বাবার উৎসাহে মাতৃভূমিকে শত্রুমুক্ত করতে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন রংপুরের আকলিমা

শক্ত মানসিকতার কিশোরী আকলিমা ভারতে পৌঁছে অন্য অনেকের মতো চুপচাপ বসে থাকতে চাননি। দেশকে শত্রুমুক্ত করতে সুযোগ খুঁজতে থাকেন। অবশেষে বাবার উৎসাহে তার আপন ভাই খন্দকার আলতাফ হোসেনের সঙ্গে ভারতের চেংড়াবান্ধা এলাকার ট্রেনিং সেন্টারে আর্মস ও নার্সিং বিষয়ক প্রশিক্ষণ নেন

বাবার উৎসাহ-অনুপ্রেরণা ও নিজ মাতৃভূমিকে শত্রুমুক্ত করতে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন রংপুরের আকলিমা খন্দকার। নিশ্চিত মৃত্যু জেনেও কোনো প্রতিবন্ধকতা বা পিছুটান বাধা হতে পারেনি কিশোরী আকলিমার চলার পথে।

রংপুর নগরীর শালবন এলাকার স্থায়ী বাসিন্দা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক মৃত খন্দকার আদম হোসেন ও মৃত আজিজা খাতুন দম্পতির ৮ ছেলেমেয়ের মধ্যে আকলিমা দ্বিতীয়। ১৯৭১ সালে তিনি সবেমাত্র এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে কলেজে ভর্তি হওয়ার চেষ্টা করছেন।

তখন (২৫শে মার্চ ) পাকিস্তানি সেনাবাহিনী অপারেশন সার্চলাইট চালিয়ে দেশব্যাপী নিরস্ত্র বাঙালিদের ওপর গণহত্যা শুরু করে। আত্মরক্ষার্থে আকলিমা পরিবারের সঙ্গে গঙ্গাচড়া উপজেলার তিস্তা নদী দিয়ে অনেকের মতো ভারতের সিতাই এলাকায় প্রবেশ করেন। কিন্তু শক্ত মানসিকতার কিশোরী আকলিমা ভারতে পৌঁছে অন্য অনেকের মতো চুপচাপ বসে থাকতে চাননি। দেশকে শত্রুমুক্ত করতে সুযোগ খুঁজতে থাকেন। অবশেষে বাবার উৎসাহে তার আপন ভাই খন্দকার আলতাফ হোসেনের সঙ্গে ভারতের চেংড়াবান্ধা এলাকার ট্রেনিং সেন্টারে আর্মস ও নার্সিং বিষয়ক প্রশিক্ষণ নেন।

আকলিমা খন্দকার জানান, এ প্রশিক্ষণগুলো দিত বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। তবে তিন মাসের প্রশিক্ষণ তিনি সুস্থভাবে শেষ করলেও তার ভাই আলতাফ অসুস্থতাজনিত কারণে প্রশিক্ষণ শেষ করতে ব্যর্থ হন। প্রশিক্ষণ শেষে আরো ৪ জন নারী মুক্তিযোদ্ধার সঙ্গে তাকে দেয়া হয় যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের নিরাপত্তা ও সেবার দায়িত্ব। আগস্টে তারা লালমনিরহার জেলা সরকারি হাসপাতালে কাজ শুরু করেন।

সেসময়ের কাজের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে আকলিমা জানান, সারা জেলা তখন ধূ-ধূ মরুভূমি। কোথাও কেউ নেই। বাসিন্দারা বাড়িঘর দোকানপাট ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ফেলে যে যেভাবে পেরেছেন জীবন বাঁচাতে নিরাপদ স্থানে চলে গেছেন। এমনকি অনেকে ঘরের তালা মারার সময় পর্যন্ত পাননি। চারিদিকে ভূতুড়ে পরিবেশ। এ পরিবেশে হাসপাতালে ছিলেন দুজন ডাক্তার, একজন নার্স আর তারা পাঁচজন। হাসপাতালে রোগী বলতে যুদ্ধাহত ৩০ জন মুক্তিযোদ্ধা। যারা বিভিন্ন স্থানে যুদ্ধ চলাকালীন সময় আহত হয়েছেন। এদের মধ্যে অনেকেই ছিলেন গুরুতর অসুস্থ। কিন্তু ওষুধ থেকে শুরু করে চিকিৎসা যন্ত্রপাতি সবকিছুই অপ্রতুল। এগুলো দিয়েই কোনো রকমে তাদের সেবা কার্যক্রম চালিয়ে যেতে হচ্ছিল। সব সময় তাদেরকে সচেষ্ট থাকতে হয়েছে যে কোনো মুহূর্তে পাকিস্তানি বাহিনী বা রাজাকাররা হামলা চালাতে পারে। হাসপাতাল চত্বরে খেয়ে না খেয়ে মাঠে প্রতিদিন পিস্তল চালানো, গ্রেনেড ছোঁড়াসহ মিলিটারি প্রশিক্ষণ নিতেন তারা।

সেসময়ের মুক্তিযোদ্ধাদের নাম ঠিকমতো মনে না করতে পারলেও তখনকার কিছু চিত্র এখনো আকলিমার চোখে ভাসে। কয়েকটি বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বলেন, এমন একজন মুক্তিযোদ্ধা চিকিৎসা নিয়েছিলেন যুদ্ধে যার হাঁটুতে গুলি লেগে অবস্থা খারাপ হয়ে গেছিল। তার উন্নত চিকিৎসার প্রয়োজন থাকলেও তা দেয়া সম্ভব হয়নি। এক সময় পায়ে পচন ধরার উপক্রম হয়েছিল। কিন্তু তারপরও তার মুখে কখনো কষ্টের ছাপ ছিল না। তবে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর পরাজয়ের সংবাদ শুনে উচ্ছ্বসিত হতেন তারা।

আরেকজন আহত মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। একদিন খবর আসে, সেই মুক্তিযোদ্ধার সন্তান জন্মগ্রহণ করার পরপরই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছে। কিন্তু তাকেও বলতে শোনা গেছে, তার এক সন্তান গেছে তো কী হয়েছে। দেশ স্বাধীনের পর যখন বিজয় উদযাপন হবে সেই মিছিলে হাজারো সন্তান অংশগ্রহণ করবে। তাদের মধ্যেই তার নিজের সন্তানের মুখ দেখতে পাবেন। আবার আরেক মুক্তিযোদ্ধার কানের মধ্যে গুলি ঢুকে বের হয়ে গেছে। সেদিকে তাকালেই বিরাট গর্ত দেখা যায়। ব্যথায় সারাক্ষণ অস্থির থাকলেও দেশ হানাদারমুক্ত হচ্ছে এ খবরে তার সকল ব্যথা যেন নিমেষে দূর হয়ে যাচ্ছে। এগুলো দেখা অন্যরকম অনুভূতি। মাতৃভূমির প্রতি কী ধরনের টান থাকলে একজন মানুষ হাসিমুখে মৃত্যুকে বরণ করে নিতেও দ্বিধা করে না।

অবশেষে দীর্ঘ ৯ মাসের যুদ্ধ শেষে ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ বিজয় অর্জন করে। দেশ স্বাধীনের পর আকলিমা হিসাবরক্ষণ অফিসে যোগদান করেন। বর্তমানে অবিবাহিত আকলিমা অবসর জীবনযাপন করছেন। মুক্তিযোদ্ধারা মুক্তিযোদ্ধা ভাতা পেলেও দীর্ঘ ৪২ বছর চাকুরীজনিত কারণে তিনি কোনো ভাতা নেননি।

তবে তিনি নিজেকে নারী মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে পরিচিত করতে চান না। বরং নিজেকে একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে পরিচয় দিতে স্বাচ্ছন্দ বোধ করেন তিনি।

রংপুর জেলা ও মহানগর মুক্তিযোদ্ধা ইউনিট কমান্ড সূত্রে জানা গেছে, রংপুর জেলায় জীবিত মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা ৭০০ জন আর মহানগরে জীবিত মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা ১৮৭ জন।

আরও