্রবণতার সুযোগ নিয়ে কেউ কেউ নিম্নমানের বা প্রিডেটরি জার্নালে গবেষণাপত্র প্রকাশ করছেন। আবার কেউ কেউ এআই ব্যবহার করে ভুয়া তথ্য-উপাত্ত তৈরি করছেন। এসব বন্ধে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কার্যকর নজরদারি ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
একাডেমিক ও গবেষণার সততা নিশ্চিত করতে জাতীয় পর্যায়ে একটি অভিন্ন কাঠামো তৈরির প্রয়োজনের কথাও বলেন অধ্যাপক মামুন আহমেদ। এতে চৌর্যবৃত্তি, লেখকত্ব, তথ্য ব্যবস্থাপনা, নৈতিক অনুমোদন, স্বার্থের সংঘাত, গবেষণা তত্ত্বাবধান এবং এআইয়ের দায়িত্বশীল ব্যবহারের বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করার পরামর্শ দেন তিনি।
ইউজিসি চেয়ারম্যান বলেন, এআই নিষিদ্ধ করা সম্ভব নয়। বরং শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের প্রযুক্তিটি দায়িত্বশীল ও নৈতিকভাবে ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত করতে হবে। এআই শিক্ষা ও গবেষণার কাজ দ্রুত করতে পারে। তবে এটি ভুল তথ্য ও সূত্র দিতে পারে এবং পক্ষপাতও ছড়াতে পারে।
তিনি বলেন, ‘লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল কোনো উত্তরের দায় নিতে পারে না। তাই এর মাধ্যমে তৈরি ফলাফলের দায়িত্ব আমাদেরই।’
অনুষ্ঠানে ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির বোর্ড অব ট্রাস্টিজের সদস্য রাশেদা কে চৌধুরী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. এ এফ এম ইউসুফ হায়দার, টার্নিটিনের দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের পরিচালক চৈতালি মিত্র এবং ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. আরশাদ মাহমুদ চৌধুরী বক্তব্য দেন। এতে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও গবেষকরা উপস্থিত ছিলেন।