আমিষ ও প্রোটিনের ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে গাইবান্ধায় ব্যক্তি পর্যায়ে গড়ে উঠেছে হাঁস-মুরগি ও গরুর খামার। জেলায় বিভিন্ন শ্রেণীভিত্তিক খামার রয়েছে ১৮ হাজার ৯৪৪টি। তবে অর্থ সংকটে খামারগুলো টিকিয়ে রাখতে পারছেন না উদ্যোক্তারা। পাশাপাশি খাদ্যসহ সব ধরনের পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় একের পর এক বন্ধ হচ্ছে খামার। লোকসানের কারণে গত এক বছরে জেলায় প্রায় আড়াই হাজার খামারি ব্যবসা গুটিয়ে নিয়েছেন। এতে কর্মহীন হয়ে পড়েছেন খামারের কয়েক হাজার শ্রমিক।
খামারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, সংকটে পড়লেও বন্ধ রাখা হয়েছে ঋণ বিতরণ। ২০১০ সালের পর প্রাণিসম্পদ দপ্তরের ঋণ পাননি কোনো খামারি। ফলে যে খামারগুলো টিকে রয়েছে, তার মধ্যে অনেক বন্ধ হওয়ার পথে। পোলট্রি ও গোখাদ্যের দাম বৃদ্ধি পেলেও সে অনুপাতে বাজারে হাঁস-মুরগি, দুধ-ডিম ও গরু-ছাগলের দাম মিলছে না। এছাড়া অনুকূল পরিবেশ না থাকায় প্রতি মাসে লোকসান গুনতে হচ্ছে। এসব কারণে অনেক খামার বন্ধ হয়ে গেছে। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও সহযোগিতা পেলে বন্ধ হওয়া খামারগুলো পুনরায় চালু করা সম্ভব বলে মনে করেন খামারিরা। এতে উৎপাদনের পাশাপাশি কর্মসংস্থানও সৃষ্টি হবে।
সাঘাটা উপজেলার ভরতখালী ইউনিয়নের সাকোয়া গ্রামের মো. লিটন মণ্ডলের ছিল মুরগির খামার। এক সময় ভালো চলছিল খামারটি। কভিডের সময় আর্থিক সংকটের কারণে বন্ধ হয়ে যায় তার খামার। পরে বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানে ঋণের জন্য যোগাযোগ করে ব্যর্থ হন তিনি। এক পর্যায়ে যোগাযোগ করেন ইউসিবি ব্যাংকে। তবে অজানা কারণে ঋণ দেয়নি আর্থিক প্রতিষ্ঠানটি। শেষ পর্যন্ত চেষ্টা করেও রক্ষা করতে পারেননি খামারটি। ঋণ সহায়তা না পাওয়ায় এখন বন্ধ রয়েছে তার খামার।
লিটন মণ্ডল বলেন, ‘কভিডের সময় থেকেই আর্থিক সংকটে পড়েছি। বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানে ঋণের জন্য যোগাযোগ করেও ব্যর্থ হয়েছি। অর্থ সংকটে খামারটি বন্ধ রয়েছে। আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে সহায়তা পেলে পুনরায় খামারটি চালু করার ইচ্ছাও রয়েছে আমার।’
২০১৩ সাল থেকে ছোট পরিসরে হাঁস পালন শুরু করেন ফুলছড়ি উপজেলার গজারিয়া ইউনিয়নের নারী উদ্যোক্তা তহমিনা আকতার। পরে ৫০০টি হাঁস নিয়ে একটি বড় খামার তৈরি করেন। হঠাৎ আর্থিক সংকটে পড়ে যান। কয়েকটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে যোগাযোগও করেছিলেন। কিন্তু কোনো প্রতিষ্ঠানই চাহিদা অনুযায়ী ঋণ দেয়নি। গত বছর থেকে তার খামারটি বন্ধ রয়েছে।
গাইবান্ধা জেলা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, জেলায় গরু, ছাগল, হাঁস, মুরগি, কবুতরসহ বিভিন্ন শ্রেণীভিত্তিক মোট খামার রয়েছে ১৮ হাজার ৯৪৪টি। এর মধ্যে নিবন্ধিত খামার রয়েছে ৫০৫টি। আর অনিবন্ধিত খামার রয়েছে ১৬ হাজার ৩৩টি। বর্তমানে বন্ধ রয়েছে ২ হাজার ৪০৬টি। খামারগুলো বন্ধ হওয়ায় বেকার হয়ে পড়েছেন দুই হাজারের বেশি শ্রমিক।
এ ব্যাপারে জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. আব্দুর রাজ্জাক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আর্থিক সংকটসহ বিভিন্ন কারণে কিছু খামার বন্ধ হয়ে গেছে। যেগুলো বন্ধ হয়েছে সেসব খামারিদের আমরা বিভিন্নভাবে পরামর্শ দিয়েছি। যদি ঋণ প্রয়োজন হয়, তাহলে আমাদের সঙ্গে যোগাযোগের কথা বলা হচ্ছে। খামারিরা যোগাযোগ করলে ব্যাংকের মাধ্যমে ঋণের ব্যবস্থা করে দেব।’
পোলট্রি শিল্প কয়েক বছর আগেও বেশ লাভজনক ছিল। বেকার যুবকরা প্রশিক্ষণ আর স্বল্প পুঁজি নিয়ে খামার করতে উৎসাহীও ছিলেন। তবে বর্তমানে ব্যয়ের সঙ্গে আয়ের সংকুলান করতে না পারায় খামার বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। হাঁস-মুরগির বাচ্চা ও খাবারের দাম প্রতিনিয়ত বেড়েই চলেছে। কিন্তু সে অনুপাতে হাঁস-মুরগি ও ডিমের দাম বাড়ছে না বলে দাবি করেন খামারিরা।
সদর উপজেলার বাদিয়াখালী ইউনিয়নের গোয়াইলবাড়ী গ্রামের ময়নুল ইসলাম, রুবেল ও ফটু মিলে হাঁস পালন শুরু করছিলেন। তবে লভ্যাংশ কমবেশি হওয়ায় তারা আর হাঁস পালন করছেন না। পরবর্তী সময়ে ময়নুল ইসলাম একাই ১০০টি সোনালি মুরগি নিয়ে খামার শুরু করেন। ময়নুল ইসলাম বলেন, ‘কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠান আমাকে ঋণ দিলে খামারটি বড় পরিসরে করার ইচ্ছা রয়েছে।’
একই গ্রামের বিপুল মণ্ডল ২০০৪ সালে ৭০০টি হাঁস নিয়ে একটি খামার শুরু করেন। ২০২১ সালে হাঁসের খাদ্যের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় ক্ষতির মুখে পড়েন তিনি। সরকারি-বেসরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে সহায়তা না পেয়ে খামারটি বন্ধ করে দেন। পরে নিজের জমি বিক্রি করে বিদেশ চলে যান বিপুল মণ্ডল।
এ প্রসঙ্গে গাইবান্ধা উদ্যোক্তা ফোরামের প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান হাফিজুর রহমান বাবু বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ব্যবসা পরিচালনায় আর্থিক ব্যবস্থাপনার অস্বচ্ছতার কারণে অনেক উদ্যোক্তা খামার বন্ধ করে দিচ্ছেন। আর্থিক ব্যবস্থার বিষয়ে প্রশিক্ষণ ও সহজ শর্তে ঋণ পেলে উদ্যোক্তারা আবারো এগিয়ে আসবেন।’