অধিকাংশ ক্ষেত্রেই চোরেরা মাস্ক ও টুপি পরে শিক্ষার্থীর ছদ্মবেশে ক্যাম্পাসে প্রবেশ করে প্লাস দিয়ে তালা ভেঙে বা শিকল কেটে কয়েক মিনিটের মধ্যেই সাইকেল নিয়ে পালিয়ে যায়। সিসিটিভি ক্যামেরা, নিরাপত্তাকর্মী ও লিখিত অভিযোগ কোনোটিই যেন এ চক্রকে থামাতে পারছে না। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন শিক্ষার্থীরা।
বণিক বার্তার অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ২০২২ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হল ও ক্যাম্পাস এলাকা থেকে অন্তত ৩১১টি সাইকেল চুরি হয়েছে। কিন্তু বিস্ময়কর হলেও সত্য, এ পাঁচ বছরে একটি সাইকেলও উদ্ধার করতে পারেনি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। বর্তমান বাজারমূল্যে এসব সাইকেলের মূল্য প্রায় ২০ লাখ টাকা।
শিক্ষার্থীরা জানান, টিউশনিতে যাতায়াত ব্যয় কমানো এবং দ্রুত একাডেমিক ভবন ও হলের মধ্যে চলাচলের জন্য অধিকাংশ শিক্ষার্থী সাইকেলের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু চুরির ঘটনায় অনেকেই এখন আর ক্যাম্পাসে সাইকেল রাখতে সাহস পান না।
তাদের অভিযোগ, সাইকেল চুরি হওয়ার পর প্রশাসনের কাছে অভিযোগ দিলেও দ্রুত সিসিটিভি ফুটেজ সংরক্ষণ বা বিশ্লেষণের উদ্যোগ নেয়া হয় না। অনেক ক্ষেত্রে দুই-তিনদিন পর ফুটেজ দেখা হয়। ততক্ষণে প্রয়োজনীয় তথ্য হারিয়ে যায় বা ফুটেজ ওভাররাইট হয়ে যায়। অভিযোগ করেও অধিকাংশ ভুক্তভোগী কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখতে পান না।
জরিপে দেখা গেছে, সবচেয়ে বেশি ২৯টি সাইকেল চুরি হয়েছে কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে থেকে। এরপর বিজয় একাত্তর হল ও হাজী মুহম্মদ মুহসিন হল থেকে ২৫টি করে, শহিদুল্লাহ হল থেকে ২৩টি, কলাভবনের সামনে থেকে ২২টি, জগন্নাথ হল থেকে ২১টি, মাস্টারদা সূর্য সেন হল ও শেখ মুজিবুর রহমান হল থেকে ১৮টি করে, স্যার এএফ রহমান হল ও মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান হল থেকে ১৪টি করে, অমর একুশে হল থেকে ১৩টি, সার্জেন্ট জহুরুল হক হল থেকে ১২টি, সলিমুল্লাহ মুসলিম হল ও ফজলুল হক মুসলিম হল থেকে আটটি করে, আইন অনুষদ, সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ, বিজনেস স্টাডিজ অনুষদ ও টিএসসি এলাকা থেকে পাঁচটি করে, সায়েন্স লাইব্রেরির সামনে চারটি এবং চারুকলা অনুষদ ও কেন্দ্রীয় খেলার মাঠ এলাকা থেকে তিনটি করে সাইকেল চুরি হয়েছে।
বছরভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০২২ সালে ৫৭টি, ২০২৩ সালে ৫১টি, ২০২৪ সালে ৫৮টি, ২০২৫ সালে সর্বোচ্চ ১০৭টি এবং চলতি বছরের জুন পর্যন্ত আরো ৩৮টি সাইকেল চুরি হয়েছে। অর্থাৎ, গত বছরের তুলনায় পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতির কোনো প্রমাণ মেলেনি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিজয় একাত্তর হলের প্রভোস্ট অধ্যাপক ড. স ম আলী রেজা বলেন, ‘বিগত পাঁচ বছরের সব ঘটনার বিষয়ে আমি অবগত নই। তবে এ ধরনের দুই-তিনটি ঘটনার তথ্য আমার জানা আছে। সাইকেল চুরির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের অধিকাংশই মাস্ক ও টুপি পরে শিক্ষার্থীর ছদ্মবেশে হলে প্রবেশ করে। এ কারণে সিসিটিভি ক্যামেরা থাকা সত্ত্বেও তাদের শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক মো. ইসরাফিল রতন বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে সাইকেল চুরিসহ বিভিন্ন ঘটনার অভিযোগ পেলে আমরা তা তদন্তের জন্য পুলিশের কাছে পাঠিয়ে দিই। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে নম্বরপ্লেট কিংবা অভিযুক্ত ব্যক্তির মুখ স্পষ্টভাবে শনাক্ত করা যায় না। ফলে পুলিশের পক্ষেও কার্যকর তদন্ত পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়ে।’
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) শাহবাগ থানার পরিদর্শক (তদন্ত) জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো অভিযোগ পেলে পুলিশ তা তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করে।’ চুরি হওয়া সাইকেল উদ্ধারের সংখ্যা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘নির্দিষ্ট কোনো পরিসংখ্যান এ মুহূর্তে জানানো সম্ভব নয়। কারণ বিভিন্ন সময় ভিন্ন তদন্ত কর্মকর্তা এসব মামলার দায়িত্ব পালন করেন। তাই উদ্ধার হওয়া সাইকেলের সঠিক সংখ্যা তাৎক্ষণিকভাবে বলা সম্ভব হচ্ছে না।’