চলতি এপ্রিলের জন্য সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত ১২ কেজি সিলিন্ডার গ্যাসের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ১ হাজার ৭২৮ টাকা। নতুন এ দামের ফলে মার্চের তুলনায় এক লাফে দাম বেড়েছে ৩৮৭ টাকা, যা প্রায় ২৯ শতাংশ। গত মাসে একই সিলিন্ডারের এলপিজির দাম ছিল ১ হাজার ৩৪১ টাকা।
গাড়িতে ব্যবহৃত অটোগ্যাসের দামও বাড়িয়েছে কমিশন। চলতি মাসের জন্য অটোগ্যাসের লিটারপ্রতি দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৭৯ টাকা ৭৭ পয়সা, যা মার্চে ছিল ৬১ টাকা ৮৩ পয়সা। অর্থাৎ এক মাসের ব্যবধানে অটোগ্যাসের দামও বেড়েছে ২৯ শতাংশের বেশি।
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্বব্যাপী সংকট তৈরি হলেও সরকার এখনো জ্বালানি তেল ও বিদ্যুতের দাম বাড়ায়নি। তবে এলপিজির দাম প্রতি মাসে সমন্বয়ের ধারাবাহিকতায় এটি কয়েক বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ বৃদ্ধি। বিইআরসি জানিয়েছে, বিশ্ববাজারে এলপিজির প্রধান উপাদান বিউটেন ও প্রোপেনের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির কারণে দেশের বাজারেও এ দাম সমন্বয় করা হয়েছে।
এলপিজির নতুন দাম গতকাল সন্ধ্যা থেকেই কার্যকর হয়েছে। এর আগে মার্চে রান্নার কাজে ব্যবহৃত ১২ কেজি এলপিজির দাম ১ হাজার ৩৪১ টাকা নির্ধারণ করে দিয়েছিল বিইআরসি। তবে দাম নির্ধারণের আগেই বাজারে ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছিল ১২ কেজি সিলিন্ডারের এলপি গ্যাস। ফলে নতুন মূল্য ঘোষণার পর দাম আরো বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন ভোক্তারা।
বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্য সংকটের কারণে সিপি প্রাইস (সৌদি আরামকো ঘোষিত দাম) অনেক বেড়ে গেছে। আমরা শুধু সিপিটা সমন্বয় করেছি। তাতেই এ দাম পড়েছে এলপিজির। অপারেটররা ফ্রেইট কস্টের (জাহাজ ভাড়া) কথা জানিয়েছে। তারা ফ্রেইট ৩৫০ ডলার করার কথা বলেছে। আমরা এটা করিনি। হয়তো এটাও সমন্বয় করতে হবে।’
দেশে এলপিজির দাম অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেড়েছে। এ পরিস্থিতিতে বাজার তদারকি জোরদার করা হবে কিনা জানতে চাইলে বিইআরসির চেয়ারম্যান জানান, বাজার মনিটরিংয়ের জন্য আগামী রোববার জেলা পর্যায়ে চিঠি পাঠানো হবে, যাতে কমিশন নির্ধারিত দামে এলপিজি বিক্রি নিশ্চিত করা যায়।
২০২১ সালের এপ্রিল থেকে দেশে এলপিজির দাম নির্ধারণ করে আসছে বিইআরসি। এ জ্বালানি পণ্য উৎপাদনের প্রধান উপাদান প্রোপেন ও বিউটেন, যা বেসরকারি অপারেটররা বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি করে। প্রতি মাসে সৌদি আরবের প্রতিষ্ঠান আরামকো এ দুই উপাদানের মূল্য ঘোষণা করে, যা সৌদি কার্গো মূল্য (সিপি) নামে পরিচিত। এটিকে ভিত্তিমূল্য ধরে দেশে এলপিজির দাম সমন্বয় করে বিইআরসি। পাশাপাশি আমদানিকারকদের ইনভয়েস মূল্য থেকে গড় হিসাব করে পুরো মাসের জন্য ডলারের বিনিময় হার নির্ধারণ করা হয়।
বিইআরসি সূত্রে জানা গেছে, চলতি এপ্রিলে প্রোপেন ও বিউটেনের সৌদি সিপি নির্ধারণ করা হয়েছে যথাক্রমে টনপ্রতি ৭৫০ ও ৮০০ ডলার। এতে দুই পণ্যের গড় মূল্য দাঁড়িয়েছে ৭৮২ দশমিক ৫০ ডলার। অন্যদিকে মার্চে প্রোপেন ও বিউটেনের দাম ছিল যথাক্রমে ৫৪৫ ও ৫৪০ ডলার, যার গড় ছিল ৫৪১ দশমিক ৭৫ ডলার।
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাবে এক মাসের ব্যবধানে প্রোপেন ও বিউটেনের দাম গড়ে ৪৪ দশমিক ৪৩ শতাংশ বেড়েছে, যা দেশের এলপিজির মূল্যবৃদ্ধির প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে বিইআরসি নির্ধারিত চলতি মাসের এলপিজির দাম নিয়ে অপারেটরদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তাদের মতে, এলপিজি পরিবহনের জাহাজ ভাড়া অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেলেও তা মূল্য নির্ধারণে বিবেচনায় নেয়া হয়নি।
ওমেরা পেট্রোলিয়ামের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) তানজিম চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বিইআরসি এলপিজির দাম নির্ধারণে সিপি প্রাইস সমন্বয় করেছে। এখানে প্রকৃত ফ্রেইট কস্ট বিবেচনায় নেয়া হয়নি। বর্তমানে এলপিজির সরবরাহকারীরা ফ্রেইট কস্ট ৩০০-৩৫০ ডলার পর্যন্ত চাচ্ছে। এটা দিয়েও এখন জাহাজ পাওয়া যাচ্ছে না। বিইআরসি প্রতি ডলার ফ্রেইট কস্ট ধরেছে ১২০ ডলার। অথচ সরকার নিজেই এলএনজি আমদানি করতে গিয়ে ফ্রেইট কস্ট পাচ্ছে ১৬৫ ডলার। অপারেটরদের এটা নিয়ে অসন্তোষ রয়েছে। আমরা “নোট অব ডিসেন্ট” দিয়েছি। ফ্রেইট কস্ট যুক্ত হলে ১২ কেজি সিলিন্ডার এলপিজির দাম পড়বে ২ হাজার টাকার ওপর।’
এদিকে ১২ কেজি সিলিন্ডারের পাশাপাশি অন্যান্য সিলিন্ডার গ্যাসের দামও বাড়ানো হয়েছে। নতুন দামে ১৫ কেজি সিলিন্ডার ১ হাজার ১৬১ টাকা, ২০ কেজি ২ হাজার ৮৮১, ২৫ কেজি ৩ হাজার ৬০১, ৩০ কেজি ৪ হাজার ৩২১, ৩৫ কেজি ৫ হাজার ৪১ ও ৪৫ কেজি সিলিন্ডার গ্যাস ৬ হাজার ৪৮২ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। সে হিসাবে বিভিন্ন আকারের সিলিন্ডারে দাম বেড়েছে প্রায় সাড়ে ৩৫০ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ২ হাজার ৪৫৪ টাকা পর্যন্ত।