গাজীপুরে প্রতি বছরই আগুনে পুড়ছে সংরক্ষিত গজারি বন

হুমকিতে জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক পরিবেশ

গাজীপুরের শ্রীপুর, কাপাসিয়া ও কালিয়াকৈর উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে রয়েছে বিশাল গজারি বন, যা ভাওয়াল গড় নামে সমধিক পরিচিত।

গাজীপুরের শ্রীপুর, কাপাসিয়া ও কালিয়াকৈর উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে রয়েছে বিশাল গজারি বন, যা ভাওয়াল গড় নামে সমধিক পরিচিত। তবে প্রতি বছর ফাল্গুন-চৈত্র মাসে বনাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকা আগুন পুড়ছে। এতে বনভূমি ধ্বংসের পাশাপাশি জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক পরিবেশ হুমকির মুখে পড়েছে। বন্যপ্রাণী, কীটপতঙ্গ কিংবা বিরল প্রজাতির বিভিন্ন গাছপালাও ধ্বংস হচ্ছে আগুনে পুড়ে।

শ্রীপুরে বন বিভাগের দুটি রেঞ্জের অধীনে প্রায় ৩৩ হাজার একর সংরক্ষিত বনাঞ্চলের বেশির ভাগ এলাকারসহ কাপাসিয়া ও কালিয়াকৈরের গজারি বনেও আগুন ছড়িয়ে পড়ে প্রতি বছর। বনাঞ্চলের শাল-গজারিসহ বিভিন্ন উদ্ভিদ ও বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল এবং পরিবেশ বিপর্যয়ের আশঙ্কা করছে পরিবেশবাদীরা। অগ্নিকাণ্ডের পেছনে দখলদারদের যোগসাজশ রয়েছে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা। তবে বনাঞ্চলের রহস্যময় আগুনের পেছনে কে বা কারা জড়িত সে তথ্য উদ্ঘাটন করতে পারেনি বন বিভাগ।

এক সপ্তাহে সরজমিন বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, শ্রীপুর রেঞ্জের সদর বিট অফিসের অধীনে গাজিয়ারণ গ্রামের সংরক্ষিত বনাঞ্চলে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। সাতখামাইর বিটের পোষাদিয়া এলাকার বরমী নয়নপুর আঞ্চলিক সড়কজুড়েই সংরক্ষিত বনাঞ্চল। রাস্তার দুই পাশে তাকালে শুধুই আগুনের ক্ষত চোখে পড়ে। আগুনে শাল-গজারি ছাড়াও বিভিন্ন ধরনের লতাপাতা, গুল্ম, বাঁশ, বেত পুড়ে গেছে। উপজেলা সাইটালিয়া গ্রামের সংরক্ষিত বনাঞ্চলের ছোট ছোট গজারি গাছের সঙ্গে বড় বড় গজারিও আগুনের ভয়াবহতা থেকে বাদ যায়নি। শিমলাপাড়া বিটের বেশির ভাগ সংরক্ষিত বনাঞ্চল আগুনে পুড়ে গেছে। বাদ পড়েনি বন বিটের কার্যালয়ে আশপাশের বনাঞ্চল। রাজেন্দ্রপুর রেঞ্জের আট হাজার একর বনাঞ্চলের বেশির ভাগ অংশ পুড়ে গেছে। কয়েক দফা আগুনে পুড়ে গেছে বনের সব গাছপালা। ভিটিপাড়া এলাকার সংরক্ষিত বনের ভেতর বাস করা বানরগুলো গভীর জঙ্গল থেকে বের হয়ে রাস্তার পাশে চলে আসছে।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, কারা আগুন দেয়, সেটা তারা জানেন না। হঠাৎ করে দেখা যায় আগুন জ্বলছে। বনকর্মীদের খবর দিলে তারা আসেন। ততক্ষণে আগুন ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে পড়ে। এ কারণে আগুন নেভানো সম্ভব হয় না।

কালিয়াকৈর উপজেলার রঘুনাথপুর বিটের অধীন বান্দর মার্কেটের উত্তর পাশের বিশাল গজারি বনেও প্রতিদিন বিকালে জ্বলে আগুন। ওই এলাকার বাসিন্দা উৎপল রক্ষিত বলেন, ‘কে বা কারা আগুন দেয় আমরা জানি না। আমরা শুধু দেখি, আগুনে বিশাল বনভূমি পুড়ে যাচ্ছে। বন বিভাগের লোকজন আগুন নিয়ন্ত্রণে তেমন কোনো ভূমিকা রাখে না।’

কাপাসিয়া উপজেলার রায়েদ ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় এ ধরনের আগুন প্রতিদিনই দেখা যায়। রায়েদ গ্রামের বাসিন্দা আবুল কাশেম বলেন, ‘আমাদের এ এলাকা পার্শ্ববর্তী শ্রীপুর উপজেলার গোসিংগা বিটের অধীন। অগ্নিকাণ্ডের খবর জানালে বন বিটের লোকজন এসে নিয়ন্ত্রণ করতে করতে বিশাল এলাকা ছাই হয়ে যায়।’

শ্রীপুরের পোষাইদ গ্রামের বাসিন্দা নয়ন মিয়া বলেন, ‘আমাদের আশপাশে ঘন বন। বিশাল এলাকায় সংরক্ষিত বনাঞ্চল। এক রাতে সব পুড়ে ছাই হয়ে যায়। সন্ধ্যা থেকে রাতভর আগুন জ্বলছে। সকালে এসে দেখি আগুনে বনাঞ্চল পুড়ে গেছে। কোনো সময় বনকর্মীদের আগুন নেভাতে আসতে দেখিনি।’

পরিবেশ ও জলবায়ু নিয়ে কাজ করেন সাঈদ চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘নির্বিকার সবাই দেখছে বন পুড়ছে। কোনো দায়বদ্ধতা নেই। যারা দায়িত্বে রয়েছেন তাদের তো কিছু করতে দেখছি না।’

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করে তিনি বলেন, ‘বনাঞ্চলে আগুন দেয়া বন্ধে টাস্কফোর্স গঠন করুন। সচেতনতামূলক কর্মকাণ্ড বাড়ান। আমরা মনে করি, একটি মহল বনভূমি দখল করতে আগুন দিচ্ছে।’

ভাওয়ালগড় বাঁচাও আন্দোলনের মহাসচিব ড. একেএম রিপন আনসারী বলেন, ‘বনাঞ্চল তো প্রতি বছর আগুনে পুড়ে। এত বছর পুড়ছে, কোনো রহস্য তো উদ্ঘাটন করতে পারেনি বন বিভাগ। তাহলে আমরা ধরে নেব এর পেছনে তাদেরও হাত রয়েছে। প্রকৃত বন ধ্বংসকারীদের বিরুদ্ধে তাদের শক্ত অবস্থান চোখে পড়েনি। বনে কারা আগুন দেয়? এটা এখনো শনাক্ত করা যায়নি। তাহলে বন কর্মকর্তাদের কাজ কী?’

এ বিষয়ে শ্রীপুর রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. মোকলেছুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বনে আগুন দেয়ার পেছনে মাদকসেবীরা জড়িত। মাদকসেবনের জন্য তারা সংরক্ষিত বনাঞ্চলকে বেছে নেয়। মাদকসেবনের সময় তারা আগুন ব্যবহার করে। আর এ থেকে বেশির ভাগ বনে আগুন জ্বলে। এছাড়া বনের গজারি কপিজ গাছের লাকড়ি সংগ্রহ করতে কিছু মানুষ বনে আগুন দেয়। আগুন দিয়ে বন পুড়িয়ে গজারি কপিজ গাছ কেটে নেয়। এ ধরনের প্রমাণ আমরা পেয়েছি। বনে আগুন দেয়ার ঘটনায় জড়িতদের আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। এ সমস্যা সমাধানে আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি। এছাড়া আগুন দেয়ার পেছনে দখলদারদের সম্পৃক্ততা থাকতে পারে। বনের ভেতর আগুন লাগলে নেভানো খুবই কঠিন। মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে পুরো এলাকায়। রহস্য উদ্ঘাটনে আমরা কাজ করছি।’

আরও