ঐতিহ্যবাহী টাঙ্গাইলের শাড়ি কেবল নকশাদার রঙিন পোশাকই নয়, এর সুতোর বুননে লুকিয়ে আছে ঐতিহ্য ও সম্প্রীতির গল্প। এ শাড়ি ও এর ঐতিহ্যকে নতুন প্রজন্মের কাছে উপস্থাপনের লক্ষ্যে শুরু হয়েছে চারদিনের বিশেষ আয়োজন। গতকাল বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের কবি সুফিয়া কামাল মিলনায়তনে এর উদ্বোধন করা হয়।
‘ঐতিহ্য, সম্প্রীতি, হস্তশিল্প: টাঙ্গাইল তাঁতের উত্তরাধিকার উদযাপন’ শীর্ষক এ উৎসবের যৌথ আয়োজক বাংলাদেশ ইউনেস্কো জাতীয় কমিশন (বিএনসিইউ), বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর এবং বাংলাদেশ তাঁত বোর্ড। এটি সবার জন্য উন্মুক্ত। এ আয়োজন ২২ সেপ্টেম্বর সমাপ্ত হবে।
উদ্বোধনী পর্ব শেষে বেলা ১টা থেকে জাতীয় জাদুঘরের নলিনীকান্ত ভট্টশালী প্রদর্শনী গ্যালারিতে বিশেষ আলোকচিত্র ও তথ্যচিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন এবং গ্যালারি-সংলগ্ন লবিতে তাঁত শাড়ির মেলা সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হয়। শাড়ির পাশাপাশি তাঁতের বিভিন্ন যন্ত্রপাতি, সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক নানা অনুষঙ্গের নমুনা ও গল্প তুলে ধরা হয়েছে এখানে।
আয়োজকদের মতে, এ উৎসব শুধু একটি প্রদর্শনীর আয়োজন নয়; এটি মূলত তাঁতিদের ঘাম ঝরানো জীবনকাব্য, তাদের অনন্য শৈল্পিক নৈপুণ্য এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে আগলে রাখা সাংস্কৃতিক পরিচয়ের প্রতি এক গভীর সম্মান প্রদর্শন। এ আয়োজনে তাই প্রদর্শনী গ্যালারির রঙিন শাড়িগুলোর প্রতিটি ভাঁজে ছড়িয়ে আছে ঐতিহ্য ও সম্প্রীতির গল্প।
বেলা ১১টায় অনুষ্ঠানমালার উদ্বোধন করেন সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব ইয়াসমিন বেগম। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ ইউনেস্কো জাতীয় কমিশনের ডেপুটি সেক্রেটারি জেনারেল সাবভীনা মনীর চিঠি।
বিশেষ অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের মহাপরিচালক তানজিম ইবনে ওয়াহাব, এনটিআরসিএর চেয়ারম্যান (অতিরিক্ত সচিব) আলিফ রুদাবা এবং বাংলাদেশ তাঁত বোর্ডের চেয়ারম্যান (গ্রেড-২) মো. জাকির হোসেন। এছাড়া অনুষ্ঠানে গেস্ট অব অনার হিসেবে ছিলেন ইউনেস্কো ঢাকা অফিসের প্রধান মিজ সুজান ভাইস।
২০২৫ সালে ঐতিহ্যবাহী টাঙ্গাইলের শাড়ি বুনন শিল্প ইউনেস্কোর ‘ইনট্যানজিবল কালচারাল হেরিটেজ অব হিউম্যানিটি রিপ্রেজেন্টেটিভ লিস্ট’ বা মানবজাতির বিমূর্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতিনিধির তালিকায় স্থান করে নেয়। এর আগে ২০২৪ সালে ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) সনদ অর্জন করায় এ ঐতিহ্যকে যথাযথভাবে উদযাপনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
অনুষ্ঠানে বক্তারা জানান, ঐতিহ্যবাহী এ তাঁতশিল্পের গুরুত্ব তরুণ প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা, এর বিশ্বময় প্রসার ঘটানো এবং তাঁতিদের আর্থসামাজিক সমৃদ্ধি নিশ্চিত করাই এ অনুষ্ঠানের মূল লক্ষ্য।
উদ্বোধনী আলোচনা পর্বে বক্তারা টাঙ্গাইলের তাঁতশিল্পের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, শৈল্পিক গুণাবলি, সাংস্কৃতিক তাৎপর্য এবং জিআই স্বীকৃতির বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন। তারা জোর দিয়ে বলেন যে ঐতিহ্য রক্ষায় কেবল স্বীকৃতিই যথেষ্ট নয়; নতুন প্রজন্মকে এ শিল্পে আগ্রহী করতে তাঁতিদের ন্যায্য অধিকার, সঠিক মূল্য প্রদান এবং সরকারি-বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা নিশ্চিত করা জরুরি।
এ যৌথ উদ্যোগের মাধ্যমে তাঁতিদের অধিকার ও ভবিষ্যৎ সুরক্ষার আহ্বান জানানোর পাশাপাশি টাঙ্গাইলের সমৃদ্ধ হস্তশিল্প সংরক্ষণ, এর বাণিজ্যিক বিকাশ এবং একটি টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সৃজনশীল শিল্প হিসেবে এর সুদূরপ্রসারী পথচলা সুগম হবে বলে আয়োজকরা আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
চার দিনব্যাপী এ উৎসব ও মেলা ২২ সেপ্টেম্বর সমাপ্ত হবে।