কুমিল্লায় বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলতে মায়ের আইফোন নিয়ে গত শুক্রবার বাসা থেকে বের হয় ১৩ বছরের ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম। এরপর নিখোঁজ হয় সে। একদিন পর গতকাল কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন লালমাই পাহাড়ের সানন্দা এলাকার জঙ্গল থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। মাথায় আঘাতের চিহ্ন ছিল বলে জানিয়েছে পুলিশ ও পরিবার।
পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেয়ার উদ্দেশ্যে হত্যাকাণ্ডটি ঘটে থাকতে পারে। তবে তদন্তকারীরা বলছেন, হত্যার প্রকৃত কারণ নিশ্চিত হতে আরো তদন্ত প্রয়োজন। সপ্তম শ্রেণীর শিক্ষার্থী নিহত অপ্রতিম কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষক ড. নাহিদা বেগমের একমাত্র সন্তান।
সিলেটে নিজ বাসা থেকে গত ৬ মে নিখোঁজ হয় শিশু ফাহিমা। দুদিন পর স্থানীয় একটি ডোবা থেকে উদ্ধার করা হয় তার মরদেহ। মামলায় ধর্ষণচেষ্টা ও হত্যার অভিযোগ আনা হয়। সাক্ষ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে আদালত শিশুটির প্রতিবেশী জাকির হোসেনকে মৃত্যুদণ্ড দেন। এছাড়া গত ১৯ মে পল্লবীর একটি অ্যাপার্টমেন্ট থেকে আট বছরের রামিসা আক্তারের মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায়ও ধর্ষণের পর হত্যার তথ্য উঠে আসে। এ মামলায় সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে মৃত্যুদণ্ড দেন আদালত।
ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন হলেও দেশে শিশুর নিরাপত্তার উদ্বেগজনক পরিস্থিতিকেই সামনে আনছে। চলতি বছরের প্রথম আট মাসে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে ১৪ হাজার ৬০২টি। অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৬০টি নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। একই সময়ে বিভিন্ন ধরনের সহিংসতায় নিহত হয়েছে ২৫৪ শিশু। সে হিসাবে গড়ে দৈনিক একজনের বেশি শিশু সহিংসতার শিকার হয়ে প্রাণ হারিয়েছে। সরকারি-বেসরকারি দুই ধরনের পরিসংখ্যানেই উঠে এসেছে নারী ও শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিদ্যমান ব্যবস্থার বড় ঘাটতির এ চিত্র।
পুলিশ সদর দপ্তরের পরিসংখ্যান বলছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত প্রতি মাসেই নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা ছিল এক হাজারের বেশি। এর মধ্যে জানুয়ারিতে ১ হাজার ২৮১টি, ফেব্রুয়ারিতে ১ হাজার ১৮১, মার্চে ১ হাজার ৪৮৫ট এপ্রিলে ২ হাজার ১১, মে মাসে ১ হাজার ৯৫২, জুনে ২ হাজার ২০০, জুলাইয়ে ২ হাজার ৩৩৬ ও আগস্টে ২ হাজার ১৫৬টি ঘটনা রেকর্ড হয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান রেজাউল করিম সোহাগ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘নারী ও শিশুর ওপর সহিংসতার এত বেশি ঘটনা ঘটার অর্থ হলো তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়ে প্রত্যাশিত ফলাফল দেখা যাচ্ছে না। শুধু ঘটনা ঘটার পর বা রিঅ্যাক্টিভ ব্যবস্থা নিলে এ ধরনের অপরাধ কমানো সম্ভব নয়; অপরাধের ঝুঁকিপূর্ণ কারণগুলো চিহ্নিত করে আগেই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা বা প্রো-অ্যাক্টিভ ব্যবস্থা নিতে হবে। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্থানীয় প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। পাশাপাশি প্রতিটি ঘটনার প্রকৃত তদন্ত সাপেক্ষে দৃশ্যমান বিচার নিশ্চিত করা গেলে অপরাধীদের মধ্যে শাস্তির ভয় তৈরি হবে এবং নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা জোরদার করা সম্ভব হবে।’
এদিকে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) জানুয়ারি-আগস্টের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিভিন্ন ধরনের সহিংসতায় নিহত ২৫৪ শিশুর প্রায় ৪৩ শতাংশই ১৩ থেকে ১৮ বছর বয়সী। শূন্য থেকে ছয় বছর বয়সী শিশুও রয়েছে মোট নিহতের প্রায় ২৯ শতাংশ। অর্থাৎ কিশোর-কিশোরীদের পাশাপাশি একেবারে ছোট শিশুরাও সহিংসতার বড় ঝুঁকিতে রয়েছে।
জানতে চাইলে আসকের নির্বাহী পরিচালক তাহমিনা রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনাগুলোকে বিচ্ছিন্ন হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। আট মাসে ১৪ হাজার ৬০২টি নির্যাতনের ঘটনা এবং ২৫৪ শিশু নিহত হওয়ার তথ্যই পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরে।’
অপরাধ করে পার পাওয়ার সুযোগ থাকলে অপরাধীরা আরো উৎসাহিত হয় জানিয়ে তিনি বলেন, ‘শিশুরা নিজেদের নিরাপত্তা নিজেরা নিশ্চিত করতে পারে না। তাই ঝুঁকিতে থাকা নারী ও শিশুর পাশে পরিবার ও সমাজকে দাঁড়ানোর পাশাপাশি প্রতিটি ঘটনার দ্রুত তদন্ত, কার্যকর বিচার ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।’ নারী ও শিশুর নিরাপত্তাকে রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকার দেয়ার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
১৪ হাজার ৬০২টি নির্যাতনের ঘটনা ও ২৫৪ শিশুর মৃত্যুর এ হিসাব তাই শুধু অপরাধের পরিসংখ্যান নয়; নারী ও শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিদ্যমান ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে বড় প্রশ্নও সামনে আনছে। ঘটনার পর ব্যবস্থা নেয়ার পাশাপাশি কোথায়, কেন ও কীভাবে ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে তা শনাক্ত করে প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়াই এখন বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
পুলিশ সদর দপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (মিডিয়া) এএইচএম শাহাদাত হোসাইন বলেন, ‘নারী ও শিশুদের নিরাপত্তার বিষয়টি পুলিশ অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে। কোনো ঘটনা ঘটলে অভিযোগ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নেয়া হয় এবং প্রতিটি ঘটনাই গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘নারী ও শিশুর সুরক্ষায় পুলিশের পাশাপাশি পরিবার ও সমাজেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। কোনো নির্যাতন বা অপরাধের ঘটনা গোপন না রেখে দ্রুত আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানানো প্রয়োজন। পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে থাকা নারী ও শিশুর বিষয়ে পরিবার ও সমাজের সবাইকে আরো সতর্ক থাকতে হবে।’