সরকার গঠনের প্রথম মাসেই ভূরাজনৈতিক চ্যালেঞ্জে বিএনপি

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ের মাধ্যমে গত ১৭ ফেব্রুয়ারি সরকার গঠন করে বিএনপি। ক্ষমতায় এসেই ভঙ্গুর অর্থনীতি ও নাজুক জ্বালানি খাতের ভার নিতে হয়েছে নতুন সরকারকে।

দায়িত্ব নেয়ার মাত্র দুই সপ্তাহের মাথায় মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধাবস্থাকে ঘিরে সরকারকে জটিল ভূরাজনৈতিক ঘূর্ণাবর্তের মুখোমুখি হতে হচ্ছে।

২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে মূলত প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সের ওপর ভর করে দেশের অর্থনীতি কিছুটা স্থিতিশীলতার পথে ফিরেছিল। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধাবস্থা দীর্ঘায়িত হলে সে রেমিট্যান্স প্রবাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে। ইরানে এ হামলায় নেতৃত্ব দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র, যার সঙ্গে নির্বাচনের মাত্র তিনদিন আগে বাণিজ্য চুক্তি করেছে বাংলাদেশ।

এ অঞ্চলেই বাংলাদেশের বিপুলসংখ্যক প্রবাসী কর্মী কাজ করেন, রেমিট্যান্সের একটি বড় অংশও আসে এসব দেশ থেকে। এছাড়া বাংলাদেশের আমদানীকৃত জ্বালানির বড় অংশ আসে সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ওমান থেকে।

জ্বালানি তেল থেকে এলএনজি কিংবা এলপিজি—সব ক্ষেত্রেই এ নির্ভরতা রয়েছে। ফলে ওই অঞ্চলে সংঘাত তীব্র হলে জ্বালানি সরবরাহের ওপরও চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা দেশের অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। সব মিলিয়ে ক্ষমতায় আসার পরপরই সরকার বহুমাত্রিক ভূরাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।

ইরানের ওপর সাম্প্রতিক হামলার পরিপ্রেক্ষিতে মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়া চলমান সংঘাত ও অস্থিরতায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ। একই সঙ্গে এ অঞ্চলে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে সর্বোচ্চ সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানানো হয়েছে। গতকাল পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে বাংলাদেশের এ অবস্থান পরিষ্কার করা হয়। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান বৈরী পরিস্থিতি কেবল আঞ্চলিক শান্তি নয়, বরং বেসামরিক জনগোষ্ঠীর কল্যাণকেও চরমভাবে বিপন্ন করবে। সংঘাত নিরসনে সামরিক শক্তির পরিবর্তে কূটনৈতিক আলোচনার টেবিলে ফিরে আসার ওপর জোর দিয়েছে ঢাকা।

বাহরাইন, ইরাক, জর্ডান, কুয়েত, কাতার, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ এ অঞ্চলের একাধিক দেশের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের নিন্দা জানিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিবৃতিতে বলেছে, বাংলাদেশ আশা করে যে দ্রুততম সময়ে শান্ত অবস্থা বিরাজ করবে এবং শিগগিরই সমগ্র অঞ্চলে শান্তি, নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হবে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক উত্তেজনা মানেই শুধু জ্বালানি তেলের দামের উল্লম্ফন নয় বরং সরবরাহ শৃঙ্খলে অনিশ্চয়তা বাড়ার আশঙ্কাও। সমস্যাটি কেবল জ্বালানি নিরাপত্তার নয়, অর্থনৈতিকও। একদিকে পশ্চিমা বিশ্ব ও তাদের মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষা, অন্যদিকে মুসলিম বিশ্ব—বিশেষত উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে শ্রমবাজার, রেমিট্যান্স ও জ্বালানি বিষয়ে সহযোগিতা বজায় রাখা। এ দ্বৈত বাস্তবতা নতুন সরকারের সামনে কঠিন কূটনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি করেছে। সব মিলিয়ে ক্ষমতায় আসার পরপরই সরকার এমন এক বহুমাত্রিক ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছে, যেখানে প্রতিটি বক্তব্য ও পদক্ষেপের সম্ভাব্য অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রভাব বিবেচনায় নিতে হচ্ছে। এ অবস্থাকে বিশ্লেষকরা নতুন সরকারের জন্য বড় ধরনের ভূরাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন।

কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, নির্দিষ্ট কোনো পক্ষকে সরাসরি অভিযুক্ত না করে সার্বভৌমত্ব রক্ষার ওপর জোর দেয়া বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের নিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতিরই প্রতিফলন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রগুলো বলছে, ইরানে বসবাসরত বাংলাদেশী নাগরিকদের নিরাপত্তা নিয়ে সরকার বিশেষভাবে উদ্বিগ্ন। সংঘাতপূর্ণ এলাকায় অবস্থানরত প্রবাসীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা এখন ঢাকার অন্যতম অগ্রাধিকার। মূলত মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর ওপর বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা এবং রেমিট্যান্স প্রবাহ অনেকাংশে নির্ভরশীল। বিশেষ করে সৌদি আরব ও কাতারসহ যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোর সঙ্গে অর্থনৈতিক স্বার্থ জড়িত থাকায় বাংলাদেশকে এ সংকটে অত্যন্ত হিসাব করে পা ফেলতে হচ্ছে।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বৈশ্বিক যে পরিস্থিতি, দেখা যাচ্ছে সারা পৃথিবীতে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন যুদ্ধ লেগে থাকে। বাংলাদেশ তো বিশ্বের বাইরে নয়। কাজেই এ বিশ্বায়নের যুগে বাংলাদেশে প্রভাব তো পড়বেই। এখানে চাপের চেয়েও বেশি হলো দায়িত্ববোধ। সেই জায়গা থেকে আমাদের সব মন্ত্রণালয় তাদের কাজ করার চেষ্টা করছে। প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে ব্যাপারটি দেখছেন। আমাদের বাংলাদেশী নাগরিকরা যারা বিদেশে আছেন, যারা কর্মরত আছেন, তাদের সুবিধা-অসুবিধা, তাদের সিকিউরিটি আমাদের আটমোস্ট প্রায়োরিটি। এ বিষয়গুলো ফরেন মিনিস্ট্রিতে আমরা দেখছি, পাশাপাশি আমাদের সিভিল এভিয়েশন ও লেবার মিনিস্ট্রি থেকেও দেখা হচ্ছে এবং নিশ্চিত করা হচ্ছে। আমাদের পক্ষ থেকে, সরকারের যা যা কর্তব্য ও দায়িত্ব, সেটা পালন করা হচ্ছে। লং টার্মের ইমপ্লিকেশন তো আছেই, সেটা ভিন্ন ব্যাপার; সেটা পর্যালোচনার বিষয় এবং সেটা অবশ্যই আমাদের সবারই মাথায় আছে।’

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আরো বলেন, ‘বাংলাদেশ সবসময় মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে সবকিছু দেখার চেষ্টা করে। অবশ্যই এক্ষেত্রে বাস্তবতা তো আছেই। সেই দিক থেকে অবশ্যই ফরেন মিনিস্ট্রি থেকে যে বিবৃতি ইস্যু হয়েছে সেটাই আমাদের অফিশিয়াল অবস্থান এবং সেটাই থাকবে। সবাই চায়, আমরাও চাই যে শান্তি বজায় থাকুক। এ ধরনের পরিস্থিতিতে যে দেশের নাগরিকই হোক, সাধারণ মানুষই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ অবস্থা থেকে বের হয়ে আসা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বনেতাদেরও সেদিকে দৃষ্টি রাখতে হবে যে কীভাবে নেগোসিয়েশন বা ডায়ালগের মাধ্যমে সমাধান করা যায়। আমাদের কাছে চাপ নয়, বরং বর্তমানে সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার হলো দেশের নাগরিকদের সুরক্ষিত রাখা।’

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কয়েকজন সাবেক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, অতীতেও দেখা গেছে যেকোনো সংঘাতে উভয় পক্ষকে সংযম বা ধৈর্য ধারণের কথা আমরা বলে থাকি। উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে সেই পথটা নেয়া বাংলাদেশের জন্য স্বাভাবিক। কিন্তু ইরানের ওপর যখন ইউনিলেটারাল অ্যাটাক হয়, যেখানে ইসরায়েলের মতো একটা দেশ যুক্ত, তখন শুধু কথা বা ভাষার মাধ্যমে হলেও যথাযথ প্রতিক্রিয়া দেখানো যেত।

কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এখানে ন্যায়-অন্যায়ের ব্যাপার আছে। একটা দেশের অভ্যন্তরে ঘটে যাওয়া এ ঘটনাকে যদি নিন্দা না জানানো হয়, কাল যদি বাংলাদেশের অভ্যন্তরে এ রকম একটি ঘটনা ঘটে তখন কী করা হবে? কাজেই এ ধরনের কাজের নিন্দা প্রকাশ করতেই হবে তা যে ভাষাতেই হোক না কেন। সেটাই নীতিগত অবস্থান। দুর্বলের ওপর সবলের বল প্রয়োগ তো আন্তর্জাতিক মানদণ্ড হতে পারে না। কাজেই যেকোনো ভাষায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে নিন্দা জানানো উচিত ছিল। যেটা করা হয়নি; বরং ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নিন্দার বিষয়টি এড়িয়ে শুধু বাংলাদেশীদের ওপরই ফোকাস রাখা হয়েছে। ভারসাম্য রক্ষা করতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক ঠিক রাখতে হচ্ছে। আবার সৌদি আরবসহ ওই দেশগুলো থেকে অর্থপ্রবাহ আসে, সেটাও মাথায় রাখতে হচ্ছে।

দায়িত্ব গ্রহণের ১০ দিনের মাথায় মধ্যপ্রাচ্যের এ যুদ্ধ পরিস্থিতি সরকারের ওপর ভূরাজনৈতিক চাপ তৈরি করল কিনা—এমন প্রশ্নের জবাবে সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবির বলেন, ‘সরকারের জন্য এ পরিস্থিতি চাপ তো বটেই। এ যুদ্ধাবস্থা সবার জন্যই একটা বড় আশঙ্কার কারণ তৈরি করেছে। আমরা সব পক্ষকেই আবার আলোচনার টেবিলে ফেরার আহ্বান জানাচ্ছি। এ যুদ্ধাবস্থা এখনই বন্ধ হোক। এক্ষেত্রে সব পক্ষই সংযম প্রদর্শন করবে বলে প্রত্যাশা করছি এবং বাংলাদেশী ভাই-বোনরা যারা আছেন তারা যাতে নিরাপদ থাকেন সেজন্য বাংলাদেশ সরকারকে উদ্যোগ নেয়ার জন্য আহ্বান জানাই।’

মধ্যপ্রাচ্যের যেকোনো ঘটনাই বাংলাদেশের জন্য এক রকমের উভয় সংকট তৈরি করে বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. দেলোয়ার হোসেন। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দীর্ঘ সময় ধরেই আমাদের একটা সুসম্পর্ক আছে। আবার মধ্যপ্রাচ্যের প্রায় সব দেশের সঙ্গেই আমাদের সম্পর্ক ভালো। সেখানে যখন একটা বিভাজন দেখি, তখন কার পক্ষে আমরা যাব সেটা বড় একটা চিন্তার বিষয়। অতীতে ইসরায়েল এককভাবে আক্রমণ করার কারণে নিন্দা জানানো সহজ ছিল। কিন্তু এবার যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি যুক্ত হয়েছে। আর এটাও বাস্তবতা যে বাংলাদেশের এ সরকারের সঙ্গে অথবা আগের সরকারের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের একটা বিশেষ সম্পর্ক রয়েছে বা যুক্তরাষ্ট্রের এক ধরনের সহানুভূতি রয়েছে। সেটাকে মাথায় রেখেও কূটনৈতিক দিক থেকে বিফিটিং বা যথাযথ প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করা এবং জনগণের সেন্টিমেন্টকে মাথায় রাখা প্রয়োজন।’

এ অধ্যাপক আরো বলেন, ‘সবদিক বিবেচনায় এ পরিস্থিতিতে আমাদের সরকার একেবারেই নতুন। তাদের সামনে এটা সত্যিই একটা বড় চ্যালেঞ্জ। এ কঠিন পরিস্থিতিকে গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে সরকারের উচিত কূটনৈতিক দক্ষতা প্রদর্শন করা।’

আরও