জেলার অর্ধেকেরও বেশি বিদ্যালয় এখন চলছে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক দিয়ে। এতে বাড়তি দাপ্তরিক কাজের বোঝা বইতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন শিক্ষকরা। প্রশাসনিক শিথিলতায় শ্রেণীকক্ষে পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে। দ্রুত এ সংকট নিরসন করা না হলে জেলার প্রাথমিক শিক্ষা কার্যক্রম আরো বিপর্যস্ত হয়ে পড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
রাজবাড়ী জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কার্যালয়ের তথ্যমতে, জেলায় মোট ৪৮১টি অনুমোদিত সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। এর মধ্যে ২৭৯টি বিদ্যালয়েই কোনো প্রধান শিক্ষক নেই। ফলে অর্ধেকের বেশি প্রতিষ্ঠান চলছে ভারপ্রাপ্তদের দিয়ে।
উপজেলাভিত্তিক তথ্যে দেখা যায়, জেলা সদরে অনুমোদিত পদ ১৩৪টি। শতকরা ৮০ ভাগ হিসেবে পদোন্নতিযোগ্য পদ ১০৭টি। শতকরা ২০ ভাগ হিসেবে সরাসরি নিয়োগযোগ্য পদ ২৭টি। সদরে পদোন্নতিপ্রাপ্ত শিক্ষক ১৬ জন এবং সরাসরি নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষক ৪২ জন। মোট কর্মরত শিক্ষক ৫৮ জন। বর্তমানে সদরে মোট শূন্যপদ ৭৬টি। এর মধ্যে পদোন্নতিযোগ্য শূন্যপদ ৯১ জন ও সরাসরি নিয়োগযোগ্য ১৫ জন। চলতি দায়িত্বে আছেন ১২ জন এবং মামলাজনিত কারণে সংরক্ষিত পদ সাতটি।
পাংশা উপজেলায় অনুমোদিত পদ ১২১টি। পদোন্নতিযোগ্য পদ ৯৭টি এবং সরাসরি নিয়োগযোগ্য ২৪টি। এখানে পদোন্নতিপ্রাপ্ত শিক্ষক নয়জন ও সরাসরি নিয়োগপ্রাপ্ত ৩৮ জন। মোট কর্মরত শিক্ষক ৪৭ জন। পাংশায় মোট শূন্যপদ ৭৪টি। এর মধ্যে পদোন্নতিযোগ্য ৮৮ জন ও সরাসরি নিয়োগযোগ্য ১৪ জন। চলতি দায়িত্বে আছেন ২৪ জন ও মামলাজনিত সংরক্ষিত পদ আটটি।
বালিয়াকান্দি উপজেলায় অনুমোদিত পদ ৯৯টি। পদোন্নতিযোগ্য পদ ৭৯টি ও সরাসরি নিয়োগযোগ্য ২০টি। পদোন্নতিপ্রাপ্ত শিক্ষক ১৫ জন ও সরাসরি নিয়োগপ্রাপ্ত ২৭ জন। মোট কর্মরত শিক্ষক ৪২ জন। মোট শূন্যপদ ৫৭টি। এর মধ্যে পদোন্নতিযোগ্য ৬৪ জন এবং সরাসরি নিয়োগযোগ্য সাতজন। চলতি দায়িত্বে ২৯ জন ও সংরক্ষিত পদ সাতটি।
কালুখালী উপজেলায় অনুমোদিত পদ ৭৬টি। পদোন্নতিযোগ্য পদ ৬১টি ও সরাসরি নিয়োগযোগ্য ১৫টি। পদোন্নতিপ্রাপ্ত ১২ জন এবং সরাসরি নিয়োগপ্রাপ্ত ২৬ জন। মোট কর্মরত শিক্ষক ৩৮ জন। কালুখালীতে মোট শূন্যপদ ৩৮টি। এর মধ্যে পদোন্নতিযোগ্য ৮৯ জন ও সরাসরি নিয়োগযোগ্য ১১ জন। চলতি দায়িত্বে আছেন ১৬ জন এবং সংরক্ষিত পদ পাঁচটি।
গোয়ালন্দ উপজেলায় অনুমোদিত পদ ৫১টি। পদোন্নতিযোগ্য পদ ৪১টি ও সরাসরি নিয়োগযোগ্য ১০টি। পদোন্নতিপ্রাপ্ত ছয়জন ও সরাসরি নিয়োগপ্রাপ্ত ১১ জন। মোট কর্মরত শিক্ষক ১৭ জন। গোয়ালন্দে মোট শূন্যপদ ৩৪টি। পদোন্নতিযোগ্য ৩৫ জন ও সরাসরি নিয়োগযোগ্য একজন। চলতি দায়িত্বে ১৫ জন ও সংরক্ষিত পদ একটি।
সামগ্রিকভাবে রাজবাড়ী জেলায় অনুমোদিত ৪৮১টি পদের মধ্যে পদোন্নতিযোগ্য ৩৮৫টি এবং সরাসরি নিয়োগযোগ্য ৯৬টি পদ। জেলায় পদোন্নতিপ্রাপ্ত শিক্ষক ৫৮ জন। মোট কর্মরত প্রধান শিক্ষক ২০২ জন। পুরো জেলায় মোট শূন্যপদ ২৭৯টি। এর মধ্যে পদোন্নতিযোগ্য শূন্যপদ ৩২৭ জন, সরাসরি নিয়োগযোগ্য ৪৮ জন, চলতি দায়িত্বে ৯৬ জন এবং মামলাজনিত সংরক্ষিত পদ ২৮টি।
সরজমিনে শহীদ স্মৃতি স্টেডিয়াম, গোদার বাজার, চর ধুঞ্চী ও মুন্সী বেলায়েত হোসেন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ঘুরে দেখা যায়, প্রধান শিক্ষক না থাকায় এসব স্কুলে শিক্ষার্থী উপস্থিতি কমছে ও পাঠদান বিঘ্নিত হচ্ছে।
শহীদ স্মৃতি স্টেডিয়াম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক সালমা সুলতানা বলেন, ‘দুজনের দায়িত্ব একজন পালন করতে গিয়ে বিপাকে পড়তে হয়েছে। অনেক শিক্ষক ভারপ্রাপ্ত শিক্ষককে প্রধান শিক্ষক হিসেবে মেনে নিতে রাজি নয়। যে কারণে যে যার মতো আসা-যাওয়া করেন। আবার শ্রেণীকক্ষের পাঠদান বাদ দিয়ে অফিশিয়াল কাজ সম্পন্ন করতে হচ্ছে। যে কারণে ব্যাহত হচ্ছে পাঠদান।’ তিনি দ্রুত স্থায়ী প্রধান শিক্ষক দেয়ার দাবি জানান।
গোদার বাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক রেহেনা আক্তার বলেন, ‘প্রধান শিক্ষক নেই মানে বিদ্যালয়ের একজন সহকারী শিক্ষক ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। যে শিক্ষক দায়িত্ব পালন করছেন তার শ্রেণী পাঠদানের খবর নিচ্ছে কে? যিনি ভারপ্রাপ্ত তাকে দাপ্তরিক কাজ-মিটিং নিয়ে ব্যস্ত থাকতে হয়। আবার নিয়মিত পাঠদান করতে পারলে ক্লাস অপূর্ণ থেকে যায়। ক্লাস না নিলে শিক্ষার্থীরা হইহুল্লোড় করে। এতে অন্য ক্লাসের শিক্ষার্থীরা বিরক্ত হয়। যে কারণে অনেক শিক্ষার্থী স্কুলে আসা বন্ধ করেছে।’
চর ধুঞ্চী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক কাজী কোহিনুর আক্তার বলেন, ‘সহকারী শিক্ষককে প্রধান শিক্ষক হিসেবে মানতে চান না অন্য শিক্ষকরা। আবার বেতনের টাকা দিয়ে বিদ্যালয়ের খরচাদি করতে হচ্ছে, এটা একটা বড় সমস্যা। যারা পদোন্নতির তালিকায় আছেন তাদের পদোন্নতি দিয়ে শূন্য পদগুলো পূরণ করা দরকার।’ একই ধরনের কথা জানান মুন্সী বেলায়েত হোসেন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক স্বপ্না রানী পোদ্দার।
সার্বিক বিষয়ে রাজবাড়ী জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. তবিবুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘রাজবাড়ীতে ৪৮১টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে, এর মধ্যে ২৭৯টিতে প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য। ওইসব বিদ্যালয় ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক দিয়ে চলছে। শূন্যপদ পূরণ করার জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। আশা করছি, দ্রুত সময়ের মধ্যেই মন্ত্রণালয় একটা ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।’