দেশের স্বাস্থ্য খাত এখন একসঙ্গে কয়েকটি বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। হামের নতুন প্রাদুর্ভাব, ডেঙ্গুর চাপ, চিকিৎসক ও নার্সের ঘাটতি, বিশেষায়িত সেবার কেন্দ্রীভবন এবং সরকারি হাসপাতালের সেবার মান নিয়ে দীর্ঘদিনের প্রশ্ন। এসব সংকট মোকাবেলায় সরকার কী করছে, কোথায় পরিবর্তন আনতে চায়—সেসব নিয়ে বণিক বার্তার সঙ্গে কথা বলেছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সুস্মিতা হোসেন ও ফারিন জাহান সিগমা
হাসপাতালগুলোর খাবারের মান নিয়ে অভিযোগ রয়েছে। মানোন্নয়নের জন্য কোনো কাঠামোগত পরিবর্তন আনা হচ্ছে কি?
আমি সরাসরি অনেক হাসপাতালের রান্নাঘর পরিদর্শন করেছি এবং খাবারের মান যাচাই করেছি। সকাল ও দুপুর—দুই সময়েই গিয়ে দেখেছি রোগীদের কী ধরনের খাবার দেয়া হচ্ছে। সাধারণত এক বেলা মাছ, অন্য বেলা মাংসের সঙ্গে ভাজি বা সবজি দেয়া হয়। আগে হাসপাতালে রোগীপ্রতি খাবারের জন্য বরাদ্দ ছিল মাত্র ৭৫ টাকা। বর্তমান বাজারদরে এত কম টাকায় মানসম্মত খাবার দেয়া সম্ভব নয়। তাই আমরা বরাদ্দ দ্বিগুণ করে ১৫০ টাকা করেছি। সামনে প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী টেন্ডারের মাধ্যমে এ কার্যক্রম পরিচালিত হবে। আমি যতগুলো হাসপাতালে না জানিয়ে আকস্মিক পরিদর্শন করেছি, কোথাও একেবারে খাওয়ার অনুপযোগী খাবার পাইনি। তবে এত মানুষের জন্য একসঙ্গে রান্না করতে গিয়ে খাবারের স্বাদ সবসময় প্রত্যাশিত নাও হতে পারে। বরাদ্দ বাড়ানোর পাশাপাশি মসলা ব্যবহার ও রান্নার মান উন্নত করতেও কাজ চলছে। দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে আমরা স্বাস্থ্য খাতে সুশাসন ফিরিয়ে আনা এবং সেবার মানোন্নয়নের চেষ্টা করছি। ছয় মাসে সবকিছু বদলে ফেলা সম্ভব নয়; তবে ধাপে ধাপে পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে।
নতুন করে শিশুদের মধ্যে হামের প্রকোপ বাড়ছে। এ পরিস্থিতিতে ‘ইনটেনসিফায়েড এমআর ক্যাচ-আপ’ ক্যাম্পেইন কীভাবে পরিচালনা করছেন?
এপ্রিল থেকে মে মাস পর্যন্ত চলা প্রথম ক্যাম্পেইনের জন্য আমরা দুই কোটির বেশি ডোজ এনেছি। এর পরও হাম থামেনি। কারণ ক্যাম্পেইনের পর নতুন শিশুর জন্ম হয়েছে, তারা দুই মাস বা ছয় মাস বয়সে পৌঁছেছে। এদের মধ্যেই হাম বেশি হচ্ছে। ৯৯ শতাংশ হাসপাতালে গিয়ে দেখলাম যাদের হাম হচ্ছে তারা সব নন-ভ্যাকসিনেটেড। যাদের মধ্যে অনেকে আবার ক্যম্পেইনের সময় টিকার ডোজ মিস করেছে।
আমরা হাম-রুবেলার প্রথম ভ্যাকসিন ক্যাম্পেইনে ১ কোটি ৮৫ লাখ ডোজ দিয়েছি। এরপর যখন ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল ক্যাম্পেইন শুরু করি, তখন দেখা যায় মাত্র ২৫ লাখ শিশু ভিটামিন ‘এ’ পেয়েছে। পরবর্তী সময়ে আমরা ২ কোটি ২৫ লাখ শিশুকে ভিটামিন ‘এ’ খাওয়ানোর পর দেখি, আরো ৪০ লাখ শিশুকে হাম-রুবেলার টিকা দেয়া বাকি আছে। এ কারণে ঈদুল আজহার পরদিন থেকে আমরা মপ-আপ ক্যাম্পেইন চালিয়ে যাই।
এরপর আমরা ভাবলাম, আরো একটি ক্যাচ-আপ প্রোগ্রামে যাওয়া উচিত। সে অনুযায়ী ২৬ সেপ্টেম্বর ৪০ লাখ ডোজ নিয়ে আরেকটি ক্যাম্পেইন শুরু করেছি। এর মধ্যে ১০ লাখ ডোজ নতুন করে আনা হয়েছে এবং ৩৪ লাখ আগের লেফটওভার। বর্তমানে ৩৪ লাখ শিশুকে টার্গেট ধরে ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত কাজ করছি। এরই মধ্যে আমরা কয়েক লাখ শিশুকে টিকা দিয়ে ফেলেছি।
করোনা-পরবর্তী টিকা সংকটের কারণে পাঁচ থেকে নয় বছরের টিকাবঞ্চিত শিশুদের জন্য আপনাদের পরিকল্পনা কী?
পাঁচ বছরের বেশি বয়সী শিশুদের মধ্যেও হাম হচ্ছে। সে কারণে আমরা চিন্তা করছি, পাঁচ বছরের বেশি বয়সীদের জন্যও এ ধরনের ক্যাম্পেইন চালানো যায় কিনা। দেশের আর্থিক সীমাবদ্ধতা রয়েছে, সেটিও বিবেচনায় রাখতে হচ্ছে। তার পরও এ বয়সী শিশুদের জন্য আরেকটি ক্যাম্পেইন করা যেতে পারে বলে আমি মনে করি। তবে এ বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
ইউনিসেফ থেকে টিকা এনে ক্যাম্পেইন করতে গিয়ে প্রশাসনিক ও মাঠ পর্যায়ে কী কী প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হয়েছেন?
গত ১৭ ফেব্রুয়ারি আমরা দায়িত্ব গ্রহণ করি। এর এক সপ্তাহ পরই হামের সংক্রমণ দেখা দেয় এবং এক মাসের মধ্যে প্রাদুর্ভাব আরো বাড়ে। কিন্তু তখন কোনো ক্যাম্পেইন পরিচালনার মতো পর্যাপ্ত টিকা মজুদ ছিল না। হাম প্রতিরোধের প্রটোকল অনুযায়ী চার বছর পরপর ক্যাম্পেইন হওয়ার কথা। কিন্তু ২০২০ সালের ডিসেম্বরের পর বিগত ফ্যাসিস্ট সরকার আর কোনো ক্যাম্পেইন করেনি। পরবর্তী সময়ে ইউনিসেফ সতর্কবার্তা দিয়ে জরুরি ভিত্তিতে টিকা সংগ্রহের অনুরোধ করলেও অন্তর্বর্তী সরকার কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। কেন নেয়নি, তা আমি জানি না। ফলে প্রায় পাঁচ বছর এ ধরনের টিকাদান ক্যাম্পেইন হয়নি।
বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর দ্রুত টিকা সংগ্রহ করে ক্যাম্পেইন শুরু করাই ছিল সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। দীর্ঘদিন এ ধরনের কার্যক্রম না থাকায় মাঠ পর্যায়ের কর্মীরাও কিছুটা অগোছালো ছিলেন। আমরা এক সপ্তাহের মধ্যে হেলথ অ্যাসিস্ট্যান্ট থেকে শুরু করে পরিদর্শক পর্যন্ত সবাইকে মোটিভেট ও সংগঠিত করি। এরপর বড় প্রচারণার মাধ্যমে ক্যাম্পেইন শুরু করা হয়। প্রধানমন্ত্রী বগুড়ায় উপস্থিত থেকে এর উদ্বোধন করেন এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিরাও সেখানে অংশ নেন। এত দ্রুততার সঙ্গে আমরা এ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে পেরেছি, যা বিভিন্ন মহলে দৃষ্টান্তমূলক ও প্রশংসিত হয়েছে।
ক্যাম্পেইন পরিচালনার ক্ষেত্রে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বা বাধা কী বলে মনে করছেন?
আমাদের এখন বড় কোনো বাধা নেই। সব ইউনিয়নেই একাধিক ক্যাম্পের মাধ্যমে টিকাদান কর্মসূচি চলছে। তবে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো, অনেক কর্মজীবী মা সময় করে আসতে পারেন না। আবার অনেকের স্বামী বাড়িতে না থাকায় তারা সন্তানকে টিকা কেন্দ্রে নিয়ে আসেন না। এ কারণে ছয় থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুদের পুরোপুরি কাভার করা কঠিন হয়ে পড়ে।
আমাদের স্বাস্থ্যকর্মীদের পাশাপাশি স্থানীয় রাজনৈতিক সহায়তা নিয়েও বাদ পড়া শিশুদের খুঁজে বের করা হচ্ছে। তাদের অভিভাবকদের সঙ্গে যোগাযোগ করে শিশুদের টিকা কেন্দ্রে আনার ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
মে মাসে বিশেষ ক্যাম্পেইন শেষ হওয়ার পর স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে ১০৯ দশমিক ৪ শতাংশ টিকা কাভারেজ ছিল। এর পরও হামের প্রকোপ কেন রয়ে গেল?
আমরা ১০২-১০৪ শতাংশ কাভারেজের বড় ক্যাম্পেইন চালালেও ভাসমান জনগোষ্ঠী ও দুর্গম এলাকার প্রায় ৪০ লাখ শিশু বাদ পড়ে যায়। পরে নিয়মিত ইপিআই কার্যক্রমের পাশাপাশি মপ-আপ কর্মসূচির মাধ্যমে আরো ১৪ লাখ শিশুকে টিকা দেয়া হয়েছে। এখন আবার বিশেষ ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে বাকি শিশুদের সঙ্গে নতুন করে যুক্ত হওয়া ১০ লাখ শিশু মিলিয়ে মোট ৪০ লাখ শিশুকে লক্ষ্য ধরে টিকা দেয়া হচ্ছে।
পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে কতদিন লাগবে বলে ধারণা করছেন?
যাকে যেদিন টিকা দেয়া হচ্ছে, সাধারণত এক মাসের মধ্যেই তার শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরি হয়ে যায়। অর্থাৎ ৩১ অক্টোবর যাকে টিকা দেয়া হবে, ৩০ নভেম্বরের মধ্যে তার শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরি হওয়ার কথা। তবে পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে কতদিন লাগবে, তা বলা খুবই কঠিন। কারণ হাম একটি ছোঁয়াচে ভাইরাসজনিত রোগ।
অনেক হাসপাতালে গিয়ে দেখেছি, কোনো কোনো মায়ের দুই-তিনটি শিশু রয়েছে। ঘন ঘন সন্তান জন্ম দেয়ার কারণে মা ও শিশু দুজনেরই পুষ্টির ঘাটতি থাকে। হয়তো একটি শিশু হাম নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি, অথচ মা তার পাশে অন্য দুই সুস্থ শিশুকেও নিয়ে বসে আছেন। আমি অনেককে জিজ্ঞেস করেছি, সংক্রামক রোগে আক্রান্ত শিশুর পাশে সুস্থ শিশুদের কেন রাখা হচ্ছে। তারা বলেছেন, বাড়িতে তাদের দেখাশোনা করার মতো কেউ নেই। আমাদের জনসংখ্যা যত বেশি, শিশুদের দেখভাল করার মানুষ ততটা নেই। এর সঙ্গে সচেতনতার ঘাটতিও রয়েছে। তাই এখন সংক্রামক রোগের ক্ষেত্রে কী ধরনের সতর্কতা নিতে হবে, সে বিষয়ে আমরা সচেতনতা তৈরির কাজ করছি।
এত ব্যবস্থার পরও হামে আক্রান্ত শিশুরা নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছে এবং শিশুমৃত্যুর হার কমছে না কেন?
হামে আক্রান্ত শিশুদের নিউমোনিয়ায় মৃত্যুর পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে। অল্প বয়সে মেয়েদের বিয়ে, পুষ্টিহীনতা এবং পর্যাপ্ত বুকের দুধ না পাওয়ার কারণে অনেক শিশু দুর্বল থাকে। এ ধরনের শিশুর হাম হলে সহজেই নিউমোনিয়া ও ফুসফুসে সংক্রমণ বাড়ে এবং শ্বাসকষ্ট দেখা দেয়।
আগে দেশে নিউনেটাল ভেন্টিলেটরের ব্যবস্থা ছিল না। এখন বেসরকারি ফার্মাসিউটিক্যাল শিল্পের সহায়তায় এনআইসিইউগুলোতে ভেন্টিলেটর দেয়া হয়েছে। নিউমোনিয়ায় অনেক শিশুর ফুসফুস এতটাই শক্ত হয়ে যায় যে অক্সিজেন প্রবেশ করানো কঠিন হয়ে পড়ে। সেজন্য আমাদের একজন চিকিৎসক মাত্র ১৫০ টাকার একটি বাবল সিপ্যাপ ডিভাইস বা কন্টিনিউয়াস পজিটিভ এয়ারওয়ে প্রেশার উদ্ভাবন করেছেন। এটি শিশুদের শ্বাসনালি খোলা রাখতে সহায়তা করে এবং এর মাধ্যমে অনেক শিশুর জীবন বাঁচানো সম্ভব হচ্ছে।
শিশুদের সুরক্ষায় অভিভাবকদেরও সচেতন হতে হবে যে হাম একটি সংক্রামক রোগ। হামে আক্রান্ত শিশুর পাশে সুস্থ শিশুকে রাখা যাবে না। আমরা বিভিন্নভাবে প্রায় ২৫ লাখ পরিবারকে শাকসবজি ও পুষ্টিকর খাবার খাওয়ানো এবং নবজাতককে মায়ের শালদুধ দেয়ার পরামর্শ দিচ্ছি। শালদুধ শিশুর রোগ প্রতিরোধক্ষমতা গড়ে তুলতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
নতুন হাসপাতাল স্থাপন ও শয্যা সংখ্যা বাড়ানো হচ্ছে, কিন্তু চিকিৎসক ও পর্যাপ্ত জনবল তৈরি করতে কী কী পদক্ষেপ নিচ্ছে সরকার?
আমরা অতীত সরকারের মতো দুর্নীতির জন্য কেনাকাটা করছি না। বরং প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি কেনার পাশাপাশি সেগুলো পরিচালনার জন্য দক্ষ জনবলও তৈরি করছি। বর্তমানে পাঁচ হাজার চিকিৎসকের সাক্ষাৎকার ও নিয়োগ প্রক্রিয়া চলছে। সরকার ধারাবাহিকভাবে চিকিৎসক নিয়োগ দিচ্ছে, ফলে ভবিষ্যতে দেশের কোথাও চিকিৎসকের সংকট থাকবে না। এছাড়া ৮০০ নার্সের বাছাই কার্যক্রম চলছে। পরবর্তী সময়ে আরো নার্স, কেয়ারগিভার ও টেকনিশিয়ান নিয়োগ দেয়া হবে। এরই মধ্যে প্রতিটি সিভিল সার্জন অফিসের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি দেয়া হচ্ছে।
ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব কিডনি ডিজিজেস অ্যান্ড ইউরোলজিতে নার্সদের কিডনি ডায়ালাইসিস বিষয়ে বিশেষ প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে। প্রশিক্ষণ শেষে তাদের জেলা পর্যায়ে পদায়ন করা হবে। জেলা হাসপাতালগুলোতে ১০টি ও মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলোতে ৫০টি করে ডায়ালাইসিস মেশিন বসানোর পাশাপাশি প্রয়োজনীয় চিকিৎসক ও নার্সও প্রস্তুত রাখা হচ্ছে। এতে জেলা পর্যায়ের রোগীদের আর ডায়ালাইসিসের জন্য ঢাকা, চট্টগ্রাম বা রাজশাহীতে যেতে হবে না।
ক্যান্সার, হার্ট ও কিডনি চিকিৎসার মতো বিশেষায়িত সেবা বিকেন্দ্রীকরণ নিয়ে কী ভাবছেন?
আটটি বিভাগে আমাদের আটটি ক্যান্সার, কিডনি ও হার্ট ইনস্টিটিউটের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে, যা এক বছরের মধ্যে চালু হবে। দুই মাসের মধ্যে পাঁচটি শিশু হাসপাতাল চালু হচ্ছে, যেগুলোর সব মেশিনপত্র এরই মধ্যে চলে এসেছে। এছাড়া কক্সবাজারে নিউমার্কেটে চীনের সহায়তায় ৭৪৭ শয্যার হাসপাতাল, মিরপুরে এক হাজার শয্যার ও পূর্বাচলে নতুন হাসপাতাল নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
মফস্বলে চিকিৎসকদের থাকা এবং আবাসন সুবিধার বিষয়ে কী পদক্ষেপ নিচ্ছেন?
চিকিৎসকদের ওপর প্রচণ্ড চাপ থাকে; একজন ডাক্তারকে দিনে ২০০-২৫০ রোগী দেখতে হয়। এ কারণে সরকার নীতি নিয়েছে ডাক্তারদের নিজ জেলা বা পাশের উপজেলায় পদায়ন করা হবে কোনো দলীয় বা রাজনৈতিক বিবেচনা ছাড়াই। এতে তারা স্থানীয় মানুষের প্রতি দায়বদ্ধ থেকে সেরা সেবাটা দিতে পারবেন। বর্তমানে নীলফামারী, কক্সবাজার, পতেঙ্গা, বান্দরবান ও সিলেটের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও ডাক্তার-নার্সরা সেবা দিচ্ছেন। তাছাড়া উপজেলাগুলোতে এখন ভালো আবাসন, সমাজ ও ইংরেজি মাধ্যম স্কুল থাকায় চিকিৎসকদের মানসম্মত জীবনযাপনও সম্ভব হচ্ছে।
ডাক্তারদের নিরাপত্তার অভাব প্রসঙ্গে কী বলবেন?
এ বিষয়ে চিকিৎসকদের প্রতিনিধি দলের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। তাদের সরাসরি দাবির পরিপ্রেক্ষিতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। গত ১ জুলাই থেকে প্রতিটি উপজেলা হাসপাতালে ১০ জন করে সশস্ত্র আনসার মোতায়েন করা হয়েছে। ঢাকার বড় হাসপাতালগুলোতে পুলিশ ক্যাম্প ও টহল বাড়ানো হচ্ছে।
তবে নিরাপত্তা উদ্যোগের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের সচেতনতা জরুরি। চিকিৎসকরা ইচ্ছা করে রোগীকে ক্ষতি করেন না। দেরিতে রোগী আনা হলে বা গুরুতর অবস্থায় পৌঁছলে চিকিৎসকদের সর্বোচ্চ চেষ্টা সত্ত্বেও মৃত্যু ঘটতে পারে। তাই চিকিৎসকদের ওপর দোষারোপ বা আক্রমণ অন্যায্য। আমাদের দেশের চিকিৎসকরা অস্বাভাবিক চাপের মধ্যে নিরলস পরিশ্রম করেন, যা বিশ্বে বিরল।
হেলথ কার্ড নিয়ে কতদূর এগিয়েছেন?
হেলথ কার্ড তৈরি করা খুব সহজ বিষয় নয়। এতে চিকিৎসাসংক্রান্ত অনেক তথ্য ও বিষয় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। তার পরও যত দ্রুত সম্ভব হেলথ কার্ড ব্যবস্থা চালু করতে মন্ত্রণালয় কাজ করে যাচ্ছে।
নতুন নতুন অনেক মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠা করা হলেও সেখানকার চিকিৎসাশিক্ষা ও সুযোগ-সুবিধার মান নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে...
সমালোচনা অনেকেই করেন, তবে সরকারি মেডিকেল কলেজগুলোর মান ভালো। অবশ্য সব বেসরকারি মেডিকেল কলেজের মান যে ভালো, তা আমি বলব না। কিছু বেসরকারি মেডিকেল কলেজের মান সন্তোষজনক না হওয়ায় সেগুলোর অনেকগুলোর কার্যক্রম বন্ধ করা হয়েছে এবং শিক্ষার্থী ভর্তি স্থগিত রাখা হয়েছে। বর্তমানে স্বাস্থ্য খাতে সুস্থ প্রতিযোগিতা বাড়ছে এবং অভিজ্ঞতাও তৈরি হচ্ছে। আমরা মেডিকেল কারিকুলাম পরিবর্তনের কাজ করছি এবং শিক্ষার্থীদের হ্যান্ডস-অন ট্রেনিং আরো জোরদার করছি।
তাহলে বিদেশে বিশেষায়িত ও উন্নত চিকিৎসা নিতে যাওয়া রোগীর পরিমাণ কমছে না কেন?
এটা একদিনে বন্ধ করা সম্ভব নয়। বর্তমানে বাংলাদেশেই অনেক জটিল ও বড় অস্ত্রোপচার সফলভাবে হচ্ছে। যেমন ইএনটি বিভাগে জন্মগতভাবে বধির ও মূক শিশুদের অস্ত্রোপচার এবং নিউরোসায়েন্স হাসপাতালে জটিল ব্রেন সার্জারি হচ্ছে। দেশের ১৬০টি ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি এখন মানসম্মত ওষুধ তৈরি করছে। আমাদের চিকিৎসকদের দক্ষতা রয়েছে এবং আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিও আছে। নেপাল, ভারতসহ বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থীরা বাংলাদেশে চিকিৎসাশিক্ষা গ্রহণ করছে এবং সন্তুষ্টি প্রকাশ করছে। আমাদের চিকিৎসকরা কভিডের মতো অতিমারীও অনেক উন্নত দেশের তুলনায় সফলভাবে মোকাবেলা করেছেন।
দেশের চিকিৎসাসেবার মান ও সক্ষমতা আরো বাড়াতে আমরা বিশেষায়িত সেবা বিকেন্দ্রীকরণের কাজ করছি। রোগীদের যেন চিকিৎসার জন্য ঢাকা বা দেশের বাইরে যেতে না হয়, সেজন্য প্রতিটি জেলা হাসপাতালে কিডনি ডায়ালাইসিস ইউনিট ও আটটি বিভাগে বিশেষায়িত ক্যান্সার, হার্ট ও কিডনি ইনস্টিটিউট চালু করা হচ্ছে।
ডেঙ্গু চিকিৎসায় স্যালাইন ও পরিচ্ছন্নতা অভিযানের প্রস্তুতি কেমন?
ডেঙ্গু চিকিৎসায় ৫০০ মিলিলিটার ও এক হাজার মিলিলিটারের স্যালাইন পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে। চার মাস আগে থেকেই আমরা পরিচ্ছন্নতা অভিযান ও স্প্রে কার্যক্রম শুরু করেছি। ব্যবহৃত ওষুধের মান যাচাই করতে গুদামে ড্রাম খুলে নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করা হয়েছে। বাসাবাড়ি বা ছাদে পানি জমিয়ে রাখলে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে জরিমানা করা হচ্ছে। পাশাপাশি মশার লার্ভা ধ্বংসের জন্য আলটি-ট্যাবলেট সরবরাহ করা হচ্ছে।