সুন্দরবন দর্শনার্থী ও বন-সংলগ্ন এলাকার বাসিন্দারা বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ে সুন্দরবনে হরিণের সংখ্যা বেড়েছে। এর বাঁকে বাঁকে এখন হরিণের দেখা পাওয়া যায়। বনের খাল বা নদীর ধারে দল বেঁধে হরিণের চলাফেরার দৃশ্য হরহামেশা চোখে পড়ছে। সুন্দরবনে মায়া ও চিত্রা নামের দুই প্রজাতির হরিণ দেখা যায়। তবে হরিণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে নিধনও। চোরা শিকারি চক্র অবাধে হরিণ শিকার করে চলেছে।
অভিযোগ রয়েছে, কিছু অসৎ বন কর্মকর্তা-রক্ষীদের সহায়তায় সারা বছরই সুন্দরবনে হরিণ শিকার করে স্থানীয় চিহ্নিত কয়েকটি চোরা শিকারি চক্র। তবে উৎসব এলে তা আরো বেড়ে যায়। এসব শিকারির ফাঁদে শুধু হরিণই নয়, আটকা পড়ছে বন্য শূকর ও বাঘ। এর মধ্যে গত ১২ মে দুপুরে খুলনার ডুমুরিয়ায় হরিণের মাংসসহ এক ব্যক্তিকে আটক করে পুলিশ। পরে জব্দ করা সেই মাংস ভাগ করে নেয়া এবং অভিযুক্তকে ছেড়ে দেয়ার অভিযোগ উঠে দুই পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে। প্রাথমিকভাবে অভিযোগ প্রমাণ হওয়ায় পুলিশের ওই দুই সদস্যকে খুলনা পুলিশ লাইনসে সংযুক্ত করা হয়।
এছাড়া গত ২৭ মে রাত সাড়ে ১০টার দিকে পশ্চিম সুন্দরবনের কালাবগির কালসার খালপার এলাকায় বন বিভাগের একটি টহল দল সাদ্দাম বৌদ্ধ, শফিকুল বৌদ্ধ, রুবেল মোল্লা, আমজাদ মোল্লা ও শরিফুল সরদারকে বিষ প্রয়োগে ধরা প্রায় ৩০০ কেজি চিংড়িসহ আটক করে। পরে কালাবগি ফরেস্ট স্টেশন কর্মকর্তা আব্দুস সালামের বিরুদ্ধে তাদের ছেড়ে দেয়ার অভিযোগ উঠে। তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন বন বিভাগের কালাবগি ফরেস্ট স্টেশন কর্মকর্তা আব্দুস সালাম। তিনি দাবি করেন, আটককৃত ব্যক্তিদের কাছে দুটি নৌকার পাশ এবং অল্প পরিমাণে মাছ পাওয়ায় তাদের ছেড়ে দেয়া হয়।
সুন্দরবন-সংলগ্ন এলাকার বাসিন্দারা বলছেন, একশ্রেণীর চোরা শিকারির দৌরাত্ম্যে হুমকির মুখে সুন্দরবনের প্রাণিসম্পদ। সুন্দরবন-সংলগ্ন বিভিন্ন গ্রামে রয়েছে চিহ্নিত কয়েকটি চোরাশিকারি ও বন্যপ্রাণী পাচারকারী চক্র। তাদের কেউ কেউ বংশপরম্পরায় সুন্দরবনের বন্যপ্রাণী শিকারে জড়িত। এ বন অপরাধী চক্রের রয়েছে গডফাদার। তাদের কেউ কেউ চলেন রাজনৈতিক ছত্রছায়ায়। উৎসব এলেই সুন্দরবন-সংলগ্ন এলাকায় হরিণের মাংসের চাহিদা বেড়ে যায়। অবৈধ জেনেও হরিণের মাংস কেনেন অনেক মানুষ। ধনাঢ্য ব্যক্তিরা হরিণের মাংস দিয়ে উৎসব পালন করেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে সুন্দরবন-সংলগ্ন এলাকার কয়েকজন বাসিন্দা জানান, সুন্দরবনে দেড়শরও অধিক চোরা শিকারি চক্র সক্রিয়। এসব পেশাদার শিকারি জেলের ছদ্মবেশে মাছ ধরার জালের সঙ্গে দড়ি নিয়ে বনে যান। বনের ভেতরেই সেই দড়ি দিয়ে হরিণ ধরার ফাঁদ তৈরি করেন। বনের ভেতরে মাংস কেটে লোকালয়ে এনে বিক্রি এবং স্থানীয় পদ্ধতিতে চামড়া, মাথাসহ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংরক্ষণ করে পাচার করা হয়। শিকার শেষে ফিরে যাওয়ার সময় ফাঁদগুলো বস্তায় ভরে জঙ্গলের ভেতর মাটি খুঁড়ে পুঁতে রাখা হয়। সময়-সুযোগ মিললে তারা আবার শিকারে আসেন। এসব শিকারির সঙ্গে যোগাযোগ থাকে এজেন্ট-ব্যবসায়ীদের। এজেন্টদের মাধ্যমে কখনো অগ্রিম অর্ডার, আবার কখনো মাংস এনে তারপর বিক্রি করা হয়। এ চক্রের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন স্থানে পৌঁছে যায় হরিণের মাংস। ক্রেতারাও অনেক সময় প্রতারণা ভেবে হরিণ নিজ চোখে না দেখে মাংস কিনতে চান না। চোরা শিকারিরা তখন জীবন্ত হরিণ লোকালয়ে এনে জবাই করেন। সুন্দরবন-সংলগ্ন এলাকায় প্রতি কেজি হরিণের মাংস ৬০০-৭০০ টাকায় পাওয়া যায়। তবে জেলা শহরে প্রতি কেজি হরিণের মাংসের দাম ১০০০-২০০০ টাকা পর্যন্ত। আস্ত একটি জীবিত হরিণের দাম চাওয়া হয় ১৫-২০ হাজার টাকা।
সুন্দরবন ও বাংলাদেশ উপকূল সুরক্ষা আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক সাংবাদিক শুভ্র শচীন বলেন, ‘যে পরিমাণ হরিণের মাংস ও চামড়া আটক হয়, তার থেকে কয়েক গুণ বেশি পরিমাণ হরিণ শিকার করা হয়। মাঝেমধ্যে দু’একটি অভিযানে হরিণের মাংস, চামড়া, মাথা উদ্ধার হলেও মূল চোরা শিকারি ও পাচারকারী আটক হয় না। অধিকাংশ ক্ষেত্রে হরিণের মাংস বহনকারীরাই ধরা পড়ে। আর যারা আটক হয়, তারা দুর্বল আইনের কারণে কয়েকদিন পর জেল থেকে ফিরে একই কাজে লিপ্ত হন।’
খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক ইমরান আহমেদ বলেন, ‘সুন্দরবনে বিচ্ছিন্ন কিছু হরিণ শিকারের ঘটনা ঘটলেও সেটা আগের চেয়ে তুলনামূলক অনেক কম। শিকারিদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কারণেই সমন্বিত অভিযানে মাংসসহ হরিণ শিকারি ধরা পড়ছে। বিপুল পরিমাণে ফাঁদ জব্দ করা হচ্ছে। তবে সম্প্রতি বনদস্যুদের তৎপরতা, সীমিত জনবল ও ভৌগোলিক জটিলতা এখনো সুন্দরবন রক্ষায় বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে।’
এ বিষয়ে কার্যক্রম জানতে চেয়ে যোগাযোগ করা হলে বাংলাদেশ কোস্টগার্ড পশ্চিম জোন (মোংলা সদর দপ্তর) এবং খুলনার রেঞ্জ ডিআইজির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সুন্দরবন ও উপকূলীয় অঞ্চল দস্যুমুক্ত এবং চোরাচালান ও অবৈধ কর্মকাণ্ড প্রতিরোধে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।