বান্দরবানের আলীকদম উপজেলার গহীনে বেড়াতে গিয়ে তৈন খাল পারাপারের সময় পাহাড়ি খরস্রোতা ঢলে ভেসে যায় এক নারীসহ তিন পর্যটক। গত বুধবার (১১ জুন) উপজেলা সদরের দুর্গমে শামুক ঝর্ণা বেড়ানো শেষে ফেরার পথে রাত ১০ টার সময় তৈন খাল পার হবার সময় এ ঘটনা ঘটে। ওই তিনজনের মধ্যে শুক্রবার (১৩ জুন) সকালে তৈন খাল থেকে এক নারী ও গতকাল বৃহস্পতিবার ভোরে মাতামুহুরী নদী থেকে এক পর্যটকের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় আরো একজন নিখোঁজ রয়েছে।
শুক্রবার (১৩ জুন) সকালে উপজেলার আমতলীর চর এলাকায় তৈন খাল থেকে উদ্ধার হওয়া পর্যটক হলেন ময়মনসিংহ জেলার নান্দাইল উপজেলার বাকী সাভারের মো. হাবিবুর রহমান ও রুপিয়া আক্তারের মেয়ে স্মৃতি ইসলাম (২০)। আগের দিন বৃহস্পতিবার (১২ জুন) ভোরে মাতামুহুরী নদী থেকে নড়াইল জেলার লোহাগাড়া উপজেলার ধলিতলা পাচুড়িয়া গ্রামের শেখ হিদায়েতুল ইসলাম ও কামরুন্নাহারের ছেলে শেখ জুবাইরুল ইসলামের (৩৫) মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় ফেনী জেলা সদরের সুন্দরপুর চৌধুরী বাড়ির মো. আলীর ছেলে মো. হাসান চৌধুরী শুভ (২৯) নামের আরো একজন নিখোঁজ রয়েছে বলে পুলিশ জানায়।
গ্রুপটির অন্য সদস্যদের বরাত দিয়ে পুলিশ জানায়, গত সোমবার (৯ জুন) ট্যুর এক্সপার্ট গ্রুপ নামের ভ্রমণকারী দলের অ্যাডমিন বর্ষার নেতৃত্বে ৩৩ জনের একটি পর্যটক দল আলীকদমে আসেন। এই দলে কো-হোস্ট হিসেবে ছিলেন বর্তমানে নিখোঁজ হাসান নামের এক যুবক। তারা স্থানীয় দুজন ট্যুর গাইডকে তাদের গ্রুপের গাইড হিসেবে নিয়োগ দেন। তাদের উদ্দেশ্য ছিল আলীকদম উপজেলার দুর্গম ক্রিসতং পাহাড় হয়ে থানচি উপজেলার সাকাহাফংসহ একাধিক পাহাড়ে হাইকিং ট্রেইল করা। পর্যটকদের দলটি দুটি গ্রুপে ভাগ হয়। এর মধ্যে একটিতে ২২ জন ও অন্যটিতে ১১ জন সদস্য। ২২ জনের দল খালে ভেসে গিয়ে নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে দলটির অন্য ১৯ জন সদস্য বর্তমানে আলীকদম থানায় অবস্থান করছেন। গত বুধবার উপজেলার শামুক ঝর্ণায় বেড়ানো শেষে ফেরার পথে রাত ১০টার দিকে তৈনখাল পার হচ্ছিলেন। ১৯ জন নিরাপদে খাল পার হতে পারলেও তিনজন খাল পার হতে পারেননি। তিনজনের মধ্যে গত বৃহস্পতিবার ফরেস্ট ঘাট এলাকার মাতামুহুরী নদী থেকে একজন ও গতকাল শুক্রবার আমতলীর চর এলাকার তৈন খাল হতে এক নারী পর্যটকের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এখনো হাসান নামের একজন নিখোঁজ রয়েছে। নিখোঁজ যুবকের খোঁজ চলমান বলে পুলিশ জানায়।
একাধিক সুত্রে জানা গেছে, কমবেশি ৫০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের তৈন খাল মাতামুহুরী নদীতে মিলিত হয়েছে। মাতামুহুরী নদী থেকে শুরু করে উৎপত্তিস্থলের মাঝে দীর্ঘ এ খালের উভয় পাশের বিপুল সংখ্যক ছোট বড় ঝিরি-ঝর্ণা, জলপ্রপাত রয়েছে। উজানের দিকে ক্রমান্বয়ে পরিধি ছোট হতে থাকা পাহাড়ি এলাকার নদী ও খালের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এ কারণে বর্ষাকালে নদী ও খালের উজানে বৃষ্টি হলে ঝিরি-ঝর্ণা জলপ্রপাত ও পাহাড় থেকে বেয়ে পড়া পানিগুলো মিলিত হয় খালে। এ সময় সৃষ্টি হয় আকস্মিক পাহাড়ি খরস্রোতা ঢল। সে সময় ভাটির দিকে বৃষ্টি না পড়লে ঢলের পানি চলে আসে। ঢল নামার ওই মুহুর্তে খাল ভয়াবহ হয়ে ওঠে। স্থানীয়রা সে সময় খাল পার হয় না। আবার বৃষ্টি থামার ঘণ্টাখানেকের মধ্যে ঢলের পানি নেমে যায়। বর্ষাকালে পাহাড়ে এসব গুরুত্বপুর্ণ বৈশিষ্ট্যগুলো সম্পর্কে বেড়াতে আসা পর্যটকদের অনেকের অজানা। যা জানা জরুরি বলে সুত্র জানায়।
ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন আলীকদম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মির্জা জহির উদ্দিন। তিনি বলেন, গত দুই দিনে একজন নারী পর্যটকসহ দুজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। নিখোঁজ হাসান চৌধুরীর সন্ধানে উদ্ধার অভিযান চলছে। দুর্গম ও নেটওয়ার্কবিহীন এলাকায় অভিযান চালাতে কিছুটা বেগ পেতে হচ্ছে। উদ্ধার করা মরদেহগুলো ময়নাতদন্তের জন্য বান্দরবান সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। সার্বিক বিষয়ে তদন্ত চলছে এবং আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে জানান তিনি।