নোয়াখালীতে খালপাড়ের মাটি কেটে বিক্রি, হুমকিতে বসতবাড়ি ও ফসলি জমি

নোয়াখালীর বিভিন্ন উপজেলায় পুনঃখনন করা খালপাড়ের মাটি কেটে বিক্রি করছে একাধিক প্রভাবশালী চক্র।

নোয়াখালীর বিভিন্ন উপজেলায় পুনঃখনন করা খালপাড়ের মাটি কেটে বিক্রি করছে একাধিক প্রভাবশালী চক্র। এতে চলাচলে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে পাড়ের বাসিন্দাদের। হুমকিতে পড়েছে ফসলি জমি। আবার মাটি কাটার সময় উপড়ে ফেলা হয়েছে গাছপালা। আর মাটি বহনকারী ট্রাক ও এক্সক্যাভেটর মেশিনে চলাচল অনুপযোগী হয়ে পড়েছে সড়ক। বর্ষায় হুমকিতে পাড়ের বাসিন্দারা।

স্থানীয়দের অভিযোগ, বাধা দেয়ায় তাদের বিরুদ্ধে উল্টো চাঁদাবাজির মামলা করেছে অভিযুক্ত মাটি কাটা চক্র। অবশ্য সরজমিন পরিদর্শন করে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেয়ার আশ্বাস দিয়েছে প্রশাসন।

সম্প্রতি সুবর্ণচর উপজেলার চরক্লার্ক ইউনিয়নে সরজমিনে গেলে দেখা যায়, চার বছর আগে পুনঃখনন করা জিলার খালের দুই পাড়ের বেশির ভাগ অংশই সমতলে পরিণত হয়েছে। খালের দুই পাশে শত শত একর ফসলি জমি, রয়েছে বসতবাড়িও। এ খালপাড়ই হচ্ছে মানুষের যাতায়াতের একমাত্র পথ। পাড়ে লাগানো হয়েছিল নানা জাতের গাছ-গাছালি, পানি নিষ্কাশনের জন্য কোথাও কোথাও নির্মাণ করা হয় কালভার্ট। অথচ বর্তমানে খালের দুই পাড়ের বেশির ভাগ অংশের মাটি বিক্রি করে সমতলে পরিণত করেছে একটি চক্র।

স্থানীয় বাসিন্দা নুরুল আমিন জানান, বিগত সরকারের সময়ে দলীয় প্রভাব খাটিয়ে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী পাড়ের মাটিগুলো কেটে নেন। তখন বাধা দেয়ায় স্থানীয়দের সঙ্গে অশোভন আচরণ করেন তারা। মাটিগুলো কেটে নেয়ার কারণে যাতায়াতে সমস্যা হচ্ছে পাড়ের বাসিন্দাদের। অথচ এ পাড়ের ওপর দিয়ে মানুষের যাতায়াতের পাশাপাশি কৃষকদের প্রয়োজনে বিভিন্ন পিকআপ ও ট্রাক্টর আসা-যাওয়া করত। বর্তমানে দেখা যায় জমির ধান বা অন্য ফসল আনা-নেয়াতে কয়েক কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হচ্ছে তাদের।

শুধু জিলার খাল নয়, পার্শ্ববর্তী জালছেঁড়া ও হাঁসের খালসহ ওই ইউনিয়নের কয়েকটি খালের একই অবস্থা। দুই পাড়ের মাটি কেটে বিক্রি করছে চক্রটি। এতে যাতায়াতে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে স্থানীয়দের। ধ্বংস হচ্ছে অসংখ্য গাছ-গাছালি। আর মাটি বহনকারী ট্রাক ও এক্সক্যাভেট মেশিন আসা-যাওয়ার কারণে চলাচলের অনপুযোগী হয়ে পড়েছে আশপাশের কাঁচা ও পাকা সড়কগুলো। বর্ষায় হুমকিতে রয়েছে খালপাড়ের বসতি। নোনা পানিতে ক্ষতি হওয়ার শঙ্কায় ফসলি জমি। দুই বছর ধরেই এমন অবস্থা চলে আসছে। এতে বাধা দিলে স্থানীয়দের বিরুদ্ধে দেয়া হয় চাঁদাবাজির মামলা।

সালাউদ্দিন নামে এক কৃষক বলেন, ‘খালগুলো পুনঃখনন করা হলেও নদীর মুখের সঙ্গে কোনো স্লুইস গেট দেয়া হয়নি। ফলে খালগুলোতে দিনে দুই বেলা জোয়ারের পানি ঢোকে। বর্ষায় জোয়ারের পানির পরিমাণ বাড়লে পাড় সমতল হওয়ার কারণে ফসলি জমিতে ঢুকে পড়বে জোয়ারের পানি। এতে ভবিষ্যতে চাষাবাদ করা মুশকিল হয়ে যাবে।’

তিনি জানান, পাড়গুলোয় নানা জাতের গাছ লাগানো হয়েছিল। কিন্তু দেখা যায় পাড়ের মাটি কেটে ফেলার সময় ওইসব গাছ উপড়ে ফেলা হয়। আর মাটি বহনকারী ট্রাক ও এক্সক্যাভেটর মেশিনের যাতায়াতের কারণে এলাকার প্রায় সব পাকা ও কাঁচা সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব নিয়ে কোনো কথা বললে চাঁদাবাজির মামলা দেয়া হচ্ছে তাদের বিরুদ্ধে। অবশ্য সম্প্রতি স্থানীয়দের প্রতিরোধের মুখে মাটি কাটা বন্ধ রাখে ওই চক্রটি। তবে বিভিন্ন স্থানে এক্সক্যাভেটর মেশিন পড়ে থাকতে দেখা যায়।

মাটি কাটার সঙ্গে কয়েকজন যুক্ত রয়েছেন। তাদের মধ্যে রাশেদ নামে একজন জানান, খালপাড়ের পাশের বিভিন্ন জমির মালিক থেকে তিনি মাটি কিনে নিচ্ছেন। কোনো প্রকার জোর খাটিয়ে বা প্রভাব দেখিয়ে মাটি কাটছেন না। তার দাবি, একটি পক্ষ মাটি নিজেরা বিক্রি করতে না পেরে তার নামে মিথ্যা অপবাদ দিচ্ছে। ওই পক্ষটি সম্প্রতি তার কাছে ৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেছে। না দেয়ায় তাকে মারধরও করা হয়।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সুবর্ণচর উপজেলা নির্বাহী অফিসার সুরাইয়া আক্তার লাকী বলেন, ‘খালপাড়ের মাটি কাটা সম্পূর্ণ অবৈধ। সরজমিন পরিদর্শন শেষে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। একই সঙ্গে যাতে ভবিষ্যতে এমন ঘটনা আর না ঘটে সেক্ষেত্রে স্থানীয়দের সঙ্গে নিয়ে স্ব-স্ব এলাকায় খালপাড় রক্ষায় কমিটি করে দেয়া হবে।’

সুবর্ণচরের পাশাপাশি জেলার কবিরহাট ও কোম্পানীগঞ্জ উপজেলায় বিভিন্ন খালপাড় কেটে মাটি বিক্রি করছে প্রভাবশালী চক্র।

আরও