আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী। বণিক বার্তার কাছে দেশের চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার প্রসঙ্গে তার নিজস্ব মূল্যায়ন তুলে ধরেছেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আনিকা মাহজাবিন
আপনি ২০০১-০৪ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ সরকারের বাণিজ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন। অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থ ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কাজকে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?
বাণিজ্য বা আর্থিক খাতসহ অর্থনীতির সঙ্গে জড়িত যে অন্যান্য খাত রয়েছে সেগুলোর ভিত্তি হলো স্বচ্ছতা ও লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড। মুক্তবাজার অর্থনীতির ভিত্তিতে সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। এছাড়া আরো একটি বিষয় হলো সরকারের ওয়াচডগ অর্থাৎ মনিটর করা। গত ১৫ বছরে শেখ হাসিনা সরকারের শাসনামলে বাংলাদেশ মুক্তবাজার অর্থনীতি থেকে সরে অলিগার্কিক (গোষ্ঠীতান্ত্রিক) অর্থনীতিতে চলে গেছে। তার ফলে এখানে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তো ছিলই না, বরং সরকারের কিছু লোকজনের হাতে অর্থনীতিকে দিয়ে দেয়া হয়। দেশের সম্পদ ক্রমান্বয়ে তাদের হাতে তুলে দিয়েছে। বাণিজ্য, বিনিয়োগ, অবকাঠামোগত উন্নয়নসহ সবকিছুতেই একটি সুবিধাভোগী গোষ্ঠী পুরো অর্থনীতিটাকে তাদের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে। পুরোপুরি একটি মাফিয়া অর্থনীতি, যার ফলে মুক্তবাজার অর্থনীতির ফেয়ার ট্রেডের যে জায়গা থাকার কথা এবং সেখানে যারা সত্যিকার প্রাইভেট সেক্টরের প্লেয়ার ছিল তাদের জায়গা ক্রমান্বয়ে সংকুচিত হয়েছে।
সর্বস্তর থেকেই সংস্কারের আওয়াজ উঠছে। অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষে সবগুলো করা সম্ভবও নয়। কোন সংস্কারগুলো অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত বলে মনে করেন?
যেসব সংস্কারের জন্য জাতীয় ঐকমত্য এখন আছে। অনেকগুলো সংস্কারের জন্য অলরেডি জাতীয় ঐকমত্য আছে যেমন আমরা বলছি দুবারের অধিক কেউ প্রধানমন্ত্রী থাকবে না, দুটি হাউজ হবে অর্থাৎ যেসব বিষয়ে জাতীয় ঐকমত্য হয়ে গেছে সেগুলো তো কালকে সকালেও করতে পারে। কালকে সকালে বলতে মেটাফোরিক্যালি বলছি। অর্থাৎ এটি খুব সহসা করা যায়। আর যেখানে জাতীয় ঐকমত্য হবে না সেখানে রাজনৈতিক দলগুলো তাদের এজেন্ডার মধ্যে, ইশতেহার হিসেবে জনগণের কাছে নিয়ে যাবে এবং জনগণের মতামত নিয়ে তারা সংস্কার করবে। নিজস্ব ভাবনাগুলো জাতীয় সংসদে নিয়ে পাস করাবে। এটাই গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া।
আমি যদি গণতান্ত্রিক অর্ডারে বিশ্বাস করি, জনগণকে দেশের মালিক বলে বিশ্বাস করি, তাদের মালিকানা যদি আপনাকে প্রমাণ করতে হয়, তাহলে তাদের কাছ থেকে আপনাকে ম্যান্ডেট নিতে হবে। তাদের কাছে যেতে হবে। সেটা প্রত্যেকটি দলের অধিকার আছে তার ম্যান্ডেটের জন্য জনগণের কাছে যাওয়া। সেই ম্যান্ডেট নিয়ে সংসদে পাস করা।
অলিগার্কভিত্তিক অর্থনীতির প্রভাব কতদূর পড়েছে?
তোষণমূলক এমন ব্যবস্থার ফলে দ্রব্যমূল্য এ জায়গায় এসেছে। যেখানে বড় বড় পণ্য আমদানি কিছু লোকের হাতে চলে গেছে। তারাই আমদানি করত। ব্যাংক ফ্যাসিলিটি তাদের হাতে চলে গেছে, যার ফলে সৃষ্টি হয়েছে মনোপলি। তারা বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছে এবং পণ্য বিক্রি করেছে তাদের নির্ধারণ করা মূল্যে, যেখানে তারা অত্যধিক মুনাফা পেয়েছে। কিন্তু তা বাজারমূল্যে নয়। এটা সরবরাহ চেইনের একটি দিক। এছাড়া পণ্যটি যখন খুচরা পর্যায়ে এসেছে সেখানে রয়েছে চাঁদাবাজি। প্রত্যেক স্তরে চাঁদাবাজি। অর্থনীতি কিছু লোকের নিয়ন্ত্রণে চলে গিয়েছিল। এখানে মুক্তবাজার অর্থনীতি আর কাজ করেনি।
আর্থিক খাতে লক্ষ করলে তারা একের পর এক ব্যাংক দখল করেছে। ব্যাংকগুলো থেকে বিভিন্ন নামে-বেনামে জালিয়াতি করে টাকা বের করে নিয়ে গেছে। সেই টাকা বিদেশে পাচার করেছে। বিশাল রাজত্ব তারা তৈরি করেছে।
ব্যাংক খাত থেকে বড় একটি অংশ নিয়ে গেলে সেটার যে ‘কস্ট অব ফান্ড’ আছে সেটি গিয়ে পড়েছে সাধারণ ভোক্তার ওপর। তাদের দিতে হয়েছে উচ্চ সুদ। এ কারণে ব্যাংক খাতে সত্যিকার বিনিয়োগকারী ও ব্যবসায়ীদের জন্য টাকার সংকট দেখা দিয়েছে। অন্যদিকে কস্ট অব ফান্ড বেড়ে গেছে। এ টাকা দিতে হয়েছে দেশের সাধারণ মানুষদের।
বিদ্যুতের ক্ষেত্রে দেখা যায় তাদের দলীয় লোকদের সুবিধা দেয়ার জন্য লাইসেন্স দিয়েছে, ফিক্সড চার্জ দিয়েছে। ফলে বিদ্যুৎ সাপ্লাই না দিয়েও তাদের টাকা দেয়া হয়েছে। এদিকে সরকারকে বৈদেশিক মুদ্রায় চুক্তি করতে হওয়ায় আমাদের বৈদেশিক রিজার্ভের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে। অন্যদিকে বিদ্যুতের দাম বেড়ে গেছে। সাধারণ মানুষ ও সাধারণ বিনিয়োগকারীদের উচ্চ মূল্য দিতে হয়েছে। উৎপাদন যারা করছেন তাদের তো খরচ বেড়েছে। বেড়েছে বিদ্যুতের মূল্য। সেটি আবার সাধারণ মানুষকে দিতে হচ্ছে। অর্থাৎ সবকিছু সাধারণ মানুষকে দিতে হয়েছে। এসব উচ্চ মূল্যের জন্য সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস উঠে গেছে। এমনকি টেলিকম তারা একটি সিন্ডিকেট করে নিয়েছে। সিন্ডিকেটের সবাই মিলে সে টাকা আবার ভাগ-বণ্টন করে নেয়। ওখানেও মানুষকে উচ্চ মূল্য দিতে হয়েছে।
তোষণমূলক এ ব্যবস্থা বাজারে কেমন প্রভাব ফেলেছে?
একটি গ্রুপ যখন বাজার সম্পূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রণ করে সে মূল্য কাউকে না কাউকে দিতে হয়। সেটিই জনগণকে দিতে হয়েছে। বাজার মনিটরিংয়ে তো অনেকগুলো ক্ষেত্র আছে। শেয়ারবাজারের আছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। বিএসইসির দায়িত্বে যারা ছিল তারা এবং সরকারি অলিগার্ক সবাই মিলে শেয়ারবাজারকে ইচ্ছেমতো লুটপাট করেছে। শেয়ারবাজারের সাধারণ বিনিয়োগকারীরা ধ্বংস হয়ে গেছে। অনেকে তো আত্মহত্যা করেছে। মনিটরিংয়ের জায়গাটা ধ্বংস করা হয়েছে। বিগত দিনে যারা দায়িত্বে ছিলেন এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মনিটরিংয়ের দায়িত্ব যারা পালন করেন তারাও অলিগার্কদের সঙ্গে একাত্মতা করেছে। অর্থাৎ রাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গের দায়িত্ব পালনের জন্য যে দাগ টানা আছে সেটি একাকার হয়ে গেছে।
ওই একটি শক্তিই দেশ পরিচালনা করেছে। এ শক্তির মধ্যে আছে অলিগার্ক, শেখ হাসিনা ও তার পরিবার এবং তার দলের লোকজন, সরকারের কর্মকর্তা এবং যারা রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতায় অলিগার্ক হয়েছেন। গণতন্ত্র, ভোটাধিকার, আইনের শাসন, মানবাধিকার সবকিছু নিয়ন্ত্রণ হয়েছে ক্ষমতায় থাকার জন্য।
বাংলাদেশের অর্থনীতিকে যে জায়গায় নিয়ে এসেছে সেখান থেকে বের করার জন্য উদ্যোগগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটিকে অন্তর্বর্তী সরকার কীভাবে অ্যাপ্রোচ করছে সেটি গুরুত্বপূর্ণ। এটি একটি হলিস্টিক (সামষ্টিক) অ্যাপ্রোচ। বিশেষ কোনো কোম্পানির বিরুদ্ধে অ্যাকশন নেয়া কিংবা এখানে ওখানে কিছু করলে এটির সমাধান হবে না। এটি সামষ্টিকভাবে দেখতে হবে এবং সেভাবেই সমাধান দিতে হবে।
সত্যিকার অর্থে আমি এখন পর্যন্ত সে রকম কিছু দেখতে পাচ্ছি না। যত দ্রুততম সময়ে সমস্ত স্টেকহোল্ডারের সঙ্গে আলোচনা করে সামষ্টিকভাবে অর্থনীতিতে এ সংস্কার আনা হবে, ততক্ষণ বিনিয়োগকারীদের কাছে সঠিক সিগন্যাল যাবে না। একইভাবে ব্যবসায়ীদের কাছেও পৌঁছবে না। সরকারের পক্ষ থেকে অবস্থান পরিষ্কার করে পরিবর্তনগুলো সামষ্টিকভাবে করে মেসেজটা পরিষ্কার করতে হবে তখনই কিন্তু প্রভাবটি পড়বে। মানে আস্থা ফিরে আসবে। কিন্তু এটি না করে যদি কোনো এক মার্কেটে গিয়ে কথা বলল তাতে কিন্তু দ্রব্যমূল্য কমবে না। বাজার পরিদর্শন করলে দ্রব্যমূল্য কমবে না। বরং এটির পেছনে যে কারণগুলো আছে সেটিতে পরিবর্তন লাগবে। প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তন লাগবে। এখানে দরকার পেশাদারত্ব ও স্বচ্ছতা।
আপনি প্রতিষ্ঠানগুলোর বিভিন্ন পর্যায়ে পেশাদারত্বের কথা বলছেন। এক্ষেত্রে অনেকেই বলে থাকে, বিগত ১৫ বছরের একটানা শাসনের কারণে উচ্চ পদগুলোয় আওয়ামী লীগ সরকার তার নিজের পছন্দের লোকদের বসিয়েছে। এমন একটি প্রেক্ষাপটে কতটুকু সংস্কার করা সম্ভব বলে আপনি মনে করেন?
গত ১৫ বছরে লুটপাটের মাধ্যমে, টাকা পাচারের মাধ্যমে যারা দেশটাকে এ অবস্থায় নিয়ে এসেছে ওই লোকগুলো দিয়ে সংস্কার বা পরিবর্তন আনা যাবে না। তাদের পরিবর্তন করা না হলে শুধু ওপরের দুই-একজনকে পরিবর্তন করে বাকি যারা আছে তারা তো নিজেদের জায়গায় বসে আছে। এমনকি এটি বলতে আমি দ্বিধা করব না যারা অ্যাপোলজিস্ট ছিল তাদের দিয়ে তো এ পরিবর্তন আনা যাবে না। অ্যাপোলজিস্ট হলো তারা যারা শেখ হাসিনা রেজিমের সঙ্গে সরাসরি দেখা
না গেলেও তারা জড়িত ছিল। সুতরাং এখানে যত স্টেকহোল্ডার আছে যেমন রাজনৈতিক দল, ব্যবসায়ীদের মধ্যে ওই পৃষ্ঠপোষকতার বাইরে যারা রাজনীতি করছে এ লোকগুলো, সুশীল সমাজ, এনজিওর লোক যারা আছে তারা। তাদের সবার ভূমিকা আছে। এখানে যারা রাষ্ট্র পরিচালনা করেছেন সেখানে তাদেরও ভূমিকা রয়েছে। আমরা যখন সর্বশেষ ক্ষমতা থেকে চলে যাই তখন গ্রোথ ছিল ৭ দশমিক শূন্য ৬ শতাংশ। কার্ভটি ছিল ঊর্ধ্বমুখী। আমরা মেজর রিফর্ম করেছি। বাংলাদেশের একদলীয় শাসন থেকে বহুদলীয় শাসন, রাষ্ট্রচালিত অর্থনীতি থেকে মুক্তবাজার অর্থনীতি। পরবর্তী সময়ে বেসরকারি খাতে অর্থনীতির মূল বাহক হিসেবে এনে মেজর সংস্কারগুলো করেছি। যার কারণে তৈরি পোশাক খাত ও বিদেশে শ্রমিক পাঠানো এবং রেমিট্যান্স এগুলো আমাদের হাতে হয়েছে। অর্থনীতি একটি ভালো জায়গায় এসেছে। সেই ধারাটি যদি চলমান রাখত তাহলে দুই অংকের প্রবৃদ্ধি অর্জনে কোনো অসুবিধা হতো না। পরবর্তী সময়ে শেখ হাসিনা সরকার ব্যষ্টিক ও সামষ্টিক অর্থনীতির কাঠামোটা ধ্বংস করে দিয়েছে।
অর্থনীতিতে একটা ভঙ্গুর অবস্থা। এখান থেকে ঘুরে দাঁড়াতে অন্তর্বর্তী সরকারের করণীয় কী?
আমি মনে করি, সরকারের উচিত খুব দ্রুত স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে বসে এ সমস্যাগুলো সমাধানে উদ্যোগী হওয়া। স্টেকহোল্ডার শুধু রাজনৈতিক দল না, বরং আরো যারা আছে সবাই। বর্তমানে সরকার যেভাবে কাজ করছে তা হলো একটি সমস্যা সামনে আসছে তা নিয়েই পুরো মনোযোগ। আরেকটি আসছে তখন সেটা নিয়ে তোড়জোড়। এভাবে অর্থনীতিতে অস্থিরতা কমবে না।
বিভিন্ন কারখানায় শ্রমিক আন্দোলন হলো। তা সমাধানে সরকারের তৎপরতাকে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?
অন্তর্বর্তী সরকার বেশ হিমশিম খেয়েছে বলা যায়। আমাদের তরফ থেকে আমরা সর্বোচ্চ সহযোগিতা করেছি। এমন পরিস্থিতিতে শ্রমিকদের সঙ্গে বসে এটি সমাধান করতে হবে। কিছুদিন আগে সমস্যা হয়েছে, সেটি আমরা বসে সমাধান করেছি যাতে ফ্যাক্টরিগুলো চলে। ফ্যাক্টরিগুলো চালাতে হবে, আমাদের রফতানি, রেমিট্যান্স অব্যাহত রাখতে হবে। উৎপাদন অব্যাহত রাখার জন্য এসব জায়গায় যে সমস্যাগুলো আছে সেগুলো খুবই দ্রুত সমাধান করতে হবে। আগামী দিনের অর্থনীতি যাতে সঠিক পথে চলে এবং যে ভিত্তির ওপর অর্থনীতি দাঁড়িয়ে আছে সেই ভিত্তিগুলো সঠিক জায়গায় নিয়ে যেতে হবে।
ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট এখনো রয়ে গেছে বলে উল্লেখ করেছেন। এদিকে কিছু কিছু জায়গায় বিএনপির লোকজন সিন্ডিকেটের জায়গাটি দখল করছে বলে অভিযোগ শোনা যায়। সব ক্ষেত্রে কি সেই পুরনো সিন্ডিকেটগুলো আছে, নাকি নতুন করে বিএনপির লোকজন সেই জায়গাটি নিচ্ছে?
যারা আসলে সিন্ডিকেট করে তাদের কোনো নির্দিষ্ট রঙ নেই, তারা যেকোনো রঙ ধারণ করতে পারে। আবার সিন্ডিকেটের ওপর দোষ চাপিয়ে দায় সারলে চলবে না। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে অবশ্যই কার্যকর হতে হবে। আইনের শাসন বলবৎ করতে হবে। তদারকি প্রতিষ্ঠানগুলোকে অবশ্যই তাদের কাজ করতে হবে। বিএনপি ১৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে ক্ষমতার বাইরে। আমাদের নেতাকর্মীরা প্রাণ দিয়েছে; গুম, খুন, মিথ্যা মামলার শিকার হয়েছে, ব্যবসা-বাণিজ্য ও চাকরি থেকে বঞ্চিত হয়েছে। ফ্যাসিস্ট সরকার যাওয়ার পর যেভাবে বলেছিল লাখ লাখ লোক মারা যাবে, মিল-কারখানা দখল হবে কিছুই হয়নি। বিএনপির দিকে অভিযোগের তীর নিক্ষেপের আগে বিএনপিকে বড় করে ধন্যবাদ দেয়া দরকার। প্রধান বিরোধী দল হয়ে এমন একটি স্বৈরাচার যাওয়ার পর সারা বিশ্ব যেমন আশঙ্কা করছিল বিএনপি সেটা ঘটতে দেয়নি।
তার পরও ছোটখাটো যে বিষয়গুলো হচ্ছে তার জন্য বিএনপি পাঁচ শতাধিক নেতাকর্মীকে বহিষ্কার করেছে কোনো তদন্ত ছাড়া। আমি আবারো বলছি কোনো তদন্ত ছাড়া। তদন্ত ছাড়া যেহেতু করা হচ্ছে ওদের অনেকেই নির্দোষ। আমার তো রক্তক্ষরণ হচ্ছে। এই ১৬-১৭ বছরে যারা ত্যাগ শিকার করেছে তাদের দল থেকে বহিষ্কার করে দিয়েছি। অনেকেই নির্দোষ, কিন্তু তার তদন্ত হচ্ছে না এখানে। অনেকের দোকান দখল করে নিয়েছিল সেটি ফেরত নিচ্ছে। সেখানেও বলা হচ্ছে যে সে দখলের দাবিতে নিয়ে যাচ্ছে। এ রকম লোকও আমরা দল থেকে বহিষ্কার করেছি। বিএনপি এ নীতির বাইরে যাবে না। বাংলাদেশে আইন-শৃঙ্খলা ভঙ্গকারী বিএনপির হোক কিংবা যার হোক সেটি বিএনপি আর বরদাশত করবে না। এখন যে অবস্থায় আছি এখন যেমন করতে দেব না; বিএনপি ক্ষমতায় এলেও করতে দেবে না।
জাতির কাছে আমাদের ৩১ দফায় যে সংস্কার দিয়েছে সেটিতে আমরা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। আমরা একাই নয়; আমাদের সঙ্গে যারা যুগপৎ আন্দোলন করছে সবাই মিলে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। সুতরাং এ জায়গায় আমাদের কোনো ধরনের ছাড় দেয়ার সুযোগ নেই। শ্রমিক অসন্তোষে আমরা এ সরকারকে সহযোগিতা করেছি। এটি বিএনপি নেতাকর্মীরা সমর্থন দিয়েছে। বন্দরে গত পরশু বিক্ষোভ হয়েছে, এটি আমরা হস্তক্ষেপ করে বন্ধ করেছি। এটি হলো আওয়ামী লীগের ১৫ বছরের জঞ্জাল, যা সরাতে বিএনপি নেতাকর্মীরা সরকারকে সাহায্য করছে।
আমরা চাচ্ছি বাংলাদেশের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সচল রাখতে, উৎপাদন ঠিক রাখতে, কর্মসংস্থান তৈরি করতে। বাংলাদেশকে আর্থিকভাবে একটি শক্ত জায়গায় নিয়ে না গেলে কোনো রাজনৈতিক পরিকল্পনা সফল হবে না। সুতরাং আমাদের হাতে হাত মিলিয়ে চলতে হবে। আমরা সেটিই করছি। কিন্তু সরকারের দায়িত্ব যদি সরকার পালন করতে না পারে সে দায়িত্ব তো বিএনপি নেবে না। আমাদের পক্ষ থেকে সার্বিক সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছি। তাদের সার্বিক সফলতা-বিফলতা তাদের মূল্যায়ন করতে হবে।
জিয়াউর রহমান ১৯ দফা সামনে রেখে রাষ্ট্র গড়তে চেয়েছিলেন। বিএনপি এখন ৩১ দফা দাবিতে সংস্কারের কথা বলছে। এদিকে আপনারাও রাষ্ট্র সংস্কারের কথা বলছেন, আবার অন্তর্বর্তী সরকারও রাষ্ট্র সংস্কারের কথা বলছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার পরিকল্পনার সঙ্গে আপনাদের মিলের জায়গা কোথায়?
দেশে বিদ্যমান সংস্কারের আলাপগুলো নতুন নয়। ছয় বছর আগে খালেদা জিয়া বাংলাদেশের রাষ্ট্র সংস্কারের কথা বলেছেন। তারেক রহমান সাহেবের নেতৃত্বে এক বছর আগে যুগপৎ আন্দোলনে আমাদের সঙ্গে যারা আছেন তাদের সঙ্গে মিলে ৩১ দফা দিয়েছি। যারা আজকে সংস্কারের কথা বলছে তাদের উদ্দেশে বলছি, এটি তাদের জন্য নতুন হতে পারে, আমাদের জন্য নয়। সংস্কার হলো একটি চলমান প্রক্রিয়া। একটি দেশের অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে যে সংস্কারগুলো সেটি একটি চলমান প্রক্রিয়া।
৩১ দফার মধ্যে বেশি কিছু আমরা বাকি রাখিনি। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দুই মেয়াদের বেশি না থাকা, উচ্চ ও নিম্ন কক্ষের ক্ষমতার ভারসাম্য রাখা, এগুলো আমরা অনেক আগে থেকেই বলছি। এগুলো বাস্তবায়নের জন্য আমরা পন্থাও বলেছি। তারেক রহমান বলেছেন, যদি জনগণ আমাদের রায় দেয় তাহলে সরকার হবে জাতীয় সরকার। বিএনপি একার সরকার না। কারণ যে ৩১ দফা আমরা দিয়েছি সেটির তো বাস্তবায়ন করতে হবে। আর যাদের নিয়ে আমরা সংস্কারের প্রস্তাব দিয়েছি তাদের সবাইকে নিয়ে যারা এ আন্দোলনে ছিল এ ৩১ দফা বাস্তবায়ন করব। যাদের মধ্যে শঙ্কা কাজ করছে সেটি তাদের সমস্যা। আমাদের মধ্যে কোনো শঙ্কা কাজ করছে না। আমরা পরিপূর্ণভাবে পালন করব। তবে এটি চলমান প্রক্রিয়া।