রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁওয়ের গ্র্যান্ড বলরুমে গতকাল বণিক বার্তা আয়োজিত ‘বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও রূপান্তর’ শীর্ষক পলিসি কনক্লেভে বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তা ও ব্যাংকারদের বক্তব্যে বিষয়টি উঠে এসেছে। জ্বালানি সরবরাহের নিশ্চয়তা ও নীতিগত স্থিতিশীলতা ছাড়া দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ বাড়ানো সম্ভব নয় বলেও মনে করছেন তারা।
পলিসি কনক্লেভে উন্মুক্ত আলোচনায় অংশ নিয়ে ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স (আইসিসি) বাংলাদেশের সভাপতি মাহবুবুর রহমান জানান, বর্তমানে জ্বালানি সংকটের কারণে বিদ্যমান শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। নতুন বিনিয়োগও নিরুৎসাহিত হচ্ছে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসারে সরকারকে দ্রুত উদ্যোগ নিতে হবে উল্লেখ করে এ ব্যবসায়ী নেতা বলেন, ‘শুধু শিল্প-কারখানার ছাদের ওপর নির্ভর করে কার্যকর সমাধান সম্ভব নয়। কারণ ছাদে বাগানসহ অন্যান্য ব্যবহারের প্রবণতা বাড়ছে এবং ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ শিল্পের বড় চাহিদা পূরণে যথেষ্ট নয়। তাই সরকারের অব্যবহৃত জমি দ্রুত লিজ দিয়ে বড় পরিসরে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। দেশী-বিদেশী বিনিয়োগকারীদের জন্য আগামী ছয় মাসের মধ্যে জমি বরাদ্দ নিশ্চিত করা গেলে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বড় বিনিয়োগ আসবে।’
জ্বালানি সরবরাহের নিশ্চয়তা ও নীতিগত পূর্বানুমানযোগ্যতা ছাড়া দেশী-বিদেশী কোনো বিনিয়োগই আসবে না বলে জানান মাহবুবুর রহমান। তিনি বলেন, ‘বিদেশী বিনিয়োগকারীরা প্রথমে দেশীয় উদ্যোক্তাদের অভিজ্ঞতা মূল্যায়ন করেন। বিদ্যুৎ ও জ্বালানির অনিশ্চয়তা থাকলে বিনিয়োগ আকর্ষণ করা সম্ভব নয়। তাছাড়া জ্বালানি সংকট দীর্ঘায়িত হলে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক চাপ আরো বাড়বে, ঋণ পরিশোধে ব্যর্থতা বাড়বে এবং এর ফলে ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণও আরো বৃদ্ধি পাবে।’
সরকার ব্যবসা সহজীকরণ, সময় কমানো ও সেবা সহজ করার কথা বললেও বাস্তবে পরিস্থিতি উল্টো বলে মন্তব্য করেছেন মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মোস্তফা কামাল। তিনি বলেন, ‘সরকারি বিভিন্ন সংস্থা ও জ্বালানি খাতের প্রতিষ্ঠানে ব্যবসা পরিচালনা দিন দিন আরো জটিল হয়ে উঠছে। আমি ২০১৯ সালে গ্যাস সংযোগের জন্য অর্থ জমা দিলেও এখনো তা পাইনি। এতে আমার প্রায় ১৪০ কোটি টাকা আটকে আছে। একইভাবে কুমিল্লা ইকোনমিক জোনে গ্লাস, স্টিলসহ কয়েকটি শিল্প প্রকল্পে বিপুল বিনিয়োগ ও বিদেশ থেকে যন্ত্রপাতি আনার পরও গ্যাস সংযোগ না পাওয়ায় উৎপাদন শুরু করা যাচ্ছে না। অথচ শিল্পাঞ্চলে গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি ও অন্যান্য অবকাঠামোগত সেবা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল বেজা।’
মেঘনা গ্রুপের এমডি মোস্তফা কামাল জানান, তার ইকোনমিক জোনে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও চীনসহ ১৫টি বিদেশী প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগ করেছে এবং প্রায় ১২ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে আইএফসি, বিশ্বব্যাংকসহ আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান থেকে প্রায় ৬০০ মিলিয়ন ডলার ঋণ নেয়া হয়েছে। কিন্তু গ্যাস সংযোগ না পাওয়ায় প্রকল্পগুলো ঝুঁকিতে পড়েছে এবং তিনি প্রায় দেউলিয়া হওয়ার অবস্থায় পৌঁছেছেন। তার ৫৭টি শিল্পপ্রতিষ্ঠানে প্রায় ৬৫ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান রয়েছে, ফলে একটি বড় প্রকল্প আটকে গেলে অন্যগুলোর ওপরও প্রভাব পড়বে।
মোস্তফা কামাল বলেন, ‘বিদেশী বিনিয়োগকারীদের নানা প্রতিশ্রুতি দিয়ে দেশে আনা হলেও বাস্তব পরিস্থিতি তাদের আস্থা নষ্ট করছে। বিভিন্ন প্রশাসনিক জটিলতা, মামলা ও হয়রানিমূলক প্রক্রিয়ার কারণে দেশের ভাবমূর্তিও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। উদ্যোক্তাদের এক দপ্তর থেকে আরেক দপ্তরে ঘুরতে হচ্ছে, সেবার খরচও আগের তুলনায় বেড়েছে। শুধু বড় উদ্যোক্তা নয়, নতুন উদ্যোক্তারাও যেন সহজে নিজেদের সমস্যার কথা জানাতে পারেন, সে সুযোগ তৈরি করতে হবে। প্রকৃত অর্থে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান উভয়ই বাড়বে।’
জ্বালানি সংকটের কারণে উদ্যোক্তারা বিপদে পড়ায় ব্যাংকের লগ্নি করা অর্থও ঝুঁকিতে পড়েছে বলে জানান ব্যাংকাররা। উন্মুক্ত আলোচনায় অংশ নিয়ে ট্রাস্ট ব্যাংকের এমডি ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) আহসান জামান চৌধুরী বলেন, ‘দেশের অর্থনীতি ও ব্যবসায়ীদের জন্য বর্তমানে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ জ্বালানি সংকট। এ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টিকে জাতীয় পর্যায়ে আলোচনায় নিয়ে আসার জন্য আমি বণিক বার্তাকে ধন্যবাদ জানাই। ব্যাংকগুলো বর্তমানে শিল্প খাতে বড় অংকের বিনিয়োগ করছে। প্রকৃতপক্ষে এ ধরনের দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের একটি বড় অংশ সিকিউরিটিজ এক্সচেঞ্জ কমিশন বা এ ধরনের প্রতিষ্ঠান থেকে আসার কথা ছিল। কিন্তু তারা সে ভূমিকা যথাযথভাবে পালন করতে না পারায় ব্যাংকগুলো এগিয়ে এসেছে। বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানে ব্যাংকগুলোর উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ রয়েছে। এখন সবচেয়ে বড় সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে গ্যাসের সংকট।’
শুধু ট্রাস্ট ব্যাংকেরই প্রায় ৭-৮ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ গ্যাস সংকটের কারণে কার্যত আটকে আছে উল্লেখ করে ব্যাংকটির এমডি বলেন, ‘অনেকেই এর দায় গ্রাহক বা ব্যাংকের ওপর চাপাতে পারেন। কিন্তু প্রকল্পে অর্থায়নের আগে আমরা প্রয়োজনীয় সব বিষয় যাচাই করি। একটা প্রজেক্ট পাস করার আগে দেখি তিতাসের অনুমোদন রয়েছে কিনা? গ্রাহক টাকা দিয়েছে, গ্যারান্টি আছে, সে জেনারেটর পর্যন্ত ইনস্টল করেছে। কিন্তু এখন গ্যাস নেই। আমি মনে করি, এটা জাতীয় ক্ষতি। কারণ যারা এ ইকুইপমেন্টগুলো এনেছে, তিন-চার বছর চালাতে পারছে না, এগুলো ধীরে ধীরে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে এবং শেষ পর্যন্ত এ ক্ষতি হয়তো আমাদের ট্যাক্সের টাকায়ই পূরণ হবে। আমি মনে করি এটার একটা সমাধান প্রয়োজন। কারণ এ গ্রাহকরা যদি খারাপ হয় তাহলে শেষ পর্যন্ত ব্যাংক খাতই ধ্বংস হবে।’
শিল্প খাত প্রকৃত শিল্পোদ্যোক্তাদের কাছেই থাকা উচিত বলে মত দেন স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড বাংলাদেশের সিইও (অন্তর্বর্তীকালীন) মো. এনামুল হক। তিনি বলেন, ‘শিল্প খাতকে পুনরুজ্জীবিত করতে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আমাদের ৬০ হাজার কোটি টাকার একটি প্রণোদনা প্যাকেজের কথা বলছেন। এরই মধ্যে এখানে গ্যাস সংকটের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। এ সংকটের মধ্যে দেশের ব্যাংক খাত কীভাবে এগিয়ে যাবে সে বিষয়ে আন্তঃমন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমি মনে করি, শিল্প খাত প্রকৃত শিল্পোদ্যোক্তাদের হাতেই থাকা উচিত। সুবিধাভোগী কিছু ব্যক্তি এসে যদি কিছু প্রজেক্ট নিয়ে নেয় এবং কিছুদিন পর অন্য একজন উদ্যোক্তার কাছে তা বিক্রি করে দেয়ার মানসিকতায় থেকে যায়, তাহলে শিল্প খাত সম্প্রসারিত হবে না। আমাদের উচিত প্রকৃত উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করা, যাতে তারা আরো ভালোভাবে সামনে এগিয়ে যেতে পারে।’
দেশে জ্বালানি সংকটের কারণে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে গ্যাসনির্ভর শিল্প। তৈরি পোশাক, স্পিনিং, উইভিং, ডাইং, নিটিং, সিরামিক, কাচ, ইস্পাত, সিমেন্ট, কাগজ, রাসায়নিক ও খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ শিল্পের অনেক কারখানা প্রয়োজনীয় গ্যাসের চাপ না থাকায় সক্ষমতা অনুযায়ী উৎপাদন করতে পারছে না। শিল্প মালিকদের সংগঠনগুলোর দাবি, প্রায় ৪০০ গ্যাসনির্ভর কারখানা পূর্ণ সক্ষমতায় পরিচালনা করা সম্ভব হচ্ছে না। অনেক কারখানায় উৎপাদন ৩০-৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে। পূর্ণ সক্ষমতায় চলতে না পেরে অনেক কারখানা বন্ধও হয়ে গেছে। এর বিরূপ প্রভাব আবার গিয়ে পড়েছে ব্যাংকের খেলাপি ঋণে। এসব প্রতিষ্ঠানের বিপরীতে বিতরণ করা ঋণ নিয়ে ব্যাংকগুলোর বিপদ বাড়ছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যানুসারে, চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ) খেলাপি ঋণ ৩১ হাজার ৪৮৭ কোটি টাকা বেড়েছে। গত মার্চ শেষে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের স্থিতি ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা ছাড়ায়, যা ব্যাংকগুলোর বিতরণকৃত ঋণের ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশ। এর আগে গত বছরের সেপ্টেম্বরে খেলাপি ঋণের হার প্রায় ৩৬ শতাংশ পর্যন্ত উঠে গিয়েছিল।