আইএলওর প্রতিবেদন

বাংলাদেশের উচ্চ শিক্ষিত নারীদের মাত্র ৫% কর্মজীবী

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নারীরা তুলনামূলকভাবে কম মজুরির পেশায় বেশি নিয়োজিত। মজুরিভিত্তিক কর্মসংস্থানে থাকা নারীদের ৪১ শতাংশ উৎপাদন খাতে কাজ করেন, যেখানে পুরুষদের ক্ষেত্রে এ হার ২৩ শতাংশ। এছাড়া ১৯ শতাংশ নারী গৃহস্থালি কাজে এবং ১২ শতাংশ শিক্ষা খাতে নিয়োজিত।

বাংলাদেশের উচ্চ শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর প্রায় ৩৫ শতাংশ নারী। তবে এ নারীদের মাত্র ৫ শতাংশ কর্মজীবী। বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত কর্মজীবী নারীরাও গড়ে পুরুষদের তুলনায় ২২-২৫ শতাংশ কম আয় করেন। অর্থাৎ একজন পুরুষ যেখানে দিনে ১ হাজার টাকা আয় করেন, সেখানে নারীর গড় আয় দাঁড়ায় ৭৫০-৭৮০ টাকা।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) ‘বাংলাদেশে নারী-পুরুষের মজুরি ব্যবধান: প্রবণতা, কারণ ও নীতিগত করণীয়’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এসব উঠে এসেছে। সংস্থাটি ২০২৩ সালের শ্রমশক্তি জরিপের তথ্য বিশ্লেষণ করে ১৭ সেপ্টেম্বর প্রতিবেদনটি প্রকাশ করেছে।

সংস্থাটি বলছে, নারী ও পুরুষের মজুরিতে পার্থক্য থাকলেই যে একই কাজের জন্য তাদের ভিন্ন হারে মজুরি দেয়া হচ্ছে এমন নয়। পেশা, খাত, কর্মঘণ্টা ও কাজের অন্যান্য বৈশিষ্ট্যের পার্থক্যও মজুরির ব্যবধানে প্রভাব ফেলতে পারে। আইএলওর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে বাংলাদেশে পুরুষের কর্মসংস্থানের হার ছিল ৭৭ দশমিক ৯ শতাংশ, যেখানে নারীর হার ছিল ৪০ দশমিক ২ শতাংশ। ফলে নারী ও পুরুষের কর্মসংস্থানের হারে ব্যবধান ছিল ৩৭ দশমিক ৭ শতাংশীয় পয়েন্ট। কর্মরত পুরুষদের ৪৮ শতাংশ মজুরিভিত্তিক কাজে নিয়োজিত থাকলেও নারীদের ক্ষেত্রে এ হার ছিল মাত্র ১৯ শতাংশ।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নারীরা তুলনামূলকভাবে কম মজুরির পেশায় বেশি নিয়োজিত। মজুরিভিত্তিক কর্মসংস্থানে থাকা নারীদের ৪১ শতাংশ উৎপাদন খাতে কাজ করেন, যেখানে পুরুষদের ক্ষেত্রে এ হার ২৩ শতাংশ। এছাড়া ১৯ শতাংশ নারী গৃহস্থালি কাজে এবং ১২ শতাংশ শিক্ষা খাতে নিয়োজিত।

কর্মীদের বয়স বাড়ার সঙ্গে নারী-পুরুষের মজুরি ব্যবধানও বাড়ে। তবে উচ্চ শিক্ষিত ও উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন পেশায় নিয়োজিত কর্মীদের মধ্যে এ ব্যবধান তুলনামূলক কম। আনুষ্ঠানিক খাতের তুলনায় অনানুষ্ঠানিক খাতে নারী-পুরুষের মজুরি ব্যবধান বেশি বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

গৃহস্থালি কাজের বাড়তি দায়িত্বকেও নারী-পুরুষের মজুরি ব্যবধানের একটি কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে আইএলও। বেতনভোগী নারীরা সপ্তাহে গড়ে ২৭ দশমিক ৭ ঘণ্টা গৃহস্থালি কাজে ব্যয় করেন, যেখানে পুরুষরা ব্যয় করেন ৭ দশমিক ৬ ঘণ্টা। বেতনভোগী ও গৃহস্থালি কাজ মিলিয়ে নারীরা সপ্তাহে গড়ে ৭৩ দশমিক ৭ ঘণ্টা কাজ করেন, আর পুরুষরা করেন ৫৯ ঘণ্টা। আইএলও বলছে, গৃহস্থালি কাজে বেশি সময় ব্যয় করায় নারীদের উচ্চ মজুরির কাজ গ্রহণ ও ক্যারিয়ারে অগ্রসর হওয়ার সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের ব্যবস্থাপনা পর্যায়ে নারীর অংশগ্রহণ অত্যন্ত কম। ব্যবস্থাপনা পদে কর্মরতদের মধ্যে নারীর হার মাত্র ৬ দশমিক ২ শতাংশ। দক্ষিণ এশিয়ায় এ হার ১০ দশমিক ৮ ও বৈশ্বিক গড় ৩০ শতাংশ। বাংলাদেশের সংবিধানে নারী-পুরুষের সমান অধিকারের নিশ্চয়তা রয়েছে। শ্রম আইনেও সমান মজুরি ও কর্মপরিবেশের বিধান আছে। তবে আইএলও বলছে, সমান মজুরি বিধানের বাস্তব প্রয়োগ এখনো সীমিত। ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণের আওতায় সব খাত সমানভাবে অন্তর্ভুক্ত নয়। এছাড়া নারীর অংশগ্রহণ বেশি এমন খাতগুলোয় কাজের মূল্যায়নের ক্ষেত্রে লিঙ্গভিত্তিক পক্ষপাত রয়েছে কিনা, বর্তমান মজুরি নির্ধারণ ব্যবস্থায় সেটিও স্পষ্টভাবে বিবেচনা করা হয় না।

প্রতিবেদনে নারী-পুরুষের মজুরি বৈষম্য কমাতে বেশকিছু সুপারিশ করেছে আইএলও। এর মধ্যে রয়েছে একই ধরনের কাজের জন্য সমান মজুরির নীতি কার্যকর করা, কাজের মূল্যায়নে নিরপেক্ষ পদ্ধতি চালু, ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণে লিঙ্গবৈষম্যের বিষয়টি বিবেচনায় নেয়া, মাতৃত্ব ও পিতৃত্বকালীন ছুটির বিধান পুনর্বিবেচনা, কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা ও হয়রানি প্রতিরোধ নিশ্চিত করা এবং শ্রম পরিদর্শন ও বিরোধ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা জোরদার করা।

আরও