দেশে গ্যাস উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে সিলেটের জৈন্তাপুরে ডুপিটিলা-১ ও গোলাপগঞ্জ উপজেলায় কৈলাসটিলা-৯ অনুসন্ধান কূপ খননের উদ্যোগ নেয় পেট্রোবাংলা। এ দুটি কূপ খনন করা গেলে ১০ বছরে মোট ৫৬ বিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাওয়ার কথা জানিয়েছিল পেট্রোবাংলার সাবসিডিয়ারি সিলেট গ্যাস ফিল্ডস কোম্পানি লিমিটেড (এসজিএফএল)। কিন্তু জমি অধিগ্রহণ-সংক্রান্ত জটিলতায় প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হলেও কূপ খনন করা যায়নি। এখন নতুন করে এ প্রকল্পের সময়সীমা বাড়ানোর প্রস্তাব পাঠিয়েছে এসজিএফএল। যদিও কাগজে-কলমে প্রকল্পের ১৬ শতাংশ কাজের অগ্রগতির কথা উল্লেখ করেছে কোম্পানিটি। আজ প্রকল্পটির বিষয়ে পরিকল্পনা কমিশনের প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভায় প্রকল্পটির মেয়াদ বৃদ্ধি-সংক্রান্ত পর্যালোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।
পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা যায়, ২০২৫ সালে এসজিএফএলের আওতায় ৫৬ বিসিএফ গ্যাস মজুদের জন্য ডুপিটিলা-১ ও কৈলাসটিলা-৯ গ্যাস অনুসন্ধান কূপ খননের অনুমোদন দেয় তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার। যদিও প্রকল্পের মেয়াদ শুরু হয় ২০২৪ সালের ১ অক্টোবর। দুই বছর মেয়াদি এ প্রকল্পের মেয়াদ গত মাসে শেষ হয়েছে।
পেট্রোবাংলা সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পের জন্য যে ভূমি অধিগ্রহণ করার কথা ছিল, তা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে করা যায়নি। মূলত জমি অধিগ্রহণে স্থানীয়দের বাধা, সংযোগ সড়ক নির্মাণে ধীরগতিসহ নানা কারণে প্রকল্পে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হয়নি বলে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ডুপিটিলা-১ ও কৈলাসটিলা-৯ গ্যাস অনুসন্ধান কূপ প্রকল্পে ৬৪৬ কোটি ৪৮ লাখ টাকা ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়। চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত প্রকল্পটির ব্যয় ৮ দশমিক ৩৯ শতাংশ এবং বাস্তব অগ্রগতি ১৬ শতাংশ। প্রকল্পটি অনুমোদন করা হলেও স্থানীয়দের সঙ্গে জমি অধিগ্রহণ-সংক্রান্ত বিরোধের কারণে অগ্রগতি নেই বলে প্রকল্পের বিষয়ে উল্লেখ করা হয়।
আইএমইডির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত দুটি কূপের ভূমি পাওয়া যায়নি। ২০২৫ সালের ১৮ ডিসেম্বরের প্রকল্প স্টিয়ারিং কমিটির সভায় মেয়াদ বৃদ্ধিসহ ভূমি হুকুম দখলের পরিবর্তে অধিগ্রহণের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। কূপ সাইটে পূর্তকাজ শুরু হয়েছে। ভূমি অধিগ্রহণের আগে পূর্তকাজ শুরু করায় আপত্তি জানিয়েছে আইএমইডি। এ বিষয়ে আরো পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রস্তাব করা হয়েছে। ভূমি হুকুম দখলের সিদ্ধান্ত থেকে বেরিয়ে এসে এসজিএফএল জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে ভূমি অধিগ্রহণের কাজ করছে।
প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, ডুপিটিলা-১ কূপের ৭৮৩ মিটার সংযোগ সড়কের মধ্যে মাত্র ২৩২ মিটার নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে। এর মধ্যে একটি ছোট সেতুও রয়েছে। অবশিষ্ট ৫৫১ মিটারে সেতু ও কালভার্টের কাজ চলমান। এছাড়া কূপের জন্য সাইটে বালি ভরাট করা হচ্ছে। কৈলাসটিলা-৯ কূপে ভূমি উন্নয়ন করা হয়নি। কোনো বাস্তব অগ্রগতিও দেখা যায়নি।
প্রকল্পের বিষয়ে জানতে চাইলে সংস্থাটির এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বণিক বার্তাকে বলেন, ‘প্রকল্পটি নেয়ার সময় কৃষি জমির ওপর সরকারিভাবে জমি হুকুম দখলের কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু সেখানে বাধা দেন স্থানীয় জমির মালিকরা। ফলে শুরু থেকে নানা আপত্তির কারণে কাজ শুরু করা সম্ভব হয়নি। এসব বাধা ও আপত্তি দূর করতে দুই বছর চলে গেছে। ফলে আমরা সেখানে দৃশ্যমান কিছু খুঁজে পাইনি। এখন বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠান ভূমি অধিগ্রহণের কথা বলছে। নতুন করে প্রকল্পের নকশায়ও পরিবর্তন আসবে। মেয়াদ বাড়াতে হবে। কারণ দুই বছরে কিছুই করা সম্ভব হয়নি।’
ডুপিটিলা-১ ও কৈলাসটিলা-৯ নম্বর কূপ খনন প্রকল্পে সরকারের অর্থায়ন প্রায় ৪১৪ কোটি ৭৮ লাখ ও এসজিএফএলের নিজস্ব অর্থ ২৩১ কোটি ৭০ লাখ টাকা। ডুপিটিলা কাঠামোয় প্রায় ৩ হাজার ৪৫০ মিটার ও কৈলাসটিলায় প্রায় ৩ হাজার ৬০০ মিটার গভীরতায় অনুসন্ধান চালানো হবে। নতুন কূপ খননে গ্যাস পাওয়া গেলে কূপ দুটি থেকে প্রথম পাঁচ বছরে ২০ মিলিয়ন ঘনফুট হারে এবং পরবর্তী পাঁচ বছরে ১২ মিলিয়ন ঘনফুট হারে অর্থাৎ ১০ বছরে মোট ৫৬ বিসিএফ গ্যাস উৎপাদন করা যাবে, যা দেশের ক্রমবর্ধমান জ্বালানি চাহিদা পূরণে ভূমিকা রাখবে।
প্রকল্পের আওতায় গ্যাস পাওয়া গেলে গ্যাদারিং পাইপলাইন নির্মাণ, নিরাপত্তা স্থাপনা, ড্রেন, সীমানাপ্রাচীরসহ প্রয়োজনীয় অবকাঠামো তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। কিন্তু অনুসন্ধান কূপ খননের পূর্বশর্ত ভূমি ও সংযোগ অবকাঠামোর কাজই পুরোপুরি প্রস্তুত না হওয়ায় মূল খনন শুরু করতে দীর্ঘ সময় লাগবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে প্রকল্পটির মেয়াদ দুই বছর বাড়াতে গত ৯ সেপ্টেম্বর উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) পরিকল্পনা কমিশনে পাঠায় এসজিএফএল। নানা যাচাই-বাছাই শেষে আজ পিইসি সভায় উঠছে প্রকল্পটি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে শিল্প ও শক্তি বিভাগের তৈল, গ্যাস ও প্রাকৃতিক সম্পদ উইংয়ের যুগ্ম প্রধান মো. নজরুল ইসলাম বলেন, ‘কূপ দুটির বিষয়ে পুনরায় ডিপিপি এসেছে। সেটি নিয়ে কাল (আজ) বেলা ১১টায় পিইসি বৈঠক হবে। সেখানে তাদের নকশার পরিবর্তন ও গভীরতা নিয়ে আলোচনা করব। আমরা মূলত কোথায় পরিবর্তন হয়েছে, কেন কাজ হয়নি এবং তাদের চাওয়া নিয়ে জানতে চাইব। তাদের অগ্রগতি যেহেতু খুবই সীমিত, তাই হয়তো নতুন করে দুই বছরের মতো সময় লাগতে পারে। যদি সময় বাড়াতে ও ব্যয় পর্যালোচনা করতে হয়, তাহলে হয়তো জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় পাঠাতে হতে পারে।’
ডুপিটিলা ও কৈলাসটিলায় কূপ খননের বিষয়ে জানতে চাইলে পেট্রোবাংলার শীর্ষ এক কর্মকর্তা নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে বণিক বার্তাকে বলেন, ‘প্রকল্পটি অনেক আগেই অনুমোদন পায়। কিন্তু জমি অধিগ্রহণসংক্রান্ত জটিলতা রয়েছে। এ কারণে এখনো ওই অর্থে সেখানে কোনো কাজ শুরু করা যায়নি।’