স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতে নির্বাহী প্রকৌশলীদের লটারির মাধ্যমে বদলি-পদায়ন করা হচ্ছে: গণপূর্ত মন্ত্রী

গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রী জাকারিয়া তাহের বলেছেন, নির্বাহী প্রকৌশলীদের লটারির মাধ্যমে বদলি-পদায়ন করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে বদলি বাণিজ্য বন্ধ, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত এবং যোগ্য ব্যক্তিকে যোগ্য জায়গায় পদায়ন করার চেষ্টা চলছে।

আজ মঙ্গলবার সচিবালয়ে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে নির্বাহী প্রকৌশলীদের লটারির মাধ্যমে বদলি-পদায়ন নিয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন গৃহায়ন ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী আহম্মদ সোহেল মনজুর, গৃহায়ন ও গণপূর্ত সচিব মো. ওবায়দুর রহমান প্রমুখ।

মন্ত্রী বলেন, গত ৩০ জুলাই ৭৬৭ জন উপসহকারী প্রকৌশলীকে, আগস্টে ২৫৪ জন উপসহকারী প্রকৌশলীকে এবং গত ১৬ আগস্ট ২১৯ জন সহকারী প্রকৌশলী ও ১৯০ জন উপবিভাগীয় প্রকৌশলীকে লটারির মাধ্যমে বদলি ও পদায়ন করা হয়েছে। এ পর্যন্ত মোট ১ হাজার ৪৩০ জনকে লটারির মাধ্যমে বদলি-পদায়ন করা হয়েছে।

তিনি বলেন, মানবিক কারণে কারো বিশেষ প্রয়োজন থাকলে তিনি আবেদন করতে পারবেন। বিশেষ করে যাদের ছোট বাচ্চা আছে, যেসব নারী কর্মকর্তা গর্ভবতী, যাদের অসুস্থ বাবা-মা আছেন কিংবা যারা গুরুতর শারীরিক রোগে আক্রান্ত, তারা আবেদন করতে পারবেন। ইতিমধ্যে কয়েকজন মানবিক কারণে আবেদন করেছেন। তাদের সুবিধা অনুযায়ী পদায়নের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। আমাদের উদ্দেশ্য কাউকে হয়রানি করা নয়; বরং সবাই যেন সমান সুযোগ পান এবং পুরো প্রক্রিয়াটি যেন মানবিক ও স্বচ্ছ হয়।

জাকারিয়া তাহের বলেন, আজকের কার্যক্রম মূলত নির্বাহী প্রকৌশলীদের বদলি-পদায়ন নিয়ে। এ বিষয়ে মন্ত্রণালয় ও গণপূর্ত অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বেশ কিছুদিন ধরে কাজ করছেন। আমাদের কিছু গুরুত্বপূর্ণ জায়গা আছে, যেখানে যোগ্য কর্মকর্তাদের পদায়ন করা প্রয়োজন। এ জন্য বিভিন্ন ধরনের ধরন ও শ্রেণী নির্ধারণ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট জোনের মধ্যেই লটারি হতে পারে।

তিনি বলেন, আমাদের প্রায় ২০টি গুরুত্বপূর্ণ জোন বা বিভাগ আছে, যেখানে সবচেয়ে ভালো কর্মকর্তাদের পদায়ন করতে হয়। আমরা চেষ্টা করছি, এ ধরনের পদে পদায়নের জন্য সবচেয়ে যোগ্য ২০ জনকে চিহ্নিত করতে। বিভিন্ন সংস্থার প্রতিবেদন ও কর্মকর্তাদের অতীতের চাকরির অভিজ্ঞতা পর্যালোচনা করে তাঁদের চিহ্নিত করার জন্য যথেষ্ট কাজ করা হয়েছে। এই ২০ জনের মধ্যে লটারির মাধ্যমে নির্ধারণ করা হবে কে কোন জায়গায় যাবেন। যাতে কেউ নিজের পছন্দ অনুযায়ী পদায়ন নির্ধারণ করে দিতে না পারেন, সে চেষ্টা করা হচ্ছে।

গণপূর্ত অধিদপ্তরকে স্বচ্ছ, গতিশীল ও জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের কথা জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, আমাদের উদ্দেশ্য একটাই—বদলি বাণিজ্য বন্ধ করা, সুশাসন ফিরিয়ে আনা এবং সবাইকে সমান সুযোগ দেওয়া। যোগ্যতা অনুযায়ী যোগ্য ব্যক্তিকে যোগ্য জায়গায় বসানোই আমাদের লক্ষ্য। বিশেষ করে রূপপুর নিয়ে গণপূর্ত বিভাগের যে বদনাম হয়েছে, সেখান থেকে আমরা বেরিয়ে আসতে চাই। আমরা গণপূর্ত বিভাগকে স্বচ্ছ, গতিশীল ও জবাবদিহিমূলক অবস্থানে নিয়ে যেতে চাই।

তিনি আরো বলেন, ‘আমাদের মন্ত্রণালয়ের অধীন প্রতিষ্ঠানগুলোতে সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার চেষ্টা করব। আমরা এখন গণপূর্ত অধিদপ্তর নিয়ে কাজ করছি। শেষ পর্যায়ে এসে গেছি। এরপর রাজউক নিয়ে কাজ করব।

ভূমি ব্যবস্থাপনায় দুর্নীতির অভিযোগ প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, আমাদের প্রতিটি বিভাগের জমি-জমা-সংক্রান্ত বিষয়গুলো নিয়ে কিছু দুর্নীতির কথাবার্তা শোনা যায়। আমরা ইতিমধ্যে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় এবং এর অধীন উন্নয়ন কর্তৃপক্ষগুলোকে একটি ল্যান্ড ব্যাংক তৈরির নির্দেশনা দিয়েছি। এই সরকারের মেয়াদের মধ্যেই যতটা সম্ভব ভূমি ব্যবস্থাপনাকে ডিজিটাল করার চেষ্টা করছি। আমাদের কোন কোন জমি আছে, কোনগুলো আমাদের দখলে রয়েছে, আর কোনগুলো দখলের বাইরে—সবকিছু চিহ্নিত করে সে অনুযায়ী কাজ করা হবে।

আবাসন বরাদ্দে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার বিষয়ে তিনি বলেন, আবাসন নিয়ে অনেক কথা ছিল—কে আবাসন পান, কে পান না। আমরা এরই মধ্যে বিষয়টি ডিজিটাল ব্যবস্থার মধ্যে নিয়ে যাচ্ছি। এ সপ্তাহের মধ্যেই প্রকল্পটি চালু করব। মূল কথা হলো, আমাদের মন্ত্রণালয়ে সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা থাকতে হবে।

দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা কর্মকর্তাদের চিহ্নিত করা হয়েছে কিনা— সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, আমরা বিস্তারিতভাবে কর্মকর্তাদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করেছি। বিশেষ করে নির্বাহী প্রকৌশলীরা অনেক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। তাদের অধীনে একটি বিভাগ পরিচালিত হয়। এ কারণে তাদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে আমরা সময় নিয়েছি। মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তরসহ বিভিন্ন সূত্র থেকে পর্যাপ্ত তথ্য সংগ্রহ করেছি। কর্মকর্তাদের অতীতের চাকরির রেকর্ডসহ বিভিন্ন বিষয় পর্যালোচনা করে কার কোথায় পদায়ন হবে, সে বিষয়ে প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে।

লটারির আওতায় কতজন নির্বাহী প্রকৌশলী থাকবেন—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমরা ১৫৫ জনের লটারি করছি। সব বিভাগের মধ্যেই এ কার্যক্রম হবে। তবে তিন থেকে চারটি জায়গা হয়তো আপাতত স্থগিত রাখা হচ্ছে। এগুলোর মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, রাষ্ট্রপতির কার্যালয় ও সংসদ সচিবালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ জায়গা রয়েছে।

মন্ত্রী বলেন, পর্যায়ক্রমে আমরা সব জায়গায় কাজ করব। আপনাদের মাধ্যমে সবাইকে জানাতে চাই, আমাদের অধীন প্রতিষ্ঠানগুলোতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করব। এ ক্ষেত্রে কোনো আপস নেই, শূন্য সহনশীলতা নীতি অনুসরণ করা হবে। আমাদের মূল লক্ষ্য হলো, যেকোনো প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ করা। ডিজিটাল ব্যবস্থা কিংবা লটারির মাধ্যমে—যেভাবেই হোক, উদ্দেশ্য একটাই।

সরকারি প্রতিষ্ঠানের জমি অবৈধ দখলমুক্ত করার বিষয়ে তিনি বলেন, সরকারের যেসব জায়গা দখল হয়েছে, সেগুলো উদ্ধারের জন্য কাজ চলছে। আমাদের কী পরিমাণ জমি রয়েছে, তার সঠিক তথ্য ডিজিটাল ব্যবস্থায় নিয়ে আসছি। ল্যান্ড ব্যাংক তৈরি করছি। কোন জমি আমাদের, কোনটি আমাদের দখলে রয়েছে এবং কোনটি দখলের বাইরে, সেগুলো চিহ্নিত করে পরবর্তী পদক্ষেপ নেয়া হবে।

সচিবালয় পুরাতন বাণিজ্য মেলার মাঠে স্থানান্তরের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের পরবর্তী পদক্ষেপ জানতে চাইলে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রী বলেন, সচিবালয় নিয়ে এই কার্যক্রম প্রায় চার মাস আগে শুরু হয়েছিল। গত সরকারের সময়ে এ বিষয়ে একটি মহাপরিকল্পনা ছিল। আমাদের এখানে এক নম্বর ভবনটি ভেঙে নতুন ভবন নির্মাণের কথা ছিল। বিষয়টি মন্ত্রিসভায় আলোচনার সময় সংসদ ভবন ও আগারগাঁও এলাকাকে দ্বিতীয় রাজধানী হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনার প্রসঙ্গ সামনে আসে। তখন নীতিগতভাবে সিদ্ধান্ত হয়, বিষয়টি নিয়ে একটি সমীক্ষা করা হবে। আমরা এখন সে অনুযায়ী কাজ করছি।

তিনি বলেন, আগামী মন্ত্রিসভার বৈঠকে বিষয়টি উঠতে পারে। মন্ত্রিসভা যদি সেখানে নতুন সচিবালয় নির্মাণের সিদ্ধান্ত দেয়, তাহলে দ্রুত কাজ শুরু করার জন্য প্রাথমিক কার্যক্রম আমরা প্রস্তুত করে রেখেছি। তবে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। সে কারণে এ বিষয়ে বিস্তারিত বলতে চাচ্ছি না।

প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা সম্পর্কে জানতে চাইলে মন্ত্রী বলেন, এই সরকারের মেয়াদেই আমরা কাজটি পুরোপুরি শেষ করার চেষ্টা করব। আগামী মন্ত্রিসভায় যদি সিদ্ধান্ত হয় যে সেখানে সচিবালয় নির্মাণ করা হবে, তাহলে প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছা অনুযায়ী এই মেয়াদের মধ্যেই কাজটি সম্পন্ন করার চেষ্টা করব। তিনি সেখানে অফিস করতে চান।

সচিবালয়ের বর্তমান অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা তুলে ধরে তিনি বলেন, এখানে যে পরিমাণ জায়গা রয়েছে, তা যথেষ্ট নয়। কয়েকটি মন্ত্রণালয় সচিবালয়ের বাইরে রয়েছে। পার্কিংয়ের অবস্থা আপনারা নিজেরাই দেখেন। প্রতিটি মন্ত্রণালয়কে পর্যাপ্ত জায়গা দেয়া যাচ্ছে না। ভবনগুলোর অবস্থাও খুব ভালো নয়। অধিকাংশ ভবন ১৯৬০-এর দশকে তৈরি। আমাদের ভবনগুলো অনেক পুরনো হয়ে গেছে। এখানে থাকলেও প্রতিটি ভবন নতুন করে নির্মাণ করতে হবে। সবকিছু বিবেচনায় নিয়েই নতুন সচিবালয়ের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।

নতুন সচিবালয়ের আয়তন ও ব্যয় সম্পর্কে জানতে চাইলে মন্ত্রী বলেন, আমরা এখনো ধারণাগত পরিকল্পনা তৈরি করছি। মন্ত্রিসভা অনুমোদন দিলে বিস্তারিত পরিকল্পনায় যাব। এ কারণে এখনই টাকা-পয়সা নিয়ে কথা বলতে চাইছি না। তবে আমাদের ধারণাগত পরিকল্পনায় প্রায় ৩০ লাখ থেকে ৩২ লাখ বর্গফুট জায়গার কথা রয়েছে। বর্তমান সচিবালয়ে প্রায় ১৫ লাখ বর্গফুট জায়গা আছে। অর্থাৎ নতুন জায়গায় এর প্রায় দ্বিগুণ আয়তনের প্রয়োজন হতে পারে।

পুরনো ভবনগুলো ভবিষ্যতে কীভাবে ব্যবহার করা হবে, সে বিষয়ে তিনি বলেন, এ বিষয়ে এখনো সিদ্ধান্ত হয়নি। পুরনো ভবনগুলো ব্যবহারযোগ্য থাকলে সেগুলো অন্য সরকারি দপ্তরের কাজে ব্যবহার করা হতে পারে। এ বিষয়ে সরকার পরবর্তী সময়ে সিদ্ধান্ত নেবে।

আরও