একই সঙ্গে প্রাথমিক হিসাবে বন্যার পানিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ১ হাজার ৬৭৮ হেক্টর কৃষিজমি। পাশাপাশি আর্থিক ক্ষতি ছাড়িয়েছে ২৪৫ কোটি টাকা। কয়ারবিল ও লেমশীখালী সংযোগ সেতু ধসে পড়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সড়কের বেশকিছু স্থান। দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য দেশের বিভিন্ন জেলায় ৩ হাজার ৩১৩ আশ্রয় কেন্দ্র খোলা হয়েছে। সেখানে আশ্রয় নিয়েছে ১৭ হাজার ৭৪৯ জন। পুলিশ সদর দপ্তরের ‘অতিরিক্ত বৃষ্টির কারণে সৃষ্ট বন্যাসংক্রান্ত প্রতিবেদন’-এ এসব তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটেছে কক্সবাজার জেলায়। জেলার উখিয়ায় ১৪ জন, চকরিয়ায় চার, কক্সবাজার সদরে দুই এবং মাতামুহুরী, পেকুয়া ও মহেশখালীতে একজন করে মারা গেছে। চট্টগ্রাম জেলার বাঁশখালীতে তিনজন, আনোয়ারা ও সাতকানিয়ায় দুজন করে এবং সীতাকুণ্ড, রাঙ্গুনিয়া ও দক্ষিণ রাঙ্গুনিয়ায় একজন করে প্রাণ হারিয়েছে। বান্দরবান জেলার লামায় পাঁচজন ও নাইক্ষ্যংছড়িতে একজন নিহত হয়েছে। রাঙ্গামাটি জেলায় কোতোয়ালি, বাঘাইছড়ি ও বিলাইছড়িতে একজন করে এবং মৌলভীবাজারের রাজনগরে দুজনের মৃত্যু হয়েছে। সব মিলিয়ে বন্যা ও পাহাড়ধসে ৪৪ জন নিহত হয়েছে। আহত হয়েছে ৩৩ জন এবং নিখোঁজ চারজন। নিখোঁজদের মধ্যে দক্ষিণ রাঙ্গুনিয়া, বোয়ালখালী, সাতকানিয়া ও কমলগঞ্জে একজন করে রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বন্যা ও পাহাড়ধসে প্রাণহানি, কৃষি ও অবকাঠামোর ক্ষতির পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোয় নতুন করে নিরাপত্তা ও আইন-শৃঙ্খলাজনিত ঝুঁকিও তৈরি হয়। আশ্রয় কেন্দ্রে বিপুল মানুষের সমাগম, যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়া এবং প্রশাসনিক নজরদারির ঘাটতির সুযোগে বিভিন্ন অপরাধ চক্র সক্রিয় হয়ে উঠতে পারে। বন্যা ও অন্যান্য দুর্যোগের সময় শুধু প্রাণহানি ও সম্পদের ক্ষতিই বাড়ে না, একই সঙ্গে নানা ধরনের মৌসুমি অপরাধও বেড়ে যায়।
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান রেজাউল করিম সোহাগ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দুর্যোগের সময়ে বন্যপ্রাণী পাচার, ত্রাণ বিতরণে অনিয়ম ও দুর্নীতি, গবাদিপশু চুরি এবং আশ্রয় কেন্দ্রে নারী, শিশু ও প্রবীণদের হয়রানি ও নির্যাতনের মতো অপরাধের ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়। দুর্যোগের সুযোগ নিয়ে সংঘবদ্ধ অপরাধ চক্রও সক্রিয় হয়ে ওঠে। চট্টগ্রাম ও পার্বত্য অঞ্চলের বনাঞ্চলে হরিণ, বন্য হাতিসহ বিভিন্ন বন্যপ্রাণী রয়েছে। বন্যা ও পাহাড়ধসের সময় এসব প্রাণী আবাসস্থল ছেড়ে লোকালয়ে চলে এলে পাচারকারী চক্র তাদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে। তাই আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি বন বিভাগেরও বিশেষ নজরদারি প্রয়োজন।’
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ৫ জুলাই থেকে ১১ জুলাই পর্যন্ত বন্যায় আর্থিক ক্ষতি ২৪৫ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ১৭৬ কোটি ৮২ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে বাঁশখালীতে। এরপর সাতকানিয়ায় ৫২ কোটি ৬০ লাখ টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। এর বাইরে মিরসরাইয়ে ৩৮ থেকে ৫৪ লাখ টাকার, সীতাকুণ্ডে ৩৮ থেকে ৫৪ লাখ টাকার, হাটহাজারীতে ৮ থেকে ১০ কোটি টাকা, রাঙ্গুনিয়ায় ৫ কোটি ২০ লাখ টাকা এবং পটিয়ায় ৭০ থেকে ৮০ হাজার টাকার ক্ষতি হয়েছে। বন্যায় সর্বমোট ১ হাজার ৬৭৮ হেক্টর কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বন্যায় শুধু কৃষিজমিই নয়, যোগাযোগ ব্যবস্থাও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বন্যায় কুতুবদিয়ায় কয়ারবিল-লেমশীখালী সংযোগ সেতু ভেঙে পড়েছে। রাঙ্গামাটির বাঘাইছড়ি ও রাজস্থলীতে সড়কের বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুরে একটি পাকা সড়ক ভেঙে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। বিভিন্ন পাহাড়ি এলাকায় ভূমিধসে গ্রামীণ সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বসতবাড়ির ক্ষয়ক্ষতিও উদ্বেগজনক। চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানের বিভিন্ন এলাকায় শতাধিক ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কোথাও পাহাড়ধসে ঘর বিধ্বস্ত হয়েছে, কোথাও আবার প্রবল স্রোতে বাড়িঘর ভেঙে গেছে। কক্সবাজারের উখিয়ায় রোহিঙ্গা ক্যাম্পের একাধিক শেল্টারও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
দুর্যোগে ভৌত ক্ষয়ক্ষতির পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোয় উদ্ধার, ত্রাণ বিতরণ, আশ্রয় কেন্দ্রের নিরাপত্তা এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর সুরক্ষার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এ পরিস্থিতিতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আরো কার্যকর ভূমিকা পালন করা প্রয়োজন বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হক। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দুর্যোগকালে নিখোঁজ ব্যক্তিদের দ্রুত উদ্ধার, দুর্ঘটনা ও অপরাধের শিকার মানুষের আইনি সহায়তা নিশ্চিত এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের পাশে দাঁড়ানো জরুরি। বন্যা ও অন্যান্য দুর্যোগে সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়ে প্রান্তিক ও অসহায় মানুষ। তাই উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমের পাশাপাশি আশ্রয় কেন্দ্রের নিরাপত্তা, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ এবং নারী-শিশুসহ ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর সুরক্ষায় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আরো কার্যকর ও সমন্বিত ভূমিকা পালন করতে হবে। এতে দুর্যোগজনিত ক্ষয়ক্ষতির পাশাপাশি অপরাধের ঝুঁকিও অনেকাংশে কমানো সম্ভব হবে।’
পুলিশ সদর দপ্তরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বন্যা পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক না হওয়ায় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আরো বাড়তে পারে। পানি কমার পর কৃষি, সড়ক ও আবাসন খাতের প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করা সম্ভব হবে। ততদিন পর্যন্ত উদ্ধার, আশ্রয় ও ত্রাণ কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে। বন্যা মোকাবেলায় জেলা প্রশাসন, সেনাবাহিনী, পুলিশ, বিজিবি, স্থানীয় প্রশাসন এবং বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় শুকনো খাবার, চাল, নগদ অর্থ, ওষুধ, শিশুখাদ্য, ডায়াপার ও স্যানিটারি ন্যাপকিন বিতরণ করা হচ্ছে। বান্দরবানে জেলা প্রশাসনের পাশাপাশি বিভিন্ন এনজিও ত্রাণ কার্যক্রমে অংশ নিয়েছে।
বন্যায় নিখোঁজ উদ্ধার তৎপরতা চলমান রয়েছে বলে জানিয়েছেন পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) এএইচএম শাহাদাত হোসাইন। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘৫ জুলাই থেকে ১১ জুলাই পর্যন্ত বন্যায় ৪৪ জনের প্রাণহানি হয়েছে। আহত হয়েছেন ৩৩ জন। এছাড়া বন্যায় এখনো চারজন নিখোঁজ রয়েছেন। নিখোঁজদের উদ্ধারে তৎপরতা চলমান রয়েছে। বন্যাকবলিত এলাকায় উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম নির্বিঘ্ন রাখার পাশাপাশি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায়ও সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। আশ্রয় কেন্দ্র ও ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে যাতে কোনো ধরনের অপরাধ, বিশৃঙ্খলা বা সুযোগসন্ধানী কর্মকাণ্ড না ঘটে, সে বিষয়ে মাঠপর্যায়ের পুলিশ সদস্যদের সতর্ক থাকতে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। বিশেষ করে নারী, শিশু ও অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়া হচ্ছে।’