স্মার্ট সিটি কনক্লেভ ২০২৬

ঢাকা, চট্টগ্রাম ও খুলনার সবগুলো নগর পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়েছে: ড. আদিল মুহাম্মদ খান

ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, স্বাধীনতার গত ৫০ বছরে বিভিন্ন সরকারের কাছ থেকে অনেক আশার কথা শোনা গেলেও কার্যকর কোনো রূপরেখা পাওয়া যায়নি।

স্বাধীনতার পর দেশের প্রধান শহরগুলোতে নেয়া বিভিন্ন নগর পরিকল্পনার প্রায় সবই ব্যর্থ হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান। তিনি বলেন, একের পর এক মহাপরিকল্পনা, কাঠামো পরিকল্পনা ও বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা করা হলেও সেগুলো বাস্তবায়ন করা যায়নি।

বুধবার (৭ অক্টোবর) রাজধানীর বনানীর হোটেল শেরাটনে বণিক বার্তা আয়োজিত ‘স্মার্ট সিটি কনক্লেভ ২০২৬’-এ তিনি এসব কথা বলেন।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী জাকারিয়া তাহের। সম্মানিত অতিথি ছিলেন রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. রিয়াজুল ইসলাম।

ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, স্বাধীনতার গত ৫০ বছরে বিভিন্ন সরকারের কাছ থেকে অনেক আশার কথা শোনা গেলেও কার্যকর কোনো রূপরেখা পাওয়া যায়নি। ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও খুলনার জন্য একের পর এক মহাপরিকল্পনা, কাঠামো পরিকল্পনা ও বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা করা হয়েছে। কিন্তু প্রায় সব পরিকল্পনাই ব্যর্থ হয়েছে। এর কারণ হিসেবে তিনি বলেন, পরিকল্পনায় যা বলা হয়েছে, তা বাস্তবায়ন করা হয়নি। বরং নিজেদের প্রয়োজন, জনচাপ এবং বিভিন্ন ব্যবসায়ী ও স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর চাপে পরিকল্পনা থেকে সরে যাওয়া হয়েছে।

আবাসন নির্মাণ ও টেকসই নগরায়ণ নিয়ে আলোচনায় তিনি বলেন, যেখানে যা করার কথা ছিল, তা করা হয়নি। পরিকল্পিত শিল্প এলাকায় প্লট ফাঁকা পড়ে থাকলেও শহরের মূল কেন্দ্রে কৃষিজমি ও জলাভূমি ভরাট করে আবাসিক এলাকা ও কারখানা গড়ে তোলা হয়েছে। এর ফলে পরিবেশদূষণ সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে।

ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, শহর বা আবাসন স্মার্ট হবে কি না, তার প্রথম শর্ত শুধু কাগজে-কলমে পরিকল্পনা থাকা নয়। নির্দিষ্ট মানদণ্ড মেনে সেই পরিকল্পনা কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। পাশাপাশি পরিকল্পিত উপায়ে নগর কাঠামোর সঙ্গে আবাসন ও অর্থনীতির সমন্বয় করতে হবে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের এ অধ্যাপক বলেন, দেশের অর্থনীতি ও আবাসনের মধ্যেও সমন্বয় করা যায়নি। অতীতে সরকার যখন কোনো শিল্প এলাকা গড়ে তুলত, তখন সেখানেই শ্রমিকদের আবাসনের ব্যবস্থা থাকত। ফলে শিল্পশ্রমিকেরা কারখানার কাছেই থাকতে পারতেন।

পরবর্তীতে শিল্পায়ন বেসরকারি খাতের হাতে চলে গেলে তারা শুধু কারখানা গড়ে তুলেছে। নগরের আবাসন কাঠামোর সঙ্গে সমন্বয়ের কোনো উদ্যোগ নেয়নি। সরকারও এর সঙ্গে তাল মিলিয়ে পর্যাপ্ত আবাসনের ব্যবস্থা করেনি।

এর ফলে পোশাকশ্রমিক, শিল্পশ্রমিক ও অনানুষ্ঠানিক খাতের বিপুলসংখ্যক শ্রমজীবী মানুষের জন্য নগরে পর্যাপ্ত আবাসন গড়ে ওঠেনি। শহরের প্রায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ মানুষ নিম্নমানের পরিবেশ, বস্তি বা অনানুষ্ঠানিক বসতিতে বসবাস করতে বাধ্য হচ্ছে। এতে নগর সংকট আরো জটিল হয়ে উঠছে।

আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, শিল্প ও বাণিজ্যকেন্দ্রগুলোতে যে পরিমাণ কর্মসংস্থান তৈরি হবে, সেই অনুপাতে আবাসনের সুযোগ না থাকলে সংকট আরো বাড়বে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের কোনো শহরই বিশ্বের বাসযোগ্য বা ভালো শহরের তালিকায় স্থান করে নিতে পারেনি। আবার গত কয়েকদিন ধরে সরকার অবৈধ দখল উচ্ছেদ ও অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন উদ্যোগ নিচ্ছে। জীবিকার তাগিদে সারা দেশ থেকে মানুষ ঢাকা ও চট্টগ্রামের মতো বড় শহরে আসছে। কিন্তু এসব শহরে এসে তারা স্মার্ট আবাসন তো দূরের কথা, ন্যূনতম ভালোভাবে মাথা গোঁজার জায়গাও পাচ্ছে না।

ঢাকা শহরের বহু রিকশাচালক মানবেতর পরিবেশে মাচার ওপর কোনোমতে বসবাস করেন বলেও উল্লেখ করেন তিনি। তার মতে, এটাই দেশের বর্তমান নগরবাস্তবতার একটি চিত্র।

স্মার্ট আবাসন শুধু চার দেয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয় বলেও মনে করেন এ পরিকল্পনাবিদ। তিনি বলেন, স্মার্ট আবাসন ও টেকসই নগরায়ণের সঙ্গে বাসস্থান, পরিবহন, সুপেয় পানি, পয়োনিষ্কাশন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ রক্ষা ও জননিরাপত্তার বিষয়গুলো জড়িত। এসব সুবিধা নাগরিক জীবনকে স্বাচ্ছন্দ্যময় করতে অপরিহার্য।

ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, স্মার্ট আবাসন মানে শুধু ভালো চার দেয়ালের একটি জায়গা নয়। এর সঙ্গে কল্যাণমুখী রাষ্ট্রের ধারণা ওতপ্রোতভাবে জড়িত। একজন মানুষের আয় ও নগরে তার অবদান বিবেচনায় নিয়ে সমাজের সব স্তরের মানুষের জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক আবাসন নিশ্চিত করা জরুরি।

আরও