ঢাকার জলাবদ্ধতা নিরসনে পাঁচ দশকে ৯ পরিকল্পনার বাস্তবায়ন হয়নি একটিও

রাজধানী ঢাকার জলাবদ্ধতা নিরসনে গত কয়েক দশকে নয়টি মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন করা হলেও কোনোটি পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়ন হয়নি। সর্বশেষ ২০১৬ সালে ২৫ বছর মেয়াদি একটি বিশদ মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন করে ঢাকা ওয়াসা।

এক দশক পেরিয়ে গেলেও এর প্রথম পর্ব বাস্তবায়ন হয়নি; দ্বিতীয় পর্বেও দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ডুবে যাচ্ছে, আর দুর্বল ও অপর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থা নিয়েই ক্রমান্বয়ে বিস্তৃত হচ্ছে নগরীর পরিধি। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, এ পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে ঢাকার নাগরিক সেবা, প্রশাসনিক কার্যক্রম ও বাণিজ্যিক প্রবৃদ্ধি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে পারে।

নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, রাজধানী ঢাকার জলাবদ্ধতা নতুন কোনো সমস্যা নয়। স্বাধীনতার পরও বৃষ্টি হলেই নগরীর বিভিন্ন অলিগলি পানিতে তলিয়ে যেত। সে সময় ঢাকার আয়তন ও জনসংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম থাকায় জলাবদ্ধতার পরিসরও ছিল সীমিত। তবে সমস্যাটি তখনো বিদ্যমান ছিল। এ বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে পাকিস্তান আমলেই ঢাকার জন্য প্রথম পানি নিষ্কাশন মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়।

ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায়, ১৯৬৮ সালে ঢাকার প্রথম ড্রেনেজ মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন করে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর (ডিপিএইচই)। এর আগে ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর ঢাকার নগর ও গ্রামীণ এলাকায় বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠানটি গঠন করা হয়। পানি সরবরাহ ও পয়োনিষ্কাশনসেবার পাশাপাশি বৃষ্টির পানি অপসারণে ড্রেনেজ অবকাঠামো নির্মাণের দায়িত্বও ছিল সংস্থাটির ওপর। পরে ১৯৬৩ সালে ঢাকার পানি সরবরাহ ও পয়োনিষ্কাশনসেবা পরিচালনার জন্য ঢাকা ওয়াসা গঠন করা হলেও ড্রেনেজ নির্মাণ ও বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের দায়িত্ব জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের কাছেই থেকে যায়। তবে ১৯৮৮ সালের প্রলয়ংকরী বন্যার পর ঢাকার ড্রেনেজ ব্যবস্থাপনায় গতি আনতে এ দায়িত্ব ঢাকা ওয়াসার হাতে ন্যস্ত করা হয়।

জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর প্রণীত প্রথম ড্রেনেজ মাস্টারপ্ল্যানের নাম ছিল ‘ঢাকা শহরের বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও অভ্যন্তরীণ পানি নিষ্কাশন মহাপরিকল্পনা’। পরিকল্পনাটি বাস্তবায়নের দায়িত্ব দুই সংস্থার মধ্যে ভাগ করে দেয়া হয়। বাঁধ ও পাম্পিং স্টেশন নির্মাণের দায়িত্ব দেয়া হয় তৎকালীন পানি ও বিদ্যুৎ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (ওয়াপদা) ওপর। অন্যদিকে ড্রেনেজ অবকাঠামো নির্মাণের দায়িত্বে ছিল জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর।

এরপর জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর পর্যায়ক্রমে আরো পাঁচটি মাস্টারপ্ল্যান, পুনর্মূল্যায়ন পরিকল্পনা ও সমীক্ষা প্রণয়ন করে। এর মধ্যে ছিল ১৯৭৬ সালের ‘ঢাকা শহরের অভ্যন্তরীণ ড্রেনেজ ব্যবস্থা পরিকল্পনা’, ১৯৭৮ সালের ‘বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও ড্রেনেজ পুনর্মূল্যায়ন মহাপরিকল্পনা’, ১৯৮৩ সালের ‘ঢাকা মহানগরীর জলাবদ্ধতা দূরীকরণে অন্তর্বর্তীকালীন পরিকল্পনা’, একই বছরের ‘ঢাকা মহানগরীর জলাবদ্ধ এলাকায় বৃষ্টির পানি নিষ্কাশন অবকাঠামো নির্মাণের সংশোধিত ক্র্যাশ প্রোগ্রাম’ এবং ১৯৮৫ সালে একই নামে প্রণীত আরেকটি সংশোধিত ক্র্যাশ প্রোগ্রাম।

নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, ঢাকা শহরের জলাবদ্ধতা দীর্ঘ সময়ের সমস্যা। এর পেছনে রয়েছে অপরিকল্পিত অবকাঠামো এবং সরকারের অব্যবস্থাপনা। এছাড়া নগরবাসীর অসচেতনতাও বড় কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের (ইউআরপি) অধ্যাপক ড. আকতার মাহমুদ।

তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ঢাকার জলাবদ্ধতা শুধু আজকের সমস্যা নয়। ১৮৪০ সালে এক ইংরেজ কর্মকর্তার ডায়েরিতে ঢাকা নগরীর জলাবদ্ধতার উল্লেখ পাওয়া যায়। তখন ঢাকা বলতে পুরান ঢাকা, পল্টন, শাহবাগ—এতটুকুই ছিল। চারপাশে খাল-নদীতে থইথই করত। তাহলে জলাবদ্ধতা কেন? আমরা জানালা দিয়ে রাস্তায়, প্রতিবেশীর ছাদে, দুই বিল্ডিংয়ের ফাঁকা জায়গায় ময়লা ফেলি। নিচু ভূমি, খাল আবর্জনা দিয়ে ভরে ফেলি। আমাদের দুর্ভোগের পেছনে অনেকাংশে আমরাই দায়ী।’

ঢাকার জলাবদ্ধতা প্রসঙ্গে তিনি আরো বলেন, ‘জনগণের অসচেতনতার পাশাপাশি সরকারেরও বড় ব্যর্থতা রয়েছে। এত মাস্টারপ্ল্যান, অ্যাকশনপ্ল্যান করা হলো, একটিও কিন্তু কোনো সরকার পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন করতে পারেনি। ওয়াসা বা সিটি করপোরেশন বর্ষার আগে খাল পরিষ্কার করে। যে বছর খাল পরিষ্কার করে, সে বছর অবস্থা একটু ভালো থাকে। যে বছর করে না, সে বছর অবস্থা খারাপ হয়ে যায়। আসলে বৃষ্টির পানি নগরীর কেন্দ্রীয় এলাকা থেকে প্রান্তিক এলাকায় নিয়ে যেতে হবে। সে ব্যবস্থা তো এখন নেই। মাস্টারপ্ল্যান পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন ছাড়া ঢাকা শহরের জলাবদ্ধতার সমাধান হবে না।’

ঢাকার জলাবদ্ধতা নিরসনে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের অধীনে নেয়া উদ্যোগগুলোও কাঙ্ক্ষিত ফল আনতে পারেনি। ফলে বন্যাপ্রবণ ও নদীমাতৃক বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা প্রতি বছরই বৃষ্টিতে জলাবদ্ধ এবং বড় বন্যায় প্লাবিত হতে থাকে। এ পরিস্থিতিতে ঢাকার বন্যা ও জলাবদ্ধতা নিরসনে এগিয়ে আসে জাপানের আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা জাইকা। ১৯৮৭ সালে সংস্থাটি ‘ঢাকা শহরের বৃষ্টির পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা উন্নয়ন সমীক্ষা’ পরিচালনা করে। তবে এর এক বছর পরই ১৯৮৮ সালের প্রলয়ংকরী বন্যায় দেশের অন্যান্য অঞ্চলের সঙ্গে ঢাকাও ব্যাপকভাবে প্লাবিত হয়।

পরে ১৯৯০ সালে বিশ্বব্যাংকের উদ্যোগে ‘ফ্লাড অ্যাকশন প্ল্যান’ এবং বৃষ্টির পানি নিষ্কাশন ও বন্যা নিয়ন্ত্রণবিষয়ক সমীক্ষা পরিচালিত হয়। সর্বশেষ ২০০৬ সালে ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার মডেলিং (আইডব্লিউএম) ঢাকা শহরের জন্য একটি ড্রেনেজ মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন করে।

বর্তমানে ঢাকার ড্রেনেজ ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে রয়েছে দুই সিটি করপোরেশন। তবে ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাপ, জলাধার ও নিচু জমির পরিমাণ কমে যাওয়া এবং মাটির পানি শোষণক্ষমতা হ্রাস পাওয়ায় নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসন ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

এ প্রসঙ্গে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী নূর আজিজুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ঢাকার খালগুলো আবর্জনায় ভরা, বক্স কালভার্টগুলোর প্রবাহ বন্ধ, রিটেনশন পন্ডগুলো বেদখল, নিচু জমি ভরাট হয়ে গেছে, ধারণক্ষমতার চার-পাঁচ গুণ মানুষ এ শহরে বসবাস করছে। এ পরিস্থিতিতে এ নগরীর জন্য যেকোনো পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন অনেক কঠিন কাজ। একা সিটি করপোরেশনের পক্ষে করা সম্ভবই নয়। এখানে ওয়াসার ভূমিকা আছে। ওয়াসার সুয়ারেজ লাইন আমাদের ড্রেনেজ লাইনে দেয়া। রাজউকের ভূমিকা আছে। ঢাকার সব নিম্নভূমি ভরাট হয়ে যাচ্ছে, রাজউক কিছু বলছে না। জনগণকে খাল, ড্রেনে ময়লা ফেলা থেকে বিরত থাকতে হবে। সবাই এগিয়ে এলেই কেবল ঢাকার জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে। নয়তো পরিকল্পনা হবে, মেয়াদ শেষ হবে, আবার পরিকল্পনা হবে। জলাবদ্ধতা কমবে না।’

রাজধানী ঢাকার জন্য সর্বশেষ ড্রেনেজ মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন করে ঢাকা ওয়াসা। ২০১৫ থেকে ২০৪০ সাল পর্যন্ত ২৫ বছর মেয়াদি এ মহাপরিকল্পনা তিনটি পর্বে বাস্তবায়নের কথা ছিল। এর প্রথম পর্বের মেয়াদ নির্ধারণ করা হয় ২০১৫-২০ সাল পর্যন্ত। পরবর্তী দুই পর্বের মেয়াদ ছিল যথাক্রমে ২০২০-৩০ ও ২০৩০-৪০ সাল পর্যন্ত। এ মাস্টারপ্ল্যান ওয়াসাসহ ঢাকার সেবাদানকারী বিভিন্ন সংস্থার মাধ্যমে বাস্তবায়ন হওয়ার কথা ছিল। যদিও এক দশক পরও এ মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন হয়নি।

বারবার ড্রেনেজ মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়ন না হওয়ার কারণে জনগণের ভোগান্তির পাশাপাশি রাষ্ট্রের শত শত কোটি টাকা অপচয় হচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. আদিল মুহাম্মদ খান। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ঢাকার মতো একটি শহরের ড্রেনেজ সমস্যা সমাধানের জন্য পরিকল্পিত কাজ প্রয়োজন। কিন্তু দুই সিটি করপোরেশন খাল ও ড্রেনেজের দায়িত্ব পাওয়ার পর বিচ্ছিন্নভাবে কাজ করে যাচ্ছে। কোথাও খাল পরিষ্কার করছে, দুদিন পর ময়লা হয়ে যাচ্ছে। কোথাও পানি জমে আছে, সেখানে সড়ক উঁচু করে মানুষের ঘর ডুবিয়ে দিচ্ছে। এভাবে গত চার বছরে হাজার কোটি টাকার মতো ব্যয় হয়েছে জলাবদ্ধতা নিরসনে। এগুলো জনগণের অর্থের অপচয় ছাড়া কিছু নয়। অবশ্যই যা-ই করা হোক না কেন, মাস্টারপ্ল্যান অনুযায়ী করতে হবে। তাহলেই টেকসই সমাধানের পথে হাঁটবে ঢাকা নগরী।’

তবে রাজধানীর জলাবদ্ধতা নিরসনে সংশ্লিষ্ট সেবা সংস্থাগুলো সমন্বিতভাবে কাজ করছে বলে দাবি করেছেন ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আমিনুল ইসলাম। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ড্রেনেজ ব্যবস্থাপনার মূল দায়িত্ব এখন দুই সিটি করপোরেশনের হাতে। ২০২০ সাল পর্যন্ত এ দায়িত্ব ঢাকা ওয়াসার কাছে ছিল। সে সময় ওয়াসা দায়িত্বটি যথাযথভাবে পালন করতে পারেনি। তবে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে রাজধানীর জলাবদ্ধতা নিরসনে ঢাকা ওয়াসা, দুই সিটি করপোরেশন, রাজউকসহ সংশ্লিষ্ট সব সংস্থা সমন্বিতভাবে কাজ করছে। আশা করছি, ঢাকাবাসী এর সুফল পাবে।’

আরও