ন্যূনতম নিরাপদ সীমার নিচে সব সারের মজুদ

আমন ধানের মৌসুমকে ঘিরে দেশের বিভিন্ন জেলায় সারের কৃত্রিম সংকটের অভিযোগ উঠেছে। সরকারের পক্ষ থেকে কোনো ঘাটতি নেই বলে আশ্বস্ত করা হলেও মাঠপর্যায়ে ভিন্ন চিত্রের কথা বলছেন কৃষক।

প্রয়োজনীয় সার সংগ্রহে ভোগান্তির পাশাপাশি কোথাও কোথাও সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দিয়ে কিনতে হচ্ছে বলে অভিযোগ তাদের।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের নিজস্ব হিসাবেও দেখা যাচ্ছে, দেশে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত চার ধরনের সার ইউরিয়া, ট্রিপল সুপার ফসফেট (টিএসপি), ডাই-অ্যামোনিয়াম ফসফেট (ডিএপি) ও মিউরেট অব পটাশ (এমওপি)—সবক’টির মজুদই নির্ধারিত নিরাপদ সীমার নিচে। যদিও মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা বলছেন, সারের সরবরাহ ব্যবস্থাপনা স্বাভাবিক রয়েছে। আমদানির মাধ্যমে নিয়মিতই সার আসছে, বিভিন্ন এলাকায় বরাদ্দ ও বিতরণ করা হচ্ছে এবং আরো কিছু সারবাহী জাহাজ পথে রয়েছে। ফলে তাৎক্ষণিকভাবে বড় ধরনের সংকট তৈরির আশঙ্কা নেই বলে তাদের দাবি।

কৃষি বিশ্লেষকদের মতে, আমন মৌসুমের বাড়তি চাহিদা, আন্তর্জাতিক বাজার ও আমদানি নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং স্থানীয় উৎপাদনের সীমাবদ্ধতা—সব মিলিয়ে দেশের সার সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় ঝুঁকি বাড়ছে। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও পর্যাপ্ত নিরাপদ মজুদ নিশ্চিত করা না গেলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরো জটিল হতে পারে।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের সার মজুদ পরিস্থিতির (২৪ আগস্ট পর্যন্ত) নথি বিশ্লেষণে দেখা যায়, দেশে ইউরিয়ার মজুদ রয়েছে ৪ লাখ ৮২ হাজার ২০০ টন। অথচ সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত এ সারের ন্যূনতম নিরাপদ মজুদ ধরা হয় পাঁচ লাখ টন। অর্থাৎ নিরাপদ সীমার চেয়ে বর্তমানে প্রায় ১৭ হাজার ৮০০ টন কম মজুদ ইউরিয়ার। টিএসপির ক্ষেত্রেও একই চিত্র। বর্তমানে দেশে এ সারের মজুদ রয়েছে ৩ লাখ ৬৯ হাজার টন। অথচ নিরাপদ মজুদের ক্ষেত্রে চার লাখ টন প্রয়োজন। সে হিসাবে নির্ধারিত নিরাপদ সীমার তুলনায় টিএসপির মজুদ কম রয়েছে প্রায় ৩০ হাজার ৭০০ টন।

সবচেয়ে বেশি ঘাটতি দেখা যাচ্ছে ডিএপি ও এমওপির ক্ষেত্রে। ডিএপির নিরাপদ মজুদসীমা পাঁচ লাখ টন হলেও বর্তমানে মজুদ রয়েছে মাত্র ৩ লাখ ৬৮ হাজার ১০০ টন। অর্থাৎ নিরাপদ সীমার তুলনায় প্রায় ১ লাখ ৩২ হাজার টন মজুদ কম ডিএপির। এর আগে গত মাসে কৃষি মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়ে মরক্কো থেকে ডিএপি আমদানি বাড়ানোর অনুরোধ জানায় বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি)। চিঠিতে সংস্থাটি জানায়, আগামী চার মাসে নির্ধারিত দুটি লটের পাশাপাশি অতিরিক্ত আরো দুটি করে লট ডিএপি আমদানি করতে হবে। অন্যথায় আগামী শীতকালীন ও বোরো মৌসুমে এ সারের স্বাভাবিক সরবরাহ বজায় রাখা সম্ভব হবে না।

এদিকে ২৪ আগস্ট পর্যন্ত দেশে এমওপির মজুদ ছিল ১ লাখ ৪৬ হাজার টন। অথচ এ সারের নিরাপদ মজুদ হিসেবে ধরা হয় তিন লাখ টনকে। সে অনুযায়ী, নিরাপদ সীমার তুলনায় এমওপির মজুদ প্রায় অর্ধেকেরও কম।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, ইউরিয়া ও তিন ধরনের নন-ইউরিয়া সার মিলিয়ে বর্তমানে দেশে মোট মজুদ রয়েছে ১৩ লাখ ৬৫ হাজার ৬০০ টন। অথচ সামগ্রিকভাবে নিরাপদ মজুদ থাকার কথা ১৭ লাখ টন। অর্থাৎ চার ধরনের সার মিলিয়ে নিরাপদ সীমার তুলনায় দেশের মজুদ প্রায় ৩ লাখ ৩৪ হাজার টন কম রয়েছে। আগামী সেপ্টেম্বরে দেশে ইউরিয়া, ডিএপি, এমওপি ও টিএসপি মিলিয়ে মোট চাহিদা চার লাখ টনের বেশি হবে বলে মন্ত্রণালয়ের হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে। ওই মাসের জন্য মন্ত্রণালয় সার বরাদ্দ রেখেছে ৪ লাখ ৪৩ হাজার টন। ফলে বর্তমান মজুদ, নতুন আমদানি এবং মাঠপর্যায়ে সঠিকভাবে বিতরণ—এ তিনটি বিষয়ের ওপর সরবরাহ পরিস্থিতি অনেকাংশে নির্ভর করবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

দেশে কৃষিতে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত সার ইউরিয়া। এর পরই রয়েছে ডিএপির অবস্থান। চলতি অর্থবছরে দেশে ইউরিয়ার মোট চাহিদা ধরা হয়েছে ২৬ লাখ ২২ হাজার টন। ডিএপির চাহিদা ১৩ লাখ ৫৫ হাজার ৭০০ টন। এছাড়া চলতি অর্থবছরে এমওপির চাহিদা ৯ লাখ ৭০ হাজার টন এবং টিএসপির চাহিদা ৯ লাখ ১ হাজার ৫০০ টন নির্ধারণ করা হয়েছে। অর্থাৎ কৃষি উৎপাদন স্বাভাবিক রাখতে বছরে বিপুল পরিমাণ সার সরবরাহ ও বিতরণ নিশ্চিত করতে হবে সরকারকে।

ইউরিয়া সারের সরবরাহ, উৎপাদন ও আমদানির কার্যক্রম পরিচালনা করে বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি)। সংস্থাটির অধীনে রয়েছে সাতটি সার কারখানা। এর মধ্যে পাঁচটি ইউরিয়া, একটি করে ডিএপি ও টিএসপি সার কারখানা রয়েছে। কাঁচামালের অভাবে টিএসপি ও ডিএপি সার কারখানাটি বেশ কিছুদিন ধরেই উৎপাদনে নেই। পাঁচটি ইউরিয়া সার কারখানার মধ্যে উৎপাদনে রয়েছে দুটি। তবে সাড়ে পাঁচ মাস বন্ধ থাকার পর পুনরায় গত সোমবার থেকে গ্যাস সরবরাহ দেয়া হচ্ছে চট্টগ্রাম ইউরিয়া সার কারখানায়। ফলে এটিও দ্রুত উৎপাদনে ফিরবে।

বিসিআইসির বাণিজ্যিক, উৎপাদন ও গবেষণা পরিচালক মো. মনিরুজ্জামান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘চট্টগ্রাম ইউরিয়া সার কারখানায় গতকাল থেকে গ্যাস সরবরাহ শুরু হয়েছে। আগে থেকেই ঘোড়াশাল-পলাশ ও শাহজালাল সার কারখানা চালু রয়েছে। এর সঙ্গে বহুজাতিক কাফকো (কর্ণফুলি ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড) চালু রয়েছে।

তিনি বলেন, ‘ইউরিয়ার মজুদ নিয়ে দুশ্চিন্তার কিছু নেই। এটি একটি চেইন। সার উৎপাদন ও আমদানি হচ্ছে আবার কৃষকের মাঝে বিতরণ হচ্ছে। একদিকে আসছে আরেকদিকে বিতরণ হচ্ছে। এটি একটি চক্র। সুতরাং কতটুকু মজুদ আছে এটি দিয়ে পূর্ণাঙ্গ অবস্থা বোঝায় না। সার প্রতিদিন উৎপাদন হচ্ছে।

ডিএপি, এমওপি এবং টিএসপি আমদানি ও বিতরণের দায়িত্বে রয়েছে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি)। সংস্থাটির আমদানি ও মজুদ বিষয়ক প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ২০ আগস্ট পর্যন্ত তাদের কাছে টিএসপি ৩ লাখ ৩৭ হাজার টন, ডিএপি ৩ লাখ ২৭ হাজার টন এবং এমওপি ১ লাখ ৪৮ হাজার টন মজুদ ছিল। তবে সংস্থাটি বলছে, তাদের আমদানি কার্যক্রম চলমান রয়েছে।

বিএডিসি বলছে, টিএসপি নিয়ে দেশের পথে রয়েছে দুটি জাহাজ। এর একটি ৮ সেপ্টেম্বর এবং অপরটি ১১ সেপ্টেম্বর পৌঁছানোর কথা। ওই দুই জাহাজে মোট ৬০ হাজার টন টিএসপি রয়েছে। ৫ ও ৬ অক্টোবর আরো ৬০ হাজার টন টিএসপি দেশে পৌঁছানোর কথা। এছাড়া আরো তিনটি লটে ৯০ হাজার টন টিএসপি আমদানির কার্যক্রম চলমান।

আগামী ৪ সেপ্টেম্বর রাশিয়া থেকে ৩৫ হাজার টনের একটি এমওপির লট দেশে পৌঁছাবে বলে জানিয়েছে বিএডিসি। সংস্থাটি বলছে, এরপর ১৫ ও ২০ সেপ্টেম্বর আরো একটি করে লটে এমওপি দেশে পৌঁছানোর কথা। এছাড়া একটি লট জাহাজে লোডিং চলছে। পাশাপাশি আরেকটি লট আমদানি কার্যক্রম চলমান। এছাড়া সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভার কমিটিতে মরক্কো থেকে ৬০ হাজার টন টিএসপি, মরক্কো ও সৌদি আরব থেকে ১ লাখ ২০ হাজার টন ডিএপি এবং রাশিয়া ও কানাডা থেকে ১ লাখ ১৫ হাজার টন এমওপি সার আমদানির প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।

মাঠপর্যায়ে বিতরণ ব্যবস্থার দুর্বলতায় সার সরবরাহ পরিস্থিতিকে জটিল করছে। বিভিন্ন জেলায় সারের সংকট ও বেশি দামে কেনার অভিযোগ করেছেন কৃষকরা। কুড়িগ্রামে ডিলারের গুদামের তালা ভেঙে প্রায় দুইশ বস্তা সার নিয়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। এদিকে সারের কৃত্রিম সংকট মোকাবেলায় সরকার কমিটি গঠন করেছে।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. সেলিম খান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘চাহিদা অনুযায়ী সার আছে, বরং চাহিদার চেয়ে বেশি আছে। গতবার এ সময়ে যে পরিমাণ মজুদ ছিল, তার চেয়ে এবার অনেক বেশি মজুদ রয়েছে। গত অর্থবছরে এ সময়ে নন-ইউরিয়া (টিএসপি, ডিএপি ও এমওপি) সারের মোট মজুদ ছিল ৭ লাখ ৮৫ হাজার ৪০৩ টন। এবার মজুদের পরিমাণ ৮ লাখ ৮৩ হাজার ৪৭৭ টন। অর্থাৎ গতবারের তুলনায় প্রায় এক লাখ টন বেশি।’

সার না পাওয়া নিয়ে কৃষকের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে কৃষি সচিব বলেন, ‘সারের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় যে ঘটনাগুলো ঘটছে, সেগুলো একেক জায়গায় একেক রকম। মূল কথা হচ্ছে, সরকারকে বেকায়দায় ফেলার জন্য একটি ষড়যন্ত্র হচ্ছে। আমরা এ ষড়যন্ত্র হতে দেব না। সবচেয়ে বড় কথা হলো আমরা নিশ্চিত করে বলতে পারি সারের কোনো ঘাটতি নেই।’

কৃষি অর্থনীতিবিদরা বলছেন, নভেম্বর-ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চার মাসে দেশে সবচেয়ে বেশি সারের চাহিদা থাকে। শীতকালীন সবজি, আলু, পেঁয়াজ, ভুট্টার মতো নানা ফসল মাঠে থাকে ওই সময়। এছাড়া খাদ্যশস্যের সবচেয়ে বড় জোগান দেয়া বোরো ধানও আবাদ হয় তখন। সে জন্য ব্যস্ত ওই মৌসুমকে পরিকল্পনায় নিয়ে সারের মজুদ ও দেশীয় উৎপাদন বাড়াতে হবে। অন্যথায় সংকট তৈরি হতে পারে।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক এএইচএম সাইফুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘কৃষকের চাহিদামতো সার পৌঁছে দিতে সরকারকে সরবরাহশৃঙ্খল ঠিক রাখতে হবে। এজন্য মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা এড়িয়ে বিকল্প উৎস থেকে সময়মতো সার আমদানি করতে হবে। পিক মৌসুমে কৃষক চাহিদামতো সার না পেলে উৎপাদন ব্যাহত এবং দেশের খাদ্যশৃঙ্খলে বড় ধাক্কা লাগতে পারে।’

আরও