তবে এ আয়োজনকে ঘিরে মুখোমুখি অবস্থানে স্থানীয় দুটি পক্ষ। ‘তৌহিদী জনতা’র ব্যানারে একটি পক্ষ প্রতিযোগিতা বন্ধের দাবি জানিয়ে প্রচারণা চালাচ্ছে। অন্যদিকে আয়োজকরা নির্ধারিত সময়েই বাইচ আয়োজনে অনড়। বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও চলছে ব্যাপক আলোচনা।
স্থানীয় সংস্কৃতিকর্মী ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, বাইচ আবহমান বাংলার একটি প্রাচীন লোকজ ঐতিহ্য। প্রায় তিন-চার যুগ ধরে সোনাই নদে এ প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। এখন লোকজ এ ঐতিহ্য বন্ধ করা মানে শেকড়কেই কেটে ফেলা। তবে কোনো সমস্যা থাকলে তা সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সমাধান করা যেতে পারে, কিন্তু একটি দীর্ঘদিনের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য বন্ধ করা সমাধান নয়।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিয়ানীবাজার ও মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলার মধ্যবর্তী সোনাই নদে দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় যুবকরা বাইচের আয়োজন করে আসছেন। এবারো ২৮ আগস্ট নদের তৃগাঙ্গারমুখ এলাকায় প্রতিযোগিতা আয়োজনের প্রস্তুতি চলছে। এর মধ্যে স্থানীয় কয়েকজন যুবক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বাইচের বিরোধিতা করে লেখালেখি শুরু করেন। একপর্যায়ে ‘তৌহিদী জনতা’র ব্যানারে এ আয়োজন বন্ধের দাবিতে প্রচারণা শুরু হয়। গত বৃহস্পতিবার স্থানীয় বারইগ্রাম বাজার মসজিদে এ বিষয়ে একটি সভাও অনুষ্ঠিত হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ওই সভার ভিডিওতে স্থানীয় কয়েকজন আলেমকে বক্তব্য দিতে দেখা যায়।
বাইচ বন্ধের দাবিতে সোচ্চার একাধিক ব্যক্তি অবশ্য বলছেন, তাদের আপত্তি ধর্মীয় কারণে নয়; বরং কৃষকের ফসল রক্ষা, নদীভাঙন প্রতিরোধ ও আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির কথা বিবেচনায় নিয়ে। এ বিষয়ে স্থানীয় প্রবীণ মাওলানা নুরুর রহমান মাসুক বলেন, ‘এটি কোনো ধর্মীয় বিষয় নয়; বরং সম্পূর্ণ সামাজিক ও জনস্বার্থের বিষয়। তৌহিদী জনতা কিংবা নাগরিক সমাজের নামে কারা ব্যানার করেছে, সে বিষয়ে আমরা নিশ্চিত নই। তবে এলাকার সচেতন নাগরিকদের মূল দাবি হলো, এ অঞ্চলে আর নৌকাবাইচ আয়োজন না করা।’
তার দাবি, অতীতে বাইচকে কেন্দ্র করে দুই নৌকার সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এতে অনেকে আহত হয়েছেন, এমনকি হাত-পা ভাঙার ঘটনাও ঘটেছে। পাশাপাশি রাতের বেলায় অসামাজিক কর্মকাণ্ড ও আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কার কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
অন্যদিকে নৌকাবাইচের আয়োজকদের একজন হেলাল উদ্দিন বলেন, ‘আবহমান বাংলার একটি প্রাচীন ঐতিহ্য নৌকাবাইচ। প্রায় তিন-চার যুগ ধরে স্থানীয় সোনাই নদে এ প্রতিযোগিতা হয়ে আসছে। দূরদূরান্ত থেকে মানুষ এসে উৎসবমুখর পরিবেশে এ আয়োজন উপভোগ করেন। ফলে এবারো আমরা আয়োজন করেছি। তবে “তৌহিদী জনতা”র ব্যানারে কেন এ প্রতিযোগিতা বন্ধের পাঁয়তারা করা হচ্ছে, তা আমরা জানি না। আমরা সবাইকে আশ্বস্ত করছি, প্রতি বছরের মতো এবারো নৌকাবাইচ প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হবে।’ হেলাল উদ্দিনের দাবি, নৌকাবাইচের কারণে স্থানীয় বাসিন্দা কিংবা নদীর কোনো ক্ষতি হওয়ার অভিযোগ সঠিক নয়।
স্থানীয় জমিয়ত নেতা আব্দুল হক কাসেমী অভিযোগ করেন, নৌকাবাইচ আয়োজনকে কেন্দ্র করে এলাকায় মারামারি ও জুয়ার আসর বসার ঘটনা ঘটে। স্থানীয় কিছু মাদক ব্যবসায়ী ও মাদকসেবীও এ আয়োজনের সঙ্গে সম্পৃক্ত। এছাড়া নদীভাঙন ও ফসলি জমির ক্ষতির আশঙ্কাও রয়েছে। তাই দিনমজুর, শিক্ষক-ছাত্র, চাকরিজীবী, আলেম-ওলামাসহ বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষ এ আয়োজনের প্রতিবাদ জানিয়েছেন। তবে তৌহিদী জনতার ব্যানারে কিছু করা হয়নি। যারা করছে, এটা তাদের বিষয়।
নৌকাবাইচ বন্ধের দাবির বিরোধিতা করে সিলেটের সংস্কৃতিকর্মী ও কবি আহমাদ সেলিম বলেন, ‘নৌকাবাইচ কেবল একটি খেলা বা বিনোদন নয়, এটি নদীমাতৃক বাংলাদেশের শত বছরের ইতিহাস, সম্প্রীতি ও গ্রামীণ সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। সব ধর্ম ও পেশার মানুষ একসঙ্গে এ আনন্দ উৎসবে শামিল হয়। কোনো দাবি বা অজুহাতে এমন লোকজ ঐতিহ্য বন্ধ করা মানে আমাদের শেকড়কে কেটে ফেলা। সমস্যা থাকলে সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনার উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে। কিন্তু ঐতিহ্য বন্ধ করা কোনো সমাধান হতে পারে না।’
বাঙালি ও স্থানীয় লোকজ সংস্কৃতির পরিসর দিন দিন সংকুচিত হয়ে আসছে বলে দাবি করেন মঈন উদ্দিন মহিলা কলেজের বাংলা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও লেখক মো. আলমগীর হোসেন। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘বিয়ানীবাজারের নৌকাবাইচ সর্বজনীন উৎসবের একটি, যা বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষকে এক সুতোয় বাঁধে। এ ধরনের সাংস্কৃতিক আয়োজন বন্ধ হতে দিলে ধীরে ধীরে নতুন প্রজন্ম নিজেদের ঐতিহ্য ও ইতিহাস থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে।’
জানতে চাইলে স্থানীয় লাউতা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান দেলওয়ার হোসেন বলেন, ‘ঐতিহ্যবাহী নৌকাবাইচ আয়োজনকে কেন্দ্র করে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, সেটি স্থানীয় পর্যায়ের একটি বিষয়। এ নিয়ে মূল দুই পক্ষের কেউই আমার সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে যোগাযোগ করেনি।’
তিনি বলেন, ‘বর্তমানে কোনো অনুষ্ঠান বা আয়োজনের বিরোধিতার ক্ষেত্রে “তৌহিদী জনতা” নামের ব্যানার ব্যবহার এক ধরনের প্রথায় পরিণত হয়েছে। তবে নৌকাবাইচের বিরোধিতার পেছনে স্থানীয় কিছু যৌক্তিক কারণও রয়েছে।’
নৌকাবাইচ আয়োজনের জন্য প্রশাসনের কাছ থেকে এখনো অনুমতি নেয়া হয়নি বলে জানান বিয়ানীবাজার থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আবু জাফর মোহাম্মদ মাহফুজুল করিম। তিনি বলেন, ‘সরকারি নিয়ম অনুযায়ী যেকোনো অনুষ্ঠান আয়োজনের আগে জেলা প্রশাসকের অনুমতি বা অনাপত্তি নেয়া বাধ্যতামূলক। নৌকাবাইচের মতো বড় আয়োজনের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম নেই। কিন্তু আয়োজকরা পুলিশ প্রশাসনকে বিষয়টি অবহিত করেননি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচিত হচ্ছে বিষয়টি। আমরা পর্যবেক্ষণ করছি।’
এ ব্যাপারে বিয়ানীবাজার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) উম্মে হাবিবা মজুমদার বলেন, ‘নৌকাবাইচ একটি ঐতিহ্যবাহী অনুষ্ঠান। তবে এটি আয়োজনের জন্য আয়োজকরা উপজেলা প্রশাসনের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো লিখিত অনুমতি চাননি। এমনকি আয়োজনের ক্ষেত্রে কোনো বাধা বা সমস্যার সম্মুখীন হওয়ার বিষয়টিও তারা প্রশাসনকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানাননি।’
তিনি আরো বলেন, ‘সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন কথা শোনা গেলেও সেটি দাপ্তরিক মাধ্যম নয়। তবে বিষয়টি খতিয়ে দেখতে থানা পুলিশ ও মাঠপর্যায়ের সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। বিষয়টি স্থানীয়ভাবে জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা চলছে।’