ঢাকা মহানগরে বিআরটিএ অনুমোদিত ২৪ লাখের বেশি মোটরযানের মধ্যে বাণিজ্যিক গাড়ি (বাস, মিনিবাস, অটোরিকশা ও হিউম্যান হলার) রয়েছে প্রায় ৮০ হাজার, যার বড় অংশ ফিটনেস না থাকায় অবৈধ। অভিযোগ, এসব অবৈধ গাড়ির বড় অংশের মালিক পুলিশ-প্রশাসনসহ সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা, যাদের মধ্যে এসব গাড়ি নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বপ্রাপ্তরাও আছেন। সড়ক ভবনে গতকাল মতবিনিময় সভায় মন্ত্রী শেখ রবিউল আলমের উপস্থিতিতে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব সাইফুল আলম এ অভিযোগ করেন।
সাইফুল আলম বলেন, ‘আমরা এরই মধ্যে লক্ষ করেছি, এই যে অবৈধ গাড়িগুলো, এটা আমি অভিযোগ করছি না, আনিস ভাইকে (মঞ্চে উপস্থিত ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার আনিসুর রহমান) আমি বলব যে কোন কোন ডিপার্টমেন্টের লোকদের গাড়ি এগুলো? অনেক সরকারি সংস্থার লোকজন এ অবৈধ গাড়ির মালিক। এমনকি যারা নিয়ন্ত্রণ করবে তাদের লোকজনও এ গাড়িগুলো কিনে রাস্তায় ছাড়ে। তাদের নৈতিকতায় এটা বাধে না যে আমরাই নিয়ন্ত্রণ করব, আমরা কীভাবে দিই? আপনারা এটা ইনকোয়ারি করলে পাবেন, এভাবে অনেক অনিয়ম হয়েছে।’
ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ) আয়োজিত বাস রুট র্যাশনালাইজেশন কার্যক্রমের আওতায় ঢাকা মহানগরীতে বাস পরিচালনাকারী বাস মালিকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন সড়ক পরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম। ঢাকায় চলাচল করা বাসগুলো দ্রুততম সংস্কারের পরামর্শ দিয়ে মালিকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আমরা মালিক চিনি না, কোম্পানি চিনি না। যে মালিক বাসের মান বজায় রাখবেন না, তার বাস কোম্পানিতে যুক্ত থাকবে না। মালিক মানসম্মতভাবে বাস সংস্কার না করলে, চালক তার কথা না শুনলে বা কর্মচারীরা শৃঙ্খলা না মানলে সেই মালিকের কোনো অজুহাত আমাদের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না। কারণ বাসটি চলে আপনার কোম্পানির অধীনে, এটি আপনাকেই নিশ্চিত করতে হবে। নিশ্চিত করতে না পারলে ওই মালিকের বাস কোম্পানিতে রাখবেন না। সেটি ডাম্পিংয়ে নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব পুলিশ ও আমার। রাষ্ট্রকে চ্যালেঞ্জ করে, ব্যবস্থাপনাকে চ্যালেঞ্জ করে ব্যবসা করার কারো সুযোগ নেই।’
মন্ত্রী আরো বলেন, ‘রুটভিত্তিক কোম্পানিগুলো মালিকদের নিয়ন্ত্রণে এবং সেবার মানোন্নয়নে ব্যর্থ হলে সেসব কোম্পানি রাখা হবে না; সেখানে নতুন কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করা হবে। কিন্তু আমরা সেখানে যেতে চাই না। নতুন কোম্পানিও মানসম্মত সেবা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হলে প্রয়োজনে ওই রুট বাতিল করে সরকারি পর্যায় থেকে পরিচালনার চেষ্টা করা হবে। একদিনে বা এক মাসে আমরা সেখানে যেতে পারব না, কিন্তু রণে ভঙ্গ দেব না।’
রাস্তায় বাস নামানোর জন্য একজন মালিককে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত দিতে হয় বলে সভায় অভিযোগ তোলেন সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের দায়িত্বে থাকা প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ। তিনি এ প্রসঙ্গে বলেন, একজন মালিক বাস কেনার পর কোনো রুটে চালাতে চাইলে সেই রুটের কোম্পানির মালিকদের একটি অর্থ দিতে হয়। এ অর্থের পরিমাণ কোথাও ৫০ হাজার থেকে শুরু করে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত। এমন কোনো নির্দিষ্ট নিয়ম আছে কিনা তা তিনি জানেন না। সবাই এ টাকা নেন কিনা সেটাও নিশ্চিত নন, তবে তাঁর মতে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এমন হয়।
কোম্পানিগুলোর তোলা চাঁদা শ্রমিকদের কল্যাণে ব্যয় হয় না মন্তব্য করে প্রতিমন্ত্রী আরো বলেন, ‘কোম্পানিগুলো প্রতিটি বাস থেকে কোথাও ৩০০, কোথাও ৫০০ টাকা তোলে। এ টাকা শ্রমিকদের আহত হওয়ার ক্ষতিপূরণ বা বাস মেরামতের কাজে ব্যবহার হয় না। বরং কখনো প্রশাসন, বিআরটিএর কিছু অসাধু কর্মকর্তা, রাজনৈতিক নেতা, এলাকার প্রভাবশালী ও সন্ত্রাসীদের মধ্যে ভাগ হয়। এ টাকা তোলার জন্যই চালকদের মধ্যে অশুভ প্রতিযোগিতা তৈরি হয়, যা দুর্ঘটনার বড় কারণ।’
ডিটিসিএর নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ মসিউর রহমানের সভাপতিত্বে সভায় অন্যদের মধ্যে আরো বক্তব্য রাখেন জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের প্রধান সমন্বয়ক ও সংসদ সদস্য শামছুর রহমান শিমুল বিশ্বাস, ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) আনিসুর রহমান, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান প্রমুখ।