দেশের বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তারা নতুন কারখানা স্থাপনে মোট বিনিয়োগের প্রায় ৮০ শতাংশই ব্যয় করছেন জমি কেনা, মাটি ভরাট, ভবন নির্মাণ ও অন্যান্য পূর্তকাজে। ফলে উৎপাদনের মূল চালিকাশক্তি আধুনিক প্রযুক্তি, স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রপাতি, গবেষণা ও উন্নয়ন এবং দক্ষতা বৃদ্ধির মতো খাতে আর বেশি পুঁজি থাকছে না। এতে মোট বিনিয়োগের পরিমাণ বাড়লেও তার প্রত্যাশিত প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না উৎপাদনশীলতা, কর্মসংস্থান ও রফতানি সক্ষমতায়।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বিনিয়োগের এ ধরনের কাঠামো দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির জন্য একাধিক ঝুঁকি তৈরি করছে। প্রথমত, বিপুল পরিমাণ পুঁজি স্থায়ী সম্পদে আটকে থাকায় বিনিয়োগের বিপরীতে উৎপাদন বৃদ্ধির হার কমে যাচ্ছে। দ্বিতীয়ত, প্রযুক্তি ও উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর মতো খাতে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ না হওয়ায় নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির সুযোগও সীমিত থাকছে। তৃতীয়ত, উৎপাদন ব্যয় কমিয়ে শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ কমে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে রফতানি প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়ছে।
একই সঙ্গে ব্যাংকিং ব্যবস্থার অর্থও যদি উৎপাদনশীল শিল্পের পরিবর্তে জমি, ভবন ও অন্যান্য সম্পদভিত্তিক বিনিয়োগে বেশি প্রবাহিত হয়, তাহলে অর্থনীতিতে সে বিনিয়োগের মূল্য সংযোজন তুলনামূলকভাবে কম থাকে। এতে ঋণ ও সঞ্চয়ের মাধ্যমে যে মূলধন অর্থনীতিতে প্রবেশ করছে, তার একটি বড় অংশ উৎপাদন সক্ষমতা সম্প্রসারণের বদলে সম্পদ সঞ্চয়ে আটকে যাচ্ছে। ফলে বিনিয়োগ বাড়ছে ঠিকই, কিন্তু তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হারে উৎপাদনশীলতা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের পরিধি বাড়ছে না।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সাময়িক হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের মোট স্থায়ী মূলধন গঠন (জিএফসিএফ) দাঁড়িয়েছে ১৭ লাখ ৯ হাজার ৩৬০ কোটি টাকা। এর মধ্যে বেসরকারি খাতের অবদান ১৩ লাখ ১৭ হাজার ৭১২ কোটি টাকা, যা মোটের প্রায় ৭৭ শতাংশ। সরকারি খাতের অংশ ৩ লাখ ৯১ হাজার ৬৪৭ কোটি টাকা বা প্রায় ২৩ শতাংশ। তবে মোট মূলধন গঠনের সম্পদভিত্তিক চিত্রে বড় ধরনের ভারসাম্যহীনতা দেখা যাচ্ছে। মোট জিএফসিএফের ১৪ লাখ ৩৩ হাজার ৩৫ কোটি টাকা বা ৮৩ দশমিক ৮৩ শতাংশই গেছে নির্মাণ খাতে। বিপরীতে শিল্প-কারখানা ও যন্ত্রপাতিতে বিনিয়োগ হয়েছে মাত্র ১ লাখ ৩৯ হাজার ৩৬২ কোটি টাকা বা ৮ দশমিক ১৫ শতাংশ। পরিবহন সরঞ্জামে ৩ দশমিক ৭৫ শতাংশ এবং অন্যান্য সম্পদে ৪ দশমিক ২৬ শতাংশ বিনিয়োগ হয়েছে।
মূলধন গঠনের এ কাঠামোগত পরিবর্তনটি দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতারই প্রতিফলন। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে মোট জিএফসিএফের ৭২ দশমিক ১৭ শতাংশ ছিল নির্মাণ খাতে। একই সময়ে শিল্প-কারখানা ও যন্ত্রপাতিতে বিনিয়োগের অংশ ছিল ১৪ দশমিক ৫ শতাংশ। ওই বছর মোট স্থায়ী মূলধন গঠনের পরিমাণ ছিল ৮ লাখ ৩৯ হাজার ৭৬৮ কোটি টাকা। আট বছরের ব্যবধানে নির্মাণের অংশ বেড়েছে ১১ দশমিক ৬৬ শতাংশীয় পয়েন্ট। বিপরীতে শিল্প-কারখানা ও যন্ত্রপাতির অংশ কমেছে ৫ দশমিক ৯ শতাংশীয় পয়েন্ট। অর্থাৎ মূলধন গঠনের পরিমাণ দ্বিগুণেরও বেশি হলেও এর কাঠামো ক্রমেই নির্মাণনির্ভর হয়েছে।
দেশের বেসরকারি বিনিয়োগ দীর্ঘদিন ধরেই জিডিপির প্রায় ২৩-২৫ শতাংশের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। অর্থনীতির আকার ও কাঙ্ক্ষিত প্রবৃদ্ধির তুলনায় এ বিনিয়োগ যথেষ্ট নয়। তবে শুধু বিনিয়োগের হার বাড়ানোই যথেষ্ট নয়; সেই বিনিয়োগ কোন সম্পদে যাচ্ছে এবং তার মাধ্যমে কী ধরনের উৎপাদন সক্ষমতা তৈরি হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। একই পরিমাণ মূলধন আধুনিক যন্ত্রপাতি, প্রযুক্তি ও উৎপাদন ব্যবস্থায় বিনিয়োগ করা হলে যে অর্থনৈতিক ফল তৈরি হয়, জমি, ভবন বা কম উৎপাদনশীল সম্পদে বিনিয়োগের ফল তার চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘প্রশ্ন হলো অবকাঠামোর বাইরে আবাসিক ও বাণিজ্যিক নির্মাণে আমাদের ঝোঁক এত বেশি কেন এবং এ বিনিয়োগের কতটা সরাসরি উৎপাদনশীল কর্মকাণ্ডে যুক্ত হচ্ছে? এর পেছনে বিনিয়োগ পরিবেশের দুর্বলতা কাজ করতে পারে। শিল্প বা উৎপাদন খাতে বিনিয়োগ করতে গেলে জমি, অনুমোদন, বিদ্যুৎ-গ্যাস, অবকাঠামো ও অর্থায়নসহ নানা প্রক্রিয়ায় সময় ও লেনদেন ব্যয় হয়। ফলে একজন বিনিয়োগকারীর কাছে জমি, অ্যাপার্টমেন্ট বা ভবনে অর্থ রাখা তুলনামূলকভাবে নিরাপদ মনে হতে পারে। বিশেষ করে মূল্যস্ফীতির সময়ে এগুলো অনেকের কাছে “স্টোর অব ভ্যালু” হিসেবে কাজ করে।’
ঢাকায় এমন অনেক অ্যাপার্টমেন্ট ও বাণিজ্যিক সম্পদ রয়েছে, যেগুলো দীর্ঘদিন খালি পড়ে থাকে উল্লেখ করে ড. জাহিদ হোসেন বলেন, ‘এর মানে সেখানে বিপুল মূলধন আটকে আছে, কিন্তু তা থেকে প্রত্যাশিত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড তৈরি হচ্ছে না। ব্যাংক খাতেও উৎপাদনশীল বিনিয়োগের সুযোগ দুর্বল হলে আবাসন ও সম্পত্তিভিত্তিক ঋণের দিকে ঝোঁক তৈরি হতে পারে। মূল প্রশ্ন হলো আমাদের সঞ্চয় ও মূলধন কেন উৎপাদনশীল শিল্প, কৃষি, সেবা ও প্রযুক্তির বদলে স্থাবর সম্পদের দিকে বেশি যাচ্ছে? অবকাঠামো ও প্রয়োজনীয় আবাসনে বিনিয়োগ অবশ্যই দরকার। কিন্তু শিল্প, প্রযুক্তি, মেশিনারি ও উৎপাদনশীল ব্যবসায় বিনিয়োগের পরিবেশ শক্তিশালী করতে না পারলে এ নির্মাণনির্ভরতা অর্থনীতিতে সম্পদের কার্যকর বণ্টন নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করবে।’
জমি ও ভবনে অতিরিক্ত অর্থ আটকে গেলে প্রকল্পের মোট মূলধনের বড় অংশ স্থাবর সম্পদে চলে যায়। ফলে কারখানা চালুর পর কাঁচামাল, শ্রমিকের মজুরি, বিদ্যুৎ-গ্যাস বিলসহ পরিচালন ব্যয় মেটাতে প্রয়োজনীয় চলতি মূলধনের ঘাটতি তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে শিল্পাঞ্চল ও বড় শহরের আশপাশে জমির উচ্চ মূল্য, ভূমি উন্নয়ন, মাটি ভরাট এবং কারখানা ভবন নির্মাণের ব্যয় অনেক ক্ষেত্রে প্রকল্প ব্যয়ের বড় অংশ দখল করে নেয়। এতে যন্ত্রপাতি স্থাপন ও উৎপাদন কার্যক্রমে প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান কমে যায়। প্রকল্পের প্রয়োজনের তুলনায় বড় জমি কেনা, অতিরিক্ত অবকাঠামো নির্মাণ কিংবা বাজার চাহিদা ও ভবিষ্যৎ নগদ প্রবাহ যথাযথভাবে বিবেচনা না করে সম্পদে বিনিয়োগ করলে ‘ওভার ক্যাপিটালাইজেশন’-এর ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এতে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যায় এবং বাজারে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা কমে।
শিল্পের ইউটিলিটি সংকটও এ ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। জমি কেনা, মাটি ভরাট ও কারখানা ভবন নির্মাণে বিপুল অর্থ ব্যয়ের পরও কোনো কোনো উদ্যোক্তা দীর্ঘ সময় গ্যাস বা বিদ্যুৎ সংযোগ না পাওয়ায় উৎপাদনে যেতে পারছেন না। এ সময় প্রকল্পের ঋণের সুদ ও অন্যান্য আর্থিক ব্যয় চলতে থাকে, কিন্তু উৎপাদন থেকে আয় আসে না। ফলে উৎপাদন শুরুর আগেই ঋণের বোঝা বাড়ে এবং পরবর্তী সময়ে কিস্তি পরিশোধের সক্ষমতা দুর্বল হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
ইস্ট কোস্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান আজম জে চৌধুরীর মতে, প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার না হওয়া, অতিরিক্ত নির্মাণ ব্যয়, জ্বালানি সংকট ও অস্বাভাবিক জমির দাম বর্তমানে দেশের উৎপাদনমুখী খাতকে পিছিয়ে দিচ্ছে। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘দেশে রড ও স্টিল উপকরণের দাম বাড়ায় নির্মাণ খাতে খরচ অনেক বেড়েছে। অন্যদিকে সিমেন্ট খাতে চাহিদার তুলনায় অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা থাকায় প্রতিষ্ঠানগুলো টিকে থাকার প্রতিযোগিতায় লোকসান গুনেও কম দামে পণ্য বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছে। আবার সরকারি খাতের বড় বড় অবকাঠামো নির্মাণ ব্যয় নির্দিষ্ট বাজেটের মধ্যে রাখা সম্ভব হয় না।’
শিল্প স্থাপনে জমির আকাশচুম্বী দামকে অন্যতম বড় সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করে আজম জে চৌধুরী জানান, সরকারি অধিগ্রহণে অতিরিক্ত মূল্য পরিশোধের সুযোগ নিয়ে মধ্যস্বত্বভোগী ও দালাল চক্রের কারণে জমির দাম অস্বাভাবিকভাবে বাড়ানো হয়েছে। ফলে প্রকৃত জমি বিক্রেতারা কাঙ্ক্ষিত অর্থ না পেলেও শিল্প উদ্যোক্তাদের জন্য জমি কেনা অত্যন্ত ব্যয়বহুল হয়ে পড়েছে। শিল্পের মূল চালিকাশক্তি বিদ্যুৎ ও জ্বালানির নিরবচ্ছিন্ন সহজলভ্যতা নিশ্চিত না হলে কেবল জমি কিনে শিল্প গড়ে তোলা সম্ভব নয়। স্ট্যাপলারের পিনের মতো নিত্যব্যবহার্য ছোটখাটো পণ্য থেকে শুরু করে শিল্প-কারখানার ভারী যন্ত্রপাতি—সবকিছুর জন্যই দেশ এখনো বৈদেশিক আমদানির ওপর চরমভাবে নির্ভরশীল।
ভিয়েতনাম নিজেদের উৎপাদন সক্ষমতা ও প্রযুক্তির বিকাশ ঘটিয়ে বিশ্বে একটি জনপ্রিয় প্রোডাকশন বেজ তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। তাই কেবল তৈরি পোশাক খাতের ওপর নির্ভর না করে বাংলাদেশকে দেশীয় চাহিদা মেটানো ও আমদানিনির্ভরতা কমাতে লাইট ইন্ডাস্ট্রি এবং উৎপাদনমুখী বিভিন্ন খাতে অগ্রাধিকার দেয়া দরকার বলে মনে করেন এ শিল্পোদ্যোক্তা।
বেসরকারি খাতের অর্থায়ন কাঠামোও মূলধন গঠনের এ দুর্বলতাকে বাড়িয়ে দিচ্ছে। পুঁজিবাজার ও অন্যান্য দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের উৎস তুলনামূলক দুর্বল হওয়ায় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো প্রধানত ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরশীল। চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত দেশের মোট ব্যাংক ঋণের ৪৪ শতাংশ বা ৭ লাখ ৮৯ হাজার কোটি টাকা বেসরকারি শিল্প খাতে অর্থায়ন করা হয়েছে। বিপরীতে গত আড়াই বছরে পুঁজিবাজারে নতুন কোনো প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও) আসেনি। ফলে এ সময়ে নতুন ইকুইটি মূলধনের মাধ্যমে শিল্প খাতে অর্থায়নের সুযোগও তৈরি হয়নি। স্বাধীনতার পর গত পাঁচ দশকে পুঁজিবাজার থেকে যে পরিমাণ অর্থ সংগ্রহ হয়েছে, তা মোট স্থায়ী মূলধন গঠনের মাত্র ৬ শতাংশের সমপরিমাণ।
ব্যাংক ঋণের ক্ষেত্রে সম্পদভিত্তিক অর্থায়নের প্রবণতাও ঝুঁকি বাড়াতে পারে। শিল্প ঋণ অনুমোদনের সময় প্রকল্পের ভবিষ্যৎ নগদ প্রবাহের পরিবর্তে বন্ধকি সম্পদের মূল্যকে অতিরিক্ত গুরুত্ব দেয়া হলে উদ্যোক্তার কাছে উৎপাদন সক্ষমতা তৈরির চেয়ে জমি ও স্থাবর সম্পদ কেনার প্রণোদনা তৈরি হতে পারে। প্রকল্প বাস্তবে কতটা উৎপাদন করবে, বাজারে পণ্যের চাহিদা কতটা এবং ঋণের কিস্তি পরিশোধের মতো পর্যাপ্ত নগদ প্রবাহ তৈরি হবে কিনা—এসব বিষয় যথাযথভাবে যাচাই না হলে ঋণ পরবর্তী সময়ে ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
অতীতের কয়েকটি বড় ঋণ কেলেঙ্কারিতেও এর নজির রয়েছে। তৈরি পোশাক ও বস্ত্র খাতের এননটেক্স গ্রুপ ব্যবসা সম্প্রসারণে বড় অংকের ব্যাংক ঋণ নেয়। অভিযোগ রয়েছে, মূল শিল্পের সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি ঋণের উল্লেখযোগ্য অংশ টঙ্গী ও গাজীপুরে জমি ও অবকাঠামোয় আটকে যায়। পরবর্তী সময়ে চলতি মূলধনের সংকট ও উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় গ্রুপটির ঋণের বড় অংশ খেলাপিতে পরিণত হয়। চামড়া ও জুতা রফতানিকারক ক্রিসেন্ট গ্রুপের ক্ষেত্রেও মূল ব্যবসার বাইরে জমি ও অবকাঠামোয় বড় বিনিয়োগের তথ্য সামনে আসে। সাভারসহ বিভিন্ন এলাকায় জমি কেনা ও স্থায়ী সম্পদে বিনিয়োগের পর গ্রুপটির বিপুল ব্যাংক ঋণ খেলাপিতে পরিণত হয়। চট্টগ্রামভিত্তিক সাদ মুসা গ্রুপও ব্যাংক ঋণের অর্থে জমি, অ্যাপার্টমেন্ট ও শিল্প পার্কে বিনিয়োগের পর বড় ঋণখেলাপি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে।
বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান মাসুদ খান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সাম্প্রতিক সময়ে সরকারের উন্নয়ন ব্যয় ও বড় অবকাঠামো প্রকল্পের গতি অনেকটাই কমেছে। একইভাবে বেসরকারি খাতেও নতুন কারখানা, প্লান্ট ও যন্ত্রপাতিতে বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে; বরং কিছু কারখানা বন্ধও হয়ে গেছে। ফলে মোট বিনিয়োগে নির্মাণ খাতের—বিশেষ করে ব্যক্তিগত বাড়ি নির্মাণের—অবদান তুলনামূলকভাবে বেড়েছে। তবে নির্মাণে বিনিয়োগ ব্যাপকভাবে বাড়ার কারণে নয়, বরং অন্য খাতের বিনিয়োগ কমে যাওয়ায় এর অনুপাত বেড়েছে। প্রবাসী আয়সহ বিভিন্ন উৎসের অর্থে গ্রাম ও মফস্বলে বাড়ি নির্মাণ অব্যাহত থাকলেও এসব বিনিয়োগের বড় অংশ নতুন উৎপাদন সক্ষমতা তৈরি করছে না। অন্যদিকে অর্থনীতির ভবিষ্যৎ চাহিদা, বিক্রি ও নগদ প্রবাহ নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে উদ্যোক্তাদের নতুন প্রকল্পে বিনিয়োগের আগ্রহ কমেছে। ব্যাংকগুলোও ঋণ বিতরণে আগের তুলনায় সতর্ক হওয়ায় বিনিয়োগ আরো বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে মোট মূলধন গঠনের পরিমাণে নির্মাণ খাতের অংশ বাড়লেও নতুন কারখানা ও উৎপাদন সক্ষমতা তৈরিতে এর প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। বিশেষ করে আবাসন ও বাণিজ্যিক সম্পত্তিতে বিনিয়োগের বিপরীতে আয়ও তুলনামূলকভাবে কম। তাই নির্মাণ খাতের উচ্চ অংশকে সরাসরি উৎপাদনশীল মূলধন গঠন হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; বরং এর একটি উল্লেখযোগ্য অংশ কম উৎপাদনশীল বিনিয়োগে যাচ্ছে।’
বিশ্বজুড়ে নির্মাণ খাতে মোট স্থায়ী মূলধনে নির্মাণ খাতের আধিপত্য থাকলেও সেটি বাংলাদেশের মতো এতটা কেন্দ্রীভূত নয়। বিশ্বব্যাংক এবং অর্গানাইজেশন ফর ইকোনমিক কোঅপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (ওইসিডি) তথ্যানুসারে, উন্নত অর্থনীতিতে জিএফসিএফে নির্মাণ খাতের অবদান ৪০-৫০ শতাংশ, উন্নয়নশীল অর্থনীতিতে ৫০-৬০ শতাংশ, স্বল্পোন্নত অর্থনীতিতে ৬০-৭০ শতাংশ। বৈশ্বিক পর্যায়ে অবকাঠামো ও নির্মাণ খাতে মূলধনের ঘনত্ব সাধারণত ৭০ শতাংশের মধ্যে সীমিত থাকে। দক্ষিণ এশিয়ার ক্ষেত্রে মোট স্থায়ী মূলধন কাঠামোতে নির্মাণ খাতের অবদান ৫৫-৬৫ শতাংশের মধ্যে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে তাই মূলধনের পরিমাণ বাড়ানোর পাশাপাশি মূলধনের গুণগত ব্যবহার নিশ্চিত করাই বড় চ্যালেঞ্জ। জমি, আবাসন ও অবকাঠামোয় বিনিয়োগ অর্থনীতির জন্য প্রয়োজনীয় হলেও এর একটি বড় অংশ যদি দীর্ঘদিন অব্যবহৃত থাকে কিংবা নতুন উৎপাদন সক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত না হয়, তাহলে বিনিয়োগের অর্থনৈতিক সুফল সীমিত থাকে। বিপরীতে আধুনিক যন্ত্রপাতি, প্রযুক্তি, গবেষণা ও উন্নয়ন, দক্ষ জনশক্তি, জ্বালানি দক্ষতা, রফতানি বৈচিত্র্য ও লজিস্টিকসে বিনিয়োগ উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর ভিত্তি তৈরি করে। বাংলাদেশের জন্য চ্যালেঞ্জ এখন শুধু বেশি বিনিয়োগ নয়; বরং সঞ্চয়কে এমন মূলধনে রূপান্তর করা, যা উৎপাদন বাড়ায়, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে, রফতানি সক্ষমতা বাড়ায় এবং অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি প্রতিযোগিতার ভিত্তি শক্তিশালী করে। অর্থাৎ অর্থনীতিকে ‘মূলধন পুঞ্জীভূত করার অর্থনীতি’ থেকে ‘উৎপাদনশীল মূলধন গঠনের অর্থনীতিতে’ রূপান্তর করাই এখন সবচেয়ে বড় প্রয়োজন।
দেশের মোট স্থায়ী মূলধন কাঠামোর বড় অংশই নির্মাণ ও অবকাঠামোতে কেন্দ্রীভূত হওয়ার তথ্যটি উদ্বেগজনক বলে মনে করেন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান ও সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মাসরুর আরেফিন। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘এ পরিসংখ্যান বাংলাদেশের বিনিয়োগের গুণগত কাঠামো নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করে। তবে নির্মাণ ও অবকাঠামো খাতে মোট স্থায়ী মূলধনের প্রায় ৮৪ শতাংশ থাকলেই যে ব্যাংক ঋণেরও ৮৪ শতাংশ ওই খাতে গেছে—বিষয়টি এভাবে দেখা ঠিক হবে না। বিষয়টি আরো গভীরভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। জিএফসিএফের মধ্যে সরকারি ও বেসরকারি—উভয় খাতের বিনিয়োগের পাশাপাশি দেশীয় ও বৈদেশিক উৎসের মূলধনও অন্তর্ভুক্ত। ফলে একজন ব্যাংকার হিসেবে ঋণ বিতরণের বাস্তব অভিজ্ঞতার সঙ্গে জিএফসিএফের বড় অংশ নির্মাণ ও অবকাঠামোতে কেন্দ্রীভূত হয়ে পড়ার বিষয়টি মেলানো কঠিন।’
মাসরুর আরেফিন আরো বলেন, ‘বেসরকারি মূলধনের বড় অংশ যদি জমি, ভবন ও নির্মাণে যায় এবং অপেক্ষাকৃত কম অংশ নতুন কারখানা, যন্ত্রপাতি, প্রযুক্তি ও উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে ব্যবহার হলে সেটি অর্থনীতির জন্য উদ্বেগের বিষয়। কারণ এতে উৎপাদনশীলতা, রফতানি সক্ষমতা এবং নতুন কর্মসংস্থান তৈরির ক্ষমতা দুর্বল হতে পারে। ব্যাংক খাতের দৃষ্টিকোণ থেকেও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘমেয়াদি অবকাঠামো বা শিল্প প্রকল্পে সাধারণত নগদ প্রবাহ তৈরি হতে সময় লাগে। এর মধ্যে প্রকল্পের ব্যয় বেড়ে গেলে, নির্মাণে বিলম্ব হলে কিংবা পণ্য বা সেবার চাহিদা প্রত্যাশা অনুযায়ী না এলে ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা দ্রুত কমে যেতে পারে। আমাদের প্রয়োজন এমন একটি বিনিয়োগ কাঠামো, যেখানে অবকাঠামোর প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ অব্যাহত থাকবে; একই সঙ্গে কারখানা, মেশিনারি, প্রযুক্তি, রফতানিমুখী শিল্প, এসএমই এবং উৎপাদনশীল সক্ষমতা বৃদ্ধিতে মূলধনের অংশ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।’
দীর্ঘদিনের চেষ্টার পরও বাংলাদেশে প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ বা এফডিআইয়ের নতুন ইকুইটি মূলধন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়েনি। এফডিআই কম থাকার অর্থ শুধু বিদেশী অর্থের ঘাটতি নয়; এর সঙ্গে প্রযুক্তি স্থানান্তর, ব্যবস্থাপনা দক্ষতা, আন্তর্জাতিক সরবরাহ শৃঙ্খলে সংযোগ এবং নতুন বাজারে প্রবেশের সুযোগও সীমিত হয়। বিশেষ করে উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে প্রযুক্তি ও ব্যবস্থাপনাগত দক্ষতার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
ইনস্টিটিউট অব কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশের (আইসিএমএবি) প্রেসিডেন্ট মো. কাউসার আলম বলেন, ‘বেসরকারি খাতে যে বিনিয়োগের পরিমাণ দেখা যায়, তার দক্ষতাও দুর্বল। দীর্ঘদিন ধরেই ব্যাংক ঋণ নিয়ে গাড়ি কেনা, জমি-ফ্ল্যাট ও শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ এবং বিদেশে অর্থ পাচারের মতো ঘটনা শোনা যায়। ফলে কাগজে-কলমে যে পরিমাণ বেসরকারি বিনিয়োগ দেখা যাচ্ছে, তার পুরোটা বাস্তবে উৎপাদনশীল বিনিয়োগ হিসেবে অর্থনীতিতে প্রতিফলিত হচ্ছে কিনা, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। ব্যাংক খাতের দুর্বলতা, ঋণ বিতরণ ও তদারকিতে ঘাটতি, সম্পর্কিত পক্ষকে ঋণ দেয়া, স্বজনপ্রীতি, ইচ্ছাকৃত খেলাপি হওয়ার প্রবণতা এবং বারবার পুনঃতফসিলের মাধ্যমে ঋণ টিকিয়ে রাখার সংস্কৃতির কারণে বিপুল পরিমাণ অর্থ আটকে আছে। এ কারণে শুধু বেসরকারি বিনিয়োগের পরিমাণ নয়, বিনিয়োগের দক্ষতা এবং উৎপাদনশীলতায় এর প্রকৃত অবদানও আলাদাভাবে মূল্যায়ন করাও জরুরি।’