প্রেসিডেন্ট জিয়ার ডাকে হাজার হাজার মানুষ স্বেচ্ছাশ্রমে খাল খননের কাজে নেমে পড়েছিল কোদাল হাতে, জিনিসটা একটু অবাক করত। চব্বিশের আন্দোলনের পর এটা পরিষ্কার হয়েছে। অর্থনীতিশাস্ত্রের একটা মৌলিক অ্যাজাম্পশন হচ্ছে, মানুষ র্যাশনাল। মানে মানুষ শুধু নিজের লাভের জন্য কাজ করে। ব্যক্তি তার লাভের জন্য কাজ করার ইনসেনটিভ থেকেই সামষ্টিকভাবে দেশের উন্নতি হয় অনেক ক্ষেত্রেই। আবার পাবলিক প্রপার্টির ক্ষেত্রে এটা ক্যাওয়াস তৈরি করে। অর্থাৎ দেশের যেটাতে লাভ, ব্যক্তিরও লাভের জায়গা হবে, এটা সবসময় হয় না (ব্যক্তি ও পলিসি মেকারদের ইন্টারেস্টের কনফ্লিক্টের কারণে)।
কিন্তু জনগণ যখন রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি আস্থা রাখতে পারে, নেতৃত্বের কমিটমেন্ট দেখে তাদের অপশাসন থেকে মুক্ত করার, তখন দেশ গড়ার কাজে দেশের মানুষের রেসপন্স কেমন হয় এটা স্বাধীন বাংলাদেশে আমরা দুবার দেখলাম। একবার প্রেসিডেন্ট জিয়ার সময়, আরেকবার এবার চব্বিশের অগাস্টে। রক্ষীবাহিনী, লুটপাট, দুর্ভিক্ষ, বাকশালের অপশাসন আর নিপীড়নের হাত থেকে মুক্তি পাওয়ার পর সিপাহী-জনতার বিপ্লবের মধ্য দিয়ে জিয়াকে বসানোর মধ্য দিয়ে জনগণ প্রথমবারের মতো নিজেদের এম্পাওয়ার্ড ফিল করেছিল। স্বৈরাচারী শাসনের পতনের পর আমরা এখন নিজেরাই ক্ষমতায়—এ অনুভূতিটাই দেশ গড়ার কাজে মানুষকে উজ্জীবিত করেছিল।
কোদাল হাতে জিয়ার কর্দমাক্ত শরীরে খাল খননের কাজ শুরু করতে দেখে জনগণ নেমে পড়েছিল স্বেচ্ছায়। সারা দেশে কৃষিতে বিপ্লব এনেছিল জিয়ার এ খাল খনন প্রকল্প। খরার মৌসুমে সেচের মাধ্যমে চাষ করতে পারার কারণে ক্রপিং ইনটেনসিটি (বছরে একাধিকবার চাষ করা) বেড়েছিল। আগে যেখানে ক্ষরার মৌসুমে পানির অভাবে চাষ করা যেত না, সেখানেও ফসল ফলেছে। একই সঙ্গে বন্যার সময় পানি নিষ্কাশনে কাজ করেছে এসব খাল।
ফলে বন্যায় ফসল নষ্ট হয়ে যাওয়ার পরিমাণও কমেছিল। আজকাল অবশ্য অনেক নদীও শুকিয়ে গেছে নাব্যতার অভাবে, দীর্ঘসময় ড্রেজিং না করার কারণে। জিয়ার পর এ ধরনের প্রকল্পে আর কেউ তেমন গুরুত্ব দেয়নি।
গবেষণাগুলো দেখিয়েছিল, দেশব্যাপী খাল খনন প্রকল্পের কারণে খাদ্য উৎপাদনে বড় ধরনের বিপ্লব হয়েছিল। এমনকি মানুষ পতিত জমিতে চাষাবাদ শুরু করে দিয়েছিল দেশের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য। খাদ্য আমদানিকারক দেশ থেকে বাংলাদেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের পাশাপাশি রফতানিও করতে পেরেছিল। সেটা আজকের আলাপের বিষয় নয়। এই যে একজন ব্যক্তি মাত্র! যার কোনো দল নেই। মাঠে কর্মী নেই, নেতা নেই, যারা ডেকে ডেকে মানুষকে তার আহ্বানে সাড়া দিতে বলবেন। কীভাবে সেই নেতা পেরেছেন দেশের মানুষের মধ্যে এই ঐক্য তৈরি করতে?
মানুষ জিয়ার চোখে তাদের মুক্তি দেখেছিল। দমবন্ধ করা পরিবেশ থেকে তাদের মুক্ত করে একটা স্বপ্নের দেশ গড়ার প্রত্যয় তার মধ্যে দেখেছিল। স্বজন হারানোর বেদনার মতো ফেইক কোনো ডায়ালগ বা উন্নয়নের মহাসড়কে উঠে দেশ সিঙ্গাপুর বানানোর মিথ্যা আশ্বাস নয়। একদলীয় বাকশালী শাসনের বিলোপ করে বহুদলীয় গণতন্ত্র, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা এনে দিয়ে জনগণের প্রত্যাশাও তিনি পূরণ করলেন। ধর্মীয় মূল্যবোধ আর বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের সম্মিলন ঘটিয়ে নতুন বাংলাদেশের পথে যাত্রা করলেন। লুটপাট করে অঢেল সম্পদ বানানোর পথে জিয়া হাঁটেননি এটা তার শত্রুরাও স্বীকার করবে।
দলহীন একটা মানুষ দল গঠন করলেন। সে সময়ের চৌকস ছাত্রনেতারা, রাজনীতিবিদরা, বুদ্ধিজীবীরা, পেশাজীবীরা তার সঙ্গে যোগ দিলেন দেশ গড়ার কাজে। শূন্য থেকে শুরু করে যেটা আজকে বাংলাদেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল। চব্বিশে হাসিনার ফ্যাসিবাদী শাসনের জাতাকল থেকে মুক্ত হওয়ার জন্যও মানুষ এ ছাত্র নেতৃত্বের প্রতি আস্থা পেয়েছিল বলেই ঝাঁপিয়ে পড়েছিল।
অভ্যুত্থানের পর দেশের বিরুদ্ধে অপপ্রচার রুখে দিতে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক অনন্য নজির স্থাপন করে সাধারণ মুসলমান থেকে শুরু করে আলেম-ওলামারা মাইনরিটিদের ধর্মীয় উপাসনালয়, বাড়ি ও সম্পদ রক্ষার্থে পাহারা দেয়ার মাধ্যমে। আইন-শৃঙ্খলার বেহাল দশা দেখে স্বেচ্ছায় মহল্লায় মহল্লায় নিরাপত্তায় নিয়োজিত হয়ে গিয়েছিল জনতা। ট্রাফিক কন্ট্রোলে নেমে এসেছে ছাত্র-জনতা। বিনা পয়সায় শুধু দেশ গড়ার জন্য।
সংসদ ভবন এলাকা, গণভবন এলাকা ধুয়ে-মুছে পরিষ্কার করেছে ছেলেমেয়েরা। গণভবন থেকে আনন্দের তালে তালে লুট করে নিয়ে যাওয়া জিনিস ফেরত দিয়ে গেছে দলে দলে। ফেনীতে যখন বন্যা হলো, বাংলাদেশ জাতীয় ঐক্যের এক অভূতপূর্ব উদাহরণ দেখেছে। গ্লোবালাইজেশনের সুবিধার কারণে শুধু দেশের মানুষ নয়, প্রবাসীরাও আন্দোলনের সময় থেকে এখন পর্যন্ত কাজ করে যাচ্ছেন দেশ গড়ার জন্য।
এই যে নিজের ব্যক্তিগত কোনো লাভের কথা চিন্তা না করেই দেশের ভালোর জন্য নিজের সময়, শ্রম, অর্থ ব্যয় করে কেন মানুষ নেমে এসেছে? এটা সম্ভব হয়েছে শুধু এজন্যই যে মানুষ তাদের স্বপ্নের দেশ গড়ার কমিটমেন্ট নেতৃত্বের মধ্যে দেখেছে। নাগরিক কমিটি যে নতুন রাজনৈতিক দল করতে চাচ্ছে সেখানেও আমি দেখতে পাচ্ছি দেশের সবচেয়ে প্রতিশ্রুতিশীল, চৌকস, যোগ্য ছাত্রনেতারা জড়ো হচ্ছেন।
কিন্তু তারা কি পারবেন জিয়ার মতো নেতৃত্ব দিতে? পারবেন মানুষের প্রত্যাশা পূরণ করতে? এই নতুন পার্টিতে কে হবেন জিয়া? জিয়ার মতো অমর হয়ে উঠবে এ নেতৃত্বও, নাকি হারিয়ে যাবে নষ্ট রাজনীতির বালুচরে?
ড. শিব্বির আহমদ: পোস্টডক্টরাল ফেলো
ইউনিভার্সিটি অব ভার্জিনিয়া, যুক্তরাষ্ট্র