খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল

অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ ও রোগীদের নিম্নমানের খাবার দেয়ার অভিযোগ

দক্ষিণাঞ্চলের স্বাস্থ্যসেবার সবচেয়ে বড় সরকারি প্রতিষ্ঠান খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রোগীদের খাবার নিয়ে চরম অনিয়ম, দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার অভিযোগ উঠেছে।

১৯৮৯ সালে ২৫০ শয্যা নিয়ে যাত্রা শুরু করা হাসপাতালটি পরবর্তী সময়ে ৫০০ শয্যায় উন্নীত করা হয়। প্রতিদিন গড়ে প্রায় দেড় হাজার রোগী ভর্তি থাকে। এছাড়া বহির্বিভাগে আরো ৭০০-৮০০ রোগী প্রতিদিন চিকিৎসাসেবা নিতে আসে। ধারণক্ষমতার চেয়ে তিন গুণ বেশি রোগীর চাপ এবং হাসপাতালে চিকিৎসাসেবার পাশাপাশি খাবারের মান নিয়ে দীর্ঘদিনের ক্ষোভ রয়েছে।

হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ডে ভর্তি থাকা রোগীদের অভিযোগ, এখানকার খাবার কোনোভাবেই মুখে তোলার মতো নয়। অর্থোপেডিক্স ওয়ার্ডের রোগী রায়হান বলেন, ‘রোগীরা এমনিতেই শারীরিক কষ্টে থাকে। এর মধ্যে নিম্নমানের খাবার তাদের জন্য আরো ঝুঁকির কারণ হতে পারে। হাসপাতালের দেয়া পচা মুরগির মাংস খেয়ে আমি নিজেও বমি করি। অনেক রোগী অসুস্থ হয়ে পড়ে।’

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, প্রতি বছর দরপত্রে ঠিকাদারের মাধ্যমে হাসপাতালের রোগীদের খাবার সংগ্রহ করা হয়। একজন রোগীর তিন বেলা খাবারের জন্য সরকারি বরাদ্দ ১৭৫ টাকা। ডায়েট চার্ট অনুযায়ী দুপুরে ব্রয়লার মুরগির মাংস আর রাতে রুই-কাতলা মাছ দেয়ার কথা থাকলেও প্রায় প্রতিদিনই দুপুরের মাংসের পরিবর্তে ডিম, রাতে কম দামের সস্তা মাছ দেয়া হচ্ছে। দুর্গন্ধযুক্ত ভাত, পানির মতো পাতলা ডাল আর নিম্নমানের মাছ ও সবজি খেতে না পেরে বাধ্য হয়ে অনেক রোগী বাইরে থেকে খাবার কিনে খাচ্ছে।

সবচেয়ে ভয়াবহ ঘটনাটি ঘটে ঈদুল আজহার দ্বিতীয় দিন দুপুরে। সেদিন রোগীদের পচা ও দুর্গন্ধযুক্ত মুরগির মাংস দেয়া হয়, যা খেয়ে অনেক রোগী বমি করে স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে হাসপাতালজুড়ে রোগীদের মধ্যে চরম ক্ষোভ ও অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে।

সরজমিনে দেখা গেছে, নিম্নমানের খাবার সরবরাহের পাশাপাশি হাসপাতালের রান্নাঘরের পরিবেশও অত্যন্ত নোংরা ও অস্বাস্থ্যকর। রান্নাঘরে স্টুয়ার্ট ও কুক মশালচির সঙ্গে দুই শিফটে পাঁচজন করে মোট ১০ জন আউটসোর্সিং কর্মচারী কাজ করেন। অপরিষ্কার মেঝে ও নোংরা পাত্রের মাঝেই অপরিশোধিত পানি দিয়ে প্রতিদিন রান্নার কাজ চলছে। এমনকি খোলা অবস্থায় রাখা ভাত ও তরকারির পাশেই ঝাড়ু দিতে দেখা যায়। রান্নাঘরজুড়ে ইঁদুর ও বিড়ালের অবাধ বিচরণ।

অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার পেছনে একটি দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেট জড়িত বলে অভিযোগ উঠেছে। নিয়মবহির্ভূত পদোন্নতি পেয়ে দীর্ঘ সাত বছর ধরে একই স্থানে দায়িত্ব পালন করছেন স্টুয়ার্ট হাবিবুর রহমান। তার বিরুদ্ধে প্রতিদিন রোগীদের জন্য দুটি আলাদা তালিকা তৈরি করে অতিরিক্ত রোগী দেখিয়ে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া রোগীদের জন্য বরাদ্দকৃত খাবার বাইরে পাচার করেন তিনি।

হাসপাতালের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. মোঝাহার আলী জানান, অনিয়মের অভিযোগে ৩ জুন স্টুয়ার্ট হাবিবুর রহমানকে তার দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। এর আগেও ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) হাসপাতালে অভিযান চালানোর পর তাকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছিল। তবে স্বাস্থ্য বিভাগের কিছু অসৎ কর্মকর্তার যোগসাজশে দুই মাস পর তিনি আবার স্বপদে ফিরে আসেন। এছাড়া ঈদুল আজহার দিন ঘটনার পর খাবার সরবরাহের দায়িত্বে থাকা ‘আলহাজ এ রহমান অ্যান্ড সন্স’ ও ‘মেসার্স আল মামুন ট্রেডিং’ নামের দুটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কারণ দর্শানোর নোটিস দেয়া হয়েছে। তবে অভিযুক্ত স্টুয়ার্ট হাবিবুর রহমান তার বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

সার্বিক বিষয়ে হাসপাতালের পরিচালক ডা. কাজী মো. আইনুল ইসলাম জানান, হাসপাতালে জনবল সংকটসহ নানা সমস্যা রয়েছে। তিনি ২০২৫ সালের আগস্টে যোগদানের পর থেকে হাসপাতালের রান্নাঘর নিয়মিত তদারকি করছেন। সমস্যাগুলো পর্যায়ক্রমে সমাধানের চেষ্টা চালাচ্ছেন।

তবে ভুক্তভোগীদের দাবি, সরকারি হাসপাতালে রোগীদের পুষ্টিকর ও স্বাস্থ্যসম্মত খাবার নিশ্চিত করতে দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে স্থায়ী ও কঠোর ব্যবস্থা নেয়া অত্যন্ত জরুরি।

আরও