নদীবেষ্টিত কুষ্টিয়ায় পানিতে ডুবে কেউ নিখোঁজ হলে স্বজনদের উৎকণ্ঠার সঙ্গে যুক্ত হয় আরেক যন্ত্রণা—ডুবুরি দলের অপেক্ষা। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত জেলায় পানিতে ডুবে শিশুসহ বিভিন্ন বয়সী অন্তত ১৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। কিন্তু জেলায় প্রশিক্ষিত ডুবুরি দল না থাকায় উদ্ধার অভিযানের জন্য প্রায় ১৫০ কিলোমিটার দূরের খুলনার ওপর নির্ভর করতে হয়। খুলনা থেকে ডুবুরি দল পৌঁছাতে লাগে ৬-৮ ঘণ্টা। জীবন রক্ষায় যেখানে প্রতিটি মুহূর্ত গুরুত্বপূর্ণ, সেখানে এ দীর্ঘ অপেক্ষায় জীবিত উদ্ধারের সম্ভাবনা অনেকটাই কমে যায়।
শুধু কুষ্টিয়া নয়, খুলনা বিভাগের ১০ জেলার চিত্রও প্রায় একই। নদী, খাল ও জলাশয়ে কেউ নিখোঁজ হলে বিভাগীয় শহর খুলনার ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দলের জন্য অপেক্ষা করতে হয়। বর্ষায় নদী ও জলাশয়ে পানির প্রবাহ বাড়ার সঙ্গে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়লেও জেলার পর্যায়ে স্থায়ী ডুবুরি দল না থাকায় সংকট আরো প্রকট হয়ে ওঠে।
বৃহত্তর কুষ্টিয়া অঞ্চলের কুষ্টিয়া, মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা ও ঝিনাইদহসহ আশপাশ জেলাগুলোয় পদ্মা, গড়াই, মাথাভাঙ্গা, হিসনা, কালীগঙ্গা, কুমার ও সাগরখালীসহ অন্তত ১২টি নদ-নদী রয়েছে। এসব নদীর সঙ্গে মানুষের জীবন-জীবিকা ও যোগাযোগ নিবিড়ভাবে জড়িত। গত আগস্টে কুষ্টিয়া, মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ, নড়াইল ও বাগেরহাটে প্রায় ২৮ শিশুসহ বিভিন্ন বয়সী মানুষ নদী, পুকুর ও বিলে ডুবে মারা গেছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, নিখোঁজ হওয়ার পর প্রথম কয়েক ঘণ্টা উদ্ধার অভিযানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু প্রশিক্ষিত ডুবুরি ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম না থাকায় স্থানীয় ফায়ার সার্ভিস সদস্যদের ভূমিকা সীমিত থাকে। তখন স্বজন ও স্থানীয়রা নৌকা, জালসহ দেশীয় উপকরণ নিয়ে খোঁজ করেন।
কুষ্টিয়ার পদ্মাপারের বাসিন্দা আমিরুল ইসলাম বলেন, ‘নদীতে কেউ নিখোঁজ হলে স্বজনদের একদিকে প্রিয়জনকে হারানোর শঙ্কা, অন্যদিকে উদ্ধারকারী দলের অপেক্ষায় থাকতে হয়।’ আরেক বাসিন্দা মোমিন ইসলাম বলেন, ‘দূরের জেলা থেকে ডুবুরি আসতে সময় লাগায় মূল্যবান সময় নষ্ট হয়।
জেলার ভৌগোলিক বাস্তবতা বিবেচনায় কুষ্টিয়ায় একটি স্থায়ী ডুবুরি দল গঠনের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে একাধিকবার চিঠি দেয়া হয়েছে বলে জানান কুষ্টিয়া ফায়ার সার্ভিসের সহকারী পরিচালক ওয়াদুদ হোসেন। তিনি বলেন, ‘জেলায় একটি ইউনিট থাকলে আশপাশের চার-পাঁচ জেলায়ও ১ ঘণ্টা বা তার কম সময়ে উদ্ধার অভিযান চালানো সম্ভব হতো।’
খুলনা বিভাগীয় ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সহকারী পরিচালক মাসুদ সরদার বলেন, ‘প্রতিটি জেলায় স্বতন্ত্র ডুবুরি ইউনিট গঠন সম্ভব না হলেও এ-সংক্রান্ত জনবল বাড়ানো জরুরি। এ জন্য অর্গানোগ্রাম পুনর্গঠন করে সারা দেশে ডুবুরি নিয়োগের প্রক্রিয়া চলছে। জনবল বাড়ানো গেলে পানি দুর্ঘটনার পর দ্রুত উদ্ধার তৎপরতা চালানো সম্ভব হবে।