সাধারণত আমন মৌসুম শেষে রবিশস্য আবাদ শুরু হয়। বগুড়ায় গত দুই বছরে বৃষ্টিপাত ও বন্যার কারণে আমন আবাদের জন্য নির্ধারিত সময়ে জমি প্রস্তুত করতে পারেননি কৃষক। এতে ধান কাটতেও দেরি হওয়ায় পিছিয়ে যাচ্ছে সরিষা আবাদ। ফলে কৃষিপণ্যটির আবাদ কমিয়ে দিচ্ছেন চাষীরা। কৃষি অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, চলতি মৌসুমে ৪৫ হাজার ৪৭১ হেক্টর জমিতে পণ্যটি চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে কৃষি বিভাগ। তবে এখন পর্যন্ত আবাদ হয়েছে ৩০ হাজার ৬৫ হেক্টর জমিতে। ডিসেম্বর নাগাদ জেলায় চাষের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন হতে পারে ৩৮ হাজার হেক্টর জমিতে। সেক্ষেত্রে এ বছর প্রায় ৭ হাজার হেক্টর জমিতে আবাদ কমতে পারে। গত বছর রবি মৌসুমে ৪৫ হাজার ৫০ হেক্টর জমিতে সরিষা চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। তবে আবাদ হয় ৩৭ হাজার ৫০২ হেক্টর জমিতে। সে হিসাবে সাড়ে নয় হাজার হেক্টর জমিতে সরিষা আবাদ হয়নি। ২০২৩ সালে জেলায় তেলবীজ জাতীয় এ ফসল আবাদ হয়েছিল ৪৫ হাজার হেক্টর জমিতে। সব মিলিয়ে গত দুই বছরে প্রায় ১৭ হাজার হেক্টর জমিতে ফসলটির আবাদ কমেছে।
অবশ্য কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, সাধারণত আমন ধান কাটার পর কৃষক সরিষার আবাদ করেন। চলতি বছর আমন আবাদ বিলম্ব হয়েছে। এজন্য ধানও কাটতে হয়েছে দেরিতে। এছাড়া গত বছর সরিষার ভালো দাম পাননি কৃষক। তবে চাষের জমি কমলেও উৎপাদনে খুব একটা প্রভাব পড়বে না। এখন পর্যন্ত ছত্রাক বা রোগবালাই না থাকায় এবার উচ্চ ফলন পাওয়া যাবে।
বগুড়া কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালে রবি মৌসুমে ৪৫ হাজার ৫০ হেক্টর জমিতে সরিষা চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে কৃষি বিভাগ। সেখানে শেষ পর্যন্ত ৩৭ হাজার ৫০২ হেক্টর জমিতে চাষ হয়। যা থেকে ফলন পাওয়া যায় ৬০ হাজার টন। সে হিসাবে গত বছরই সাড়ে নয় হাজার হেক্টর জমিতে সরিষা আবাদ হয়নি। চলতি মৌসুমেও চাষের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৪৫ হাজার ৪৭১ হেক্টর জমিতে। আর উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৭৫ হাজার ২৬ টন। প্রতি হেক্টরে ফলন ধরা হয়েছে ১ দশমিক ৬ টন করে।
বগুড়া সদর উপজেলা, শিবগঞ্জ, কাহালু, দুপচাঁচিয়া, আদমদীঘি, সোনাতলা, গাবতলী, শেরপুর ও নন্দীগ্রামে সরিষা আবাদ বেশি হয়। আমন ধান কাটার পর উপজেলার কৃষকরা সরিষা চাষ করেন। চলতি বছর বারি-১৪, বারি-১৫, বারি-১৭, বিনা-৯, বিনা-৪, টরি-৭ জাতের সরিষা চাষ করেছেন তারা।
বগুড়ার বাঘোপাড়া এলাকার সরিষা চাষী ফিরোজ হাসান জানান, সরিষা চাষে জমির উর্বরতা বাড়ে। প্রতি বিঘা জমি থেকে চলতি মৌসুমে গড়ে ছয় থেকে সাত মণ সরিষা পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বীজ বপন থেকে শুরু করে ৭০-৭৫ দিনে ফসলটিতে তেমন সেচ দিতে হয় না। বপনের সময় মাটির নিচে সামান্য পরিমাণ রাসায়নিক সার দিলেই চলে। অন্যান্য ফসলের তুলনায় সরিষা চাষে কম খরচ, কম শ্রম ও দ্রুত ফলন পাওয়া যায়। এ কারণে চাষীরা লাভ বেশি পান। গত বছর সরিষার উত্তোলনের পরপরই বিক্রি হয়েছে ২৪০০-২৮০০ টাকা মণ। কিন্তু খোলাবাজারে এখন সরিষা বিক্রি হচ্ছে ১০০ টাকা কেজি। সেই হিসেবে প্রায় ৪ হাজার টাকা প্রতি মণ সরিষা বিক্রি হচ্ছে। মৌসুমে দাম কম আর মৌসুম পার হলেই দাম বেড়ে যায়। এবার ভালো দাম পাওয়া গেলে চাষীরা সরিষা চাষে আরো আগ্রহ দেখাবেন।
কাহালু উপজেলার আব্দুল বাছেদ জানান, সরিষার বাজারদর গত বছর ভালো পাওয়া যায়নি। চাষে খরচ কম হলেও পরিশ্রম বেশি। ঘন কুয়াশা হলে ফলন বিপর্যয় হয়। প্রতি মণ সরিষা শুরুতে ২৩০০-২৬০০ টাকা বিক্রি করতে হয়েছে। সরিষা চাষে বিঘাপ্রতি খরচ ৭-৮ হাজার টাকা। বাজারে এখনো ভালো মানের সরিষা বিক্রি হচ্ছে প্রায় ৪ হাজার টাকা। সরিষা ৩২০০-৩৪০০ টাকা মণ বিক্রি করতে পারলে চাষীরা আর্থিকভাবে ভালো লাভবান হবেন।
কৃষি কর্মকর্তারা জানান, চাষের জমি কমলেও উচ্চফলনশীল জাত ও আবহাওয়ার কারণে এবার উৎপাদন ভালো পাওয়া যাবে। অন্য ফসলের মতো সরিষা চাষ বেশ লাভজনক। বাড়তি ফসল হিসেবে এ অঞ্চলে সরিষা চাষ বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।
বগুড়া কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা ফরিদুর রহমান ফরিদ জানান, জেলায় চলতি মৌসুমেও সরিষা চাষের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৪৫ হাজার ৪৭১ হেক্টর জমিতে। আর উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৭৫ হাজার ২৬ টন। লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে কিছুটা কম জমিতে সরিষা চাষ হতে পারে। গত বছরও লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয়নি।