কুষ্টিয়ায় তিনদিনের লালন উৎসব ও মেলা শুরু শনিবার

‘মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি’— বাউলসম্রাট লালন শাহের এ দর্শন সামনে রেখে কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়ায় আগামীকাল শুরু হচ্ছে লালনমেলা ও আলোচনা অনুষ্ঠান। লালন শাহের ১৩৬তম তিরোধান দিবস উপলক্ষে লালন একাডেমি চত্বরে এ আয়োজন চলবে আগামী ১৯ অক্টোবর পর্যন্ত। তিনদিনের এ আয়োজনে থাকছে উদ্বোধনী অনুষ্ঠান, আলোচনা সভা, দেশের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য এবং লালনসংগীতের আসর।

ছেঁউড়িয়ায় তিনদিনের এ মেলা ঘিরে নেয়া হয়েছে ব্যাপক প্রস্তুতি। আয়োজকদের প্রত্যাশা, দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে লালনভক্ত, বাউলসাধক, গবেষক, শিল্পী, সংস্কৃতিকর্মী ও দর্শনার্থীদের পদচারণায় মুখর হয়ে উঠবে লালন আখড়াবাড়ি। বাউলগানের সুর, সাধক-অনুরাগীদের ভাববিনিময় এবং লোকজ সংস্কৃতির নানা আয়োজনে স্থানটি হয়ে উঠবে এক প্রাণবন্ত সাংস্কৃতিক মিলনকেন্দ্র। লালনের মানবতাবাদী দর্শন, অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও সাম্যের বাণীকে ধারণ করে এ মেলা মানুষে মানুষে সম্প্রীতি ও মিলনের বার্তা ছড়িয়ে দেবে—এমনটাই প্রত্যাশা আয়োজক ও লালন-অনুরাগীদের।

আগামীকাল বিকাল ৩টায় উদ্বোধনী ও আলোচনা অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে শুরু হচ্ছে এবারের আয়োজন। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে থাকবেন সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী। এছাড়া অতিথি হিসেবে থাকবেন সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করবেন কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট এবং লালন একাডেমির সভাপতি তৌহিদ বিন-হাসান।

উদ্বোধনী দিনের কর্মসূচির অন্যতম আকর্ষণ বিকাল ৫টায় লালনসংগীতের আসর। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা শিল্পীদের কণ্ঠে লালনের গান শোনার সুযোগ পাবেন দর্শনার্থীরা।

দীর্ঘ ঐতিহ্য ও প্রাণের টানে ছেঁউড়িয়ার লালন আখড়াবাড়িতে যুগ যুগ ধরে বসে আসছে লালন মেলা। বাউলসম্রাটের ভক্ত-অনুসারী থেকে শুরু করে নানা শ্রেণী-পেশার মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নেন এ মেলায়। বাউলগান, একতারার সুর আর সাধক-অনুরাগীদের উচ্ছ্বাসে মুখর হয়ে ওঠে লালন একাডেমি চত্বর।

লালনের দর্শনে মানুষের পরিচয়ই মুখ্য, ধর্মীয় কিংবা সামাজিক পরিচয়ের বিভাজন নয়। তার গানে দেহতত্ত্ব, আত্মঅন্বেষণ, প্রেম, সাম্য ও মানবমুক্তির যে গভীর বাণী ধ্বনিত হয়েছে, তা মানুষকে নিজের ভেতরের মানুষকে খুঁজতে এবং ভেদাভেদের ঊর্ধ্বে উঠে মানবতার বন্ধনে আবদ্ধ হতে আহ্বান জানায়। সেই দর্শনেরই জীবন্ত প্রকাশ লালন মেলা। তাই এটি নিছক কোনো সাংস্কৃতিক আয়োজন নয়; বরং বাঙালির অসাম্প্রদায়িক চেতনা, লোকজ ঐতিহ্য ও মানবিক মূল্যবোধের এক গভীর উদযাপন। সময়ের পরিবর্তনে পৃথিবী যতই বিভাজিত হোক, লালনের গান ও দর্শন ততই মনে করিয়ে দেয়—মানুষের চেয়ে বড় পরিচয় নেই, মানুষের চেয়ে বড় সত্য নেই। আর সেই চিরন্তন সত্যের টানেই প্রতি বছর লালন আখড়াবাড়িতে জড়ো হন অসংখ্য মানুষ, গানের সুরে, ভাবের আবেশে ও মিলনের আনন্দে খুঁজে ফেরেন মনের মানুষকে।

আরও