ডেঙ্গুতে হারানো স্বজন

বড় ব্যবসায়ী হওয়ার স্বপ্ন অধরাই রইল বিজয়ের

বাবা-মা দুজনেই আলাদা সংসার শুরু করায় ছোটবেলা থেকেই দাদা রাজা মিয়া ও দাদি শাহেদা বেগম ছিলেন তার মূল আশ্রয়স্থল।

চীনে গিয়ে বড় ব্যবসায়ী হওয়ার স্বপ্ন ছিল বিজয়ের। সেই স্বপ্ন পূরণে নিজেকে প্রস্তুতও করছিলেন তিনি। মৃত্যুর কিছুদিন আগে ঢাকায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) বিষয়ে একটি কোর্সে অংশ নিয়ে প্রথম স্থান অর্জন করেন। কিন্তু ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে গত ২৭ সেপ্টেম্বর মাত্র ২১ বছর বয়সে বিজয়ের মৃত্যুতে থেমে গেছে তার স্বপ্নযাত্রা। বিজয়ের মতো ডেঙ্গুতে প্রিয়জন হারিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েছে রংপুরের আরো পরিবার।

বিজয়ের পরিবার সূত্রে জানা গেছে, তিনি রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার নাটমিটিপুর পানবাড়ি এলাকার বাসিন্দা শাহিন আলমের ছেলে। বাবা-মা দুজনেই আলাদা সংসার শুরু করায় ছোটবেলা থেকেই দাদা রাজা মিয়া ও দাদি শাহেদা বেগম ছিলেন তার মূল আশ্রয়স্থল। দাদা-দাদির অনুপ্রেরণায় ঢাকায় থেকে লেখাপড়ার পাশাপাশি গ্রাফিকস ডিজাইনের প্রশিক্ষণ নিচ্ছিলেন বিজয়। মেধাবী এ তরুণ অল্প দিনেই নিজের কর্মক্ষেত্রে প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছিলেন।

বিজয়ের ফুফাতো বোন ও রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সিনিয়র নার্স মোছা. হীরা আক্তার বলেন, ‘মিশুক প্রকৃতির, সদা হাস্যোজ্জ্বল বিজয় আজ আমাদের মাঝে নেই—এ কথা আমরা কল্পনাও করতে পারছি না। ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে সে প্রতিদিন একটু একটু করে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল। তার পরও ব্যথা-যন্ত্রণা মুখ বুজে সহ্য করেছে। কাউকে কিছু বুঝতে দেয়নি। অন্যের ভোগান্তি হবে, এ কথা ভেবে সবকিছু নীরবে সহ্য করে গেছে আমার ভাই।’

তিনি আরো বলেন, ‘মারা যাওয়ার কিছুদিন আগে ঢাকায় বিজয় আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের একটি কোর্স করেছিল। সেখানে সে প্রথম হয়েছিল। তার স্বপ্ন ছিল চীনে গিয়ে ব্যবসা করবে, অনেক বড় ব্যবসায়ী হবে। কিন্তু ডেঙ্গু সব শেষ করে দিল।’

ডেঙ্গুতে প্রিয়জন হারিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়া আরেকটি পরিবার রংপুরের পীরগঞ্জের মিনারা বেগমের (৪০)। গত ৪ সেপ্টেম্বর ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার মাত্র নয়দিনের মাথায় ১৩ সেপ্টেম্বর মারা যান তিনি। তার মৃত্যুতে পরিবারটিতে নেমে এসেছে শোক ও অনিশ্চয়তা।

মিনারা বেগমের দুই ছেলে ও এক মেয়ের মধ্যে বড় মিনহাজুল ইসলাম। তিনি ঢাকার নারায়ণগঞ্জের একটি মাদরাসায় চাকরি করেন। তার স্বামী আনোয়ারুল ইসলাম পীরগঞ্জ উপজেলার হাসানপাড়া এলাকায় আনন্দ পার্কের সামনে একটি ছোট দোকান চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতেন। পরিবারের এক সন্তান ঢাকায় মাদরাসায় চাকরি করেন, আর বাকি দুই সন্তান লেখাপড়া করছে।

মিনহাজুল ইসলাম বলেন, ‘মায়ের মৃত্যুতে আমাদের পরিবারে শূন্যতা তৈরি হয়েছে। বাবা ভেঙে পড়েছেন। আনন্দ পার্কের সামনে বাবার একটি দোকান ছিল, সেটি এখন বন্ধ। বাধ্য হয়ে ১০ শতক ভিটাবাড়িতে তালা লাগিয়ে বাবা ও দুই ভাইবোনকে নিজের কাছে নিয়ে এসেছি।’ আক্ষেপ করে মিনহাজুল বলেন, ‘মায়ের ইচ্ছা ছিল, আমরা ধর্মীয় শিক্ষায় শিক্ষিত হব। পাশাপাশি চাকরি করে গ্রামের বাড়িটি সংস্কার করব। কিন্তু মায়ের সেই দ্বিতীয় ইচ্ছাটি আর পূরণ হলো না।’

রংপুর বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) ডা. ওয়াজেদ আলী বলেন, ‘‌ডেঙ্গু প্রতিরোধে কেবল হাসপাতাল বা চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করলে চলবে না। এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করতে সিটি করপোরেশন ও পৌর এলাকাসহ প্রতিটি বাড়িতে নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালাতে হবে।’

আরও