কর্মী অধিগ্রহণ শর্তে পিছু হটছে স্ট্যান্ডার্ট চার্টার্ড বাংলাদেশের রিটেইল ব্যাংকিংয়ের ক্রেতারা

বাংলাদেশ তথা এ অঞ্চলে ১২০ বছরেরও বেশি সময় ধরে ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনা করছে যুক্তরাজ্যভিত্তিক বহুজাতিক ব্যাংক স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড।

ক্রেডিট কার্ডসহ রিটেইল ব্যাংকিং ব্যবসা বিক্রির উদ্যোগ নিয়েছে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড বাংলাদেশ। এ ব্যবসা অধিগ্রহণে আগ্রহী চারটি বেসরকারি ব্যাংককে এরই মধ্যে গোপনীয়তা রক্ষা চুক্তি (এনডিএ) স্বাক্ষরের প্রস্তাব দিয়েছে বহুজাতিক ব্যাংকটি। তবে রিটেইল ব্যাংকিং ব্যবসার সঙ্গে এ খাতে কর্মরত প্রায় দেড় হাজার কর্মীরও দায়িত্ব নিতে হবে বলে শর্ত দেয়া হয়েছে। সে কারণে তিনটি ব্যাংকের সঙ্গে এনডিএ স্বাক্ষরের প্রক্রিয়া পিছিয়ে গেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

এনডিএ স্বাক্ষরের জন্য স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড বাংলাদেশ যে চারটি ব্যাংককে প্রস্তাব দিয়েছে, সেগুলো হলো ব্র্যাক ব্যাংক, সিটি ব্যাংক, পূবালী ব্যাংক ও মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক। এর মধ্যে সিটি ব্যাংক কেবল এনডিএ স্বাক্ষর সম্পন্ন করেছে। বাকি তিন ব্যাংক স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের প্রস্তাব ও শর্তগুলো পর্যালোচনা করছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

এ বিষয়ে চারটি ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহীসহ সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেছে বণিক বার্তা। তাদের কয়েকজন জানান, কর্মীদের অধিগ্রহণের শর্তেই রিটেইল ব্যাংকিং ব্যবসা বিক্রির প্রস্তাব দিয়েছে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড বাংলাদেশ। তবে প্রায় দেড় হাজার কর্মীকে একসঙ্গে নেয়ার ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে তাদের বেতন-ভাতা। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেন, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের রিটেইল ব্যাংকিংয়ে কর্মরতরা দক্ষ ও অভিজ্ঞ হলেও তাদের বেতন-ভাতা স্থানীয় ব্যাংকগুলোর তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। ফলে বিপুলসংখ্যক উচ্চ বেতনপ্রাপ্ত কর্মী অধিগ্রহণের পর ব্যবসাটি লাভজনক রাখা কঠিন হতে পারে। এতে রিটেইল ব্যাংকিংয়ের পরিচালন ব্যয়ও বাড়বে।

একই সঙ্গে তৈরি হতে পারে অভ্যন্তরীণ বেতন বৈষম্যের সমস্যা। অধিগ্রহণের পর স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড থেকে আসা কর্মীদের তুলনামূলক বেশি বেতন-ভাতা বহাল থাকলে বিদ্যমান কর্মীদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। আবার সব কর্মীর বেতন কাঠামো সমন্বয় করতে গেলে সম্ভাব্য ক্রেতা ব্যাংকের ব্যয় আরো বেড়ে যাবে। এ কারণে ব্যবসার আর্থিক মূল্যায়নের পাশাপাশি কর্মীদের বেতন কাঠামো, পরিচালন ব্যয় ও ভবিষ্যৎ লাভজনকতা নিয়েও হিসাব-নিকাশ করতে হচ্ছে বলে জানিয়েছেন ঊর্ধ্বতন ওই কর্মকর্তারা।

জানতে চাইলে পূবালী ব্যাংক পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আলী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড বাংলাদেশের সিইওর সঙ্গে আমাদের বৈঠক হয়েছে। আমরা ব্যাংকটির রিটেইল ব্যাংকিং অধিগ্রহণে আগ্রহী। তারাও আমাদের ব্যাংকের বিষয়ে ইতিবাচক। কিন্তু সমস্যা হলো তাদের দেড় হাজার কর্মীকে নিয়ে। তারা কর্মীদের নেয়ার শর্তে রিটেইল ব্যাংকিং বিক্রির প্রস্তাব দিয়েছে। স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের বেতন কাঠামো আর পূবালী ব্যাংকের বেতন কাঠামো এক নয়। আমাদের পর্ষদে বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তবে আমরা এখনো স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের রিটেইল ব্যাংকিং অধিগ্রহণের বিষয়ে ইতিবাচক।’

বাংলাদেশ তথা এ অঞ্চলে ১২০ বছরেরও বেশি সময় ধরে ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনা করছে যুক্তরাজ্যভিত্তিক বহুজাতিক ব্যাংক স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড। রেকর্ড মুনাফার পাশাপাশি খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে রেখে বাংলাদেশে ব্যবসা পরিচালনায় ব্যাংকটির দীর্ঘ সুনাম রয়েছে। কেবল গত পাঁচ বছরেই এ দেশে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার নিট মুনাফা করেছে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড। সর্বশেষ ২০২৫ সালেও তাদের নিট মুনাফার পরিমাণ ছিল ৩ হাজার ২২০ কোটি টাকা, যা দেশের ৬২টি ব্যাংকের মধ্যে সর্বোচ্চ। এর আগে ২০২৪ সালে ৩ হাজার ৩০০ কোটি টাকার নিট মুনাফা করেছিল বহুজাতিক ব্যাংকটি।

কৌশলগত পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে কয়েক বছর ধরে বিশ্বের ছোট অর্থনীতির অনেক দেশ থেকে ব্যবসা সংকোচন কিংবা গুটিয়ে নেয়ার কাজ করছে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড। ২০২২ সালে অ্যাঙ্গোলা, ক্যামেরুন, গাম্বিয়া, জর্ডান, লেবানন, সিয়েরা লিওন ও জিম্বাবুয়ে থেকে অনশোর কার্যক্রম গুটিয়ে নেয় ব্যাংকটি। এছাড়া তানজানিয়া ও আইভোরি কোস্টে রিটেইল ব্যাংকিং বন্ধ করে করপোরেট ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাংকিংয়ে মনোযোগ দিয়েছে। সম্প্রতি শ্রীলংকা, উগান্ডা, জাম্বিয়া ও বতসোয়ানায়ও রিটেইল ব্যাংকিং ব্যবসা বিক্রি করে দিয়েছে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড। এ ধারাবাহিকতায় চলতি বছরের জুলাইয়ে বাংলাদেশেও রিটেইল ব্যবসা বিক্রির বিষয়ে আলোচনা শুরু হয়।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের পক্ষ থেকে রিটেইল ব্যাংকিং বিক্রি করার আগ্রহের কথা বাংলাদেশ ব্যাংককে জানানো হয়েছে। অফিশিয়ালিই তারা বিষয়টি জানিয়েছে। এখন দেশের কোন ব্যাংক তাদের রিটেইল ব্যাংকিং অধিগ্রহণ তথা কিনবে, আর কী শর্তে কিনবে, সেগুলো তাদের নিজস্ব বিষয়। এক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কোনো হস্তক্ষেপ করবে না। তবে কর্মীদের বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত হয়, সেটির দিকে আমাদের নজর থাকবে।’

রিটেইল ব্যাংকিং ব্যবসা কেনার বিষয়ে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের পক্ষ থেকে এনডিএ স্বাক্ষরের বিষয়ে মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংককেও (এমটিবি) প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। বিষয়টি নিশ্চিত করে এমটিবির ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এমটিবিসহ কয়েকটি ব্যাংক স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের পক্ষ থেকে প্রস্তাব পেয়েছে। এ ধরনের অধিগ্রহণ তথা বেচাকেনা দীর্ঘ প্রক্রিয়া। বিষয়টি এখনো একেবারেই প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে।’

স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড মাত্র ১৮টি শাখা ও একটি ইসলামিক ব্যাংকিং উইন্ডো নিয়ে বাংলাদেশে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। ২০২৫ সাল শেষে ব্যাংকটির মোট সম্পদ ও দায়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬১ হাজার ৮৫৪ কোটি টাকা। বিতরণকৃত ঋণ স্থিতি ছিল ৩০ হাজার ৪২৩ কোটি টাকারও কম। এত ছোট পোর্টফোলিও নিয়েও দেশের সবচেয়ে বেশি নিট মুনাফা করে আসছে ব্যাংকটি।

ব্যাংকটির ২০২৫ সালের নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের রিটেইল ব্যাংকিংয়ের বিতরণকৃত ঋণের স্থিতি ছিল ৬ হাজার ৮৪৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ৩ হাজার ৩৪৯ কোটি টাকা ছিল ব্যক্তিগত ঋণ। আর ক্রেডিট কার্ডে ১ হাজার ৬৯ কোটি, মর্টগেজ ঋণ ৯৫১ কোটি, স্টাফ লোন ৩৩১ কোটি, ওভারড্রাফট ৩৩ কোটি ও ৬ কোটি টাকা গাড়ি ঋণ ছিল। এছাড়া ব্যাংকটির ইসলামী ব্যাংকিং উইন্ডোর আওতায় উজরাহ ঋণ (সাদিক ক্রেডিট কার্ড) ৭৯ কোটি ও ডিমিনিশিং মুশারাকা প্রডাক্টে ১ হাজার ২৫ কোটি টাকার ঋণ ছিল। আর রিটেইল ব্যাংক খাতে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডে প্রায় ১৬ হাজার কোটি টাকার আমানত রয়েছে বলে জানা গেছে।

রিটেইল ব্যাংকিং বিক্রির বিষয়ে জানতে চাইলে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড বাংলাদেশের করপোরেট অ্যাফেয়ার্স, ব্র্যান্ড অ্যান্ড মার্কেটিং বিভাগের প্রধান বিটপী দাশ চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এগুলো বাজারে প্রচলিত গুঞ্জন বা জল্পনা। এ ধরনের জল্পনা নিয়ে আমরা কোনো মন্তব্য করি না। বর্তমানে আমাদের কার্যক্রম স্বাভাবিকভাবেই চলছে। এ মুহূর্তে আমাদের ব্যাংকিং সেবা ও কার্যক্রমে কোনো পরিবর্তন হয়নি।’

তিনি বলেন, ‘স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড গ্রুপ নিয়মিতভাবে আমাদের বৈশ্বিক ব্যবসায়িক মডেলের কার্যকারিতা মূল্যায়ন করে। প্রয়োজন অনুযায়ী যেসব ক্ষেত্রে আমাদের গ্রাহকদের জন্য সবচেয়ে স্বতন্ত্র ও কার্যকর সেবা দেয়ার সক্ষমতা রয়েছে, সেখানে সম্পদ ও মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করতে আমরা বিভিন্ন পদক্ষেপ নিই। আমরা একটি বৈশ্বিক “‍সুপার-কানেক্টর” ব্যাংক, যার বাংলাদেশ তথা এ অঞ্চলে ১২০ বছরেরও বেশি সময়ের গভীর শিকড় রয়েছে। বাংলাদেশে ব্যাংকটির সমৃদ্ধ ঐতিহ্য ও দীর্ঘদিনের উপস্থিতি রয়েছে এবং আমরা বাংলাদেশের প্রতি আমাদের প্রতিশ্রুতিতে অটুট রয়েছি।’

আরও