টাঙ্গাইলে চাহিদার তুলনায় নদ-নদী ও বিভিন্ন জলাশয় থেকে আহরিত মাছের ঘাটতি রয়েছে। জেলা মৎস্য অফিসের হিসাব অনুযায়ী, গত তিন বছরে উৎপাদন বাড়লেও ঘাটতি রয়েছে ২৩ হাজার ৯২৮ দশমিক ৯৮ টন। ২০২২-২৩ অর্থবছরে মাছের উৎপাদন ছিল ৫৯ হাজার ৯১২ টন। এ বছর উৎপাদন হয়েছে ৬৩ হাজার ৭৮২ দশমিক শূন্য ২ টন। বার্ষিক চাহিদা রয়েছে ৮৭ হাজার ৭১১ টন। সে হিসাবে চাহিদার তুলনায় মাছ উৎপাদন হয়েছে ৭২ দশমিক ৭২ শতাংশ। ঘাটতি রয়েছে ২৭ শতাংশের বেশি।
বিশ্ব খাদ্য সংস্থার মতে, বাংলাদেশের প্রতি ছয়জনে একজন অপুষ্টিতে ভোগে। অপুষ্টিজনিত সমস্যারগুলোর মধ্যে প্রোটিনের ঘাটতির কারণে শরীরের বৃদ্ধি কম, আয়রন, ক্যালসিয়াম, জিংক, ভিটামিন-এ এবং ভিটামিন বি-১২-এর ঘাটতি দেখা দেয়। এসব পুষ্টির ঘাটতি পূরণে মাছ একটি আদর্শ খাদ্য।
জেলায় প্রায় ৪০ লাখ মানুষের বাস। শিশু ও প্রাপ্তবয়স্ক মিলে একজন মানুষের গড়ে প্রতিদিন মাছের চাহিদা ৬৩ গ্রাম। সে হিসাবে একজন মানুষের প্রতি বছর মাছের চাহিদা প্রায় ২২ কেজি।
ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির নিউট্রিশন ও ফুড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. হারুন-অর রশীদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘মাছ একটি প্রাকৃতিক খাদ্য। যার মধ্যে থাকে প্রোটিন, আয়রন, ক্যালসিয়াম, জিংক, ভিটামিন-এ এবং ভিটামিন বি-১২সহ আরো অনেক পুষ্টি উপাদান। বর্তমানে বাংলাদেশের মানুষ গড়ে দৈনিক ৬৩ গ্রামের মতো মাছ খায়। তার পরও পুষ্টির ঘাটতি পূরণে তেমন উন্নতি হয়নি।’
এদিকে জেলায় মাছের ঘাটতি মেটাতে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে মৎস্য অফিস। চাষীদের পুকুরে প্রদর্শনী স্থাপন, বিল নার্সারি কার্যক্রম, পোনা অবমুক্ত, প্রশিক্ষণ, মৎস্য আইন বাস্তবায়ন, অভয়াশ্রম স্থাপনসহ বিভিন্ন কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। এছাড়া পানি পরীক্ষার বিভিন্ন কীট অক্সিজেন মিটার, পিএইচ মিটার, থার্মোমিটার, অ্যামোনিয়া কীট ইত্যাদি ব্যবহার করে বৈজ্ঞানিক উপায়ে তেলাপিয়া, পাঙাশ, সিলভার, গুলসা পাবদা, টেংরা, চিংড়িসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ চাষ হচ্ছে টাঙ্গাইলে।
এ বিষয়ে জেলা মৎস্য কর্মকর্তা আবুল কালাম আজদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বদ্ধ জলাশয় বা পুকুরে মাছচাষীদের আমরা প্রশিক্ষণ ও পরামর্শ দিচ্ছি। দেখা যায় আধুনিক পদ্ধিতে মাছ চাষ করেন না অনেকেই। তাদের কীভাবে মাছ চাষ করে লাভবান করা যায়, সে বিষয়ে নিয়মিত পরামর্শ দেয়া হচ্ছে। মাছচাষীদের যদি প্রণোদনা দিতে পারি তাহলে আরো হয়তো ভালো হবে। গত বছর এনএটিপি প্রজেক্ট ছিল, সেখান থেকে প্রণোদনা দেয়ার সুযোগ ছিল, কিন্তু এই মুহূর্তে কোনো প্রকল্প চলমান নেই। শুধু রাজস্ব খাত থেকে আমরা প্রশিক্ষণ দিচ্ছি।’
জেলা মৎস্য অফিস সূত্রে জানা গেছে, জেলায় ৩৬ হাজার ৪২৮ মৎস্যচাষী রয়েছে। বাণিজ্যিক মৎস্য খামার রয়েছে ১৬৬টি। ৩ হাজার ৩৩২ মৎস্যজীবী ইলিশ মাছ ধরেন। বর্তমানে টাঙ্গাইলে পুকুর ও দীঘি রয়েছে ৪১ হাজার ৬৩৩টি, প্লাবনভূমি ২৯২, বিল ২৭৭, নদী ১১, খাল ১১২, বরোপিটের সংখ্যা ১২২টি। মৎসজীবী রয়েছে ১৮ হাজার ২৯০ জন। মৎস্যজীবী সমবায় সমিতি রয়েছে ৭৮টি। জেলায় মৎস্যচাষী সমিতির সংখ্যা ১৭৩টি। এছাড়া ৩২টি বরফকল, আটটি মৎস্য অভয়াশ্রম রয়েছে। সরকারিভাবে মৎস্য হ্যাচারি রয়েছে একটি।
সদর উপজেলার করটিয়া ইউনিয়নের ক্ষুদিরামপুর গ্রামের মাছচাষী আহমেদুর রহমান নিপুণ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘নতুন চাষী হিসেবে আমি মনে করি, কয়েকটি বিষয়ে মৎস্য বিভাগ পদক্ষেপ নিলে চাষীরা আরো উপকৃত হবেন। উৎপাদনও বাড়বে। ভালো মানের মাছের পোনা সরবরাহ করে সব চাষীর হাতে স্বল্পমূল্যে পৌঁছে দিতে হবে। প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। বিভিন্ন ধরনের রোগবালাই নিয়ন্ত্রণে পুকুর পরিদর্শনের ব্যবস্থা করলে মাছের উৎপাদন বাড়বে। এছাড়া সহজ শর্তে অর্থায়ন ও ঋণের সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে প্রকৃত চাষীকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।’
মাছের উৎপাদন বাড়ানোর বিভিন্ন পদক্ষেপের বিষয়ে মৎস্য কর্মকর্তা আবুল কালাম আজদ বলেন, ‘উন্মুক্ত জলাশয় যেমন নদী-নালা খালবিলে চায়না দোয়ারি ও কারেন্ট জাল জব্দ করা হচ্ছে। বিভিন্ন সময় জলাশয়ে পোনা অবমুক্ত করা হয়েছে। তবে শতভাগ সফলতায় বাধা আমাদের জনবল সংকট। প্রকল্প থাকলে উন্মুক্ত জলাশয়ে আরো অভয়াশ্রম স্থাপন করে মাছের উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব হতো।’