তফসিলের পর ১৪৪ সহিংস ঘটনা, সংঘর্ষ বেশি কুমিল্লা ও লক্ষ্মীপুরে চার রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড

সর্বশেষ শেরপুরে সংঘর্ষে জামায়াত নেতা নিহত

শেরপুরে প্রার্থীদের নির্বাচনী ইশতাহার পাঠ অনুষ্ঠানে চেয়ারে বসাকে কেন্দ্র করে বিএনপির নেতাকর্মীদের সঙ্গে সংঘর্ষে জামায়াতে ইসলামীর শ্রীবর্দী উপজেলা সেক্রেটারি রেজাউল করিম নিহত হয়েছেন।

শেরপুরে প্রার্থীদের নির্বাচনী ইশতাহার পাঠ অনুষ্ঠানে চেয়ারে বসাকে কেন্দ্র করে বিএনপির নেতাকর্মীদের সঙ্গে সংঘর্ষে জামায়াতে ইসলামীর শ্রীবর্দী উপজেলা সেক্রেটারি রেজাউল করিম নিহত হয়েছেন। গতকাল বিকালে ঝিনাইগাতী উপজেলা মিনি স্টেডিয়ামে প্রশাসন আয়োজিত ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে শেরপুর-৩ আসনে অংশগ্রহণকারী প্রার্থীদের নিয়ে আয়োজিত ওই অনুষ্ঠানে বিএনপি ও জামায়াতের নেতাকর্মীরা সংঘাতে জড়ান। এতে মাথায় আঘাতপ্রাপ্ত রেজাউলকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হলে রাত ১০টার দিকে তিনি মারা যান।

কেবল শেরপুরের এ ঘটনাই নয়, প্রধান নির্বাচন কমিশনার এএমএম নাসির উদ্দিন গত ১১ ডিসেম্বর জাতির উদ্দেশে ভাষণে তফসিল ঘোষণার পর থেকে আরো তিনটি রাজনৈতিক হত্যার ঘটনা ঘটেছে। এগুলোসহ ২৫টি জেলা এবং তিনটি মহানগরের বিভিন্ন থানা এলাকায় ঘটেছে ১৪৪টি সহিংস ঘটনা। এর মধ্যে কুমিল্লা ও লক্ষ্মীপুর জেলায় প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের সমর্থকদের মধ্যে চার দফা করে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে, যা অন্য জেলাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি। সংঘাতপ্রবণ জেলাগুলো চিহ্নিত করে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে না পারলে নির্বাচনে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বাইরে চলে যেতে পারে বলে মনে করেন অপরাধ বিশ্লেষকরা।

পুলিশ সদর দপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, গত ১২ ডিসেম্বর থেকে ২৬ জানুয়ারি পর্যন্ত ৪৫ দিনে সারা দেশে ১৪৪টি নির্বাচনী সহিংসতার মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বী সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে ৫৫টি। এছাড়া ভীতি দেখানো এবং আক্রমণাত্মক আচরণের ঘটনা ঘটেছে ১১টি, প্রার্থীর ওপর আক্রমণের ঘটনা ছয়টি, অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার দুটি। এর বাইরে হুমকি ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের ঘটনা ছয়টি, প্রচারকাজে বাধা প্রদানের ঘটনা ১৭টি, নির্বাচনসংশ্লিষ্ট অফিস ও প্রতিষ্ঠানে হামলা, ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা আটটি, অবরোধ-বিক্ষোভের মতো ঘটনা ১০টি, সংখ্যালঘুদের ওপর আক্রমণের ঘটনা একটি এবং অন্যান্য ঘটনা ঘটেছে ২৪টি।

গতকাল শেরপুরের ঘটনা ছাড়াও অন্য তিনটি রাজনৈতিক হত্যার হিসাব দিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর। এর মধ্যে রয়েছে ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান হাদী হত্যার ঘটনা। গত ১২ ডিসেম্বর তাকে রাজধানীর পল্টন থানাধীন বক্সকালভার্ট রোডে গুলি করে দুর্বৃত্তরা। পরে ১৮ ডিসেম্বর সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান।

এছাড়া গত ২৪ ডিসেম্বর গাজীপুরের শ্রীপুরে জাসাস নেতা ফরিদ সরকার হত্যা ও ১৬ জানুয়ারি ময়মনসিংহের ধোবাউড়া উপজেলায় স্বতন্ত্র প্রার্থী সালমান ওমর রুবেলের সমর্থক মো. নজরুল ইসলাম হত্যার তথ্যও দিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর।

সংঘাতপূর্ণ জেলাগুলো চিহ্নিত করে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে দ্রুত পদক্ষেপ নেয়ার মধ্য দিয়ে সুষ্ঠু নির্বাচনী পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমাদের দেশে নির্বাচনী সংঘাত-সহিংসতা যেসব কারণে হয় তার মধ্যে অন্যতম এক প্রার্থীর সঙ্গে আরেক প্রার্থীর গণতান্ত্রিক দূরত্ব। একজন প্রার্থী তার প্রতিদ্বন্দ্বীকে গণতান্ত্রিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখেন না, বরং মনে করেন প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীকে নাজেহাল করতে না পারলে তার বিজয় নিশ্চিত হবে না। এখান থেকেই এ ধরনের সংঘাতের সূত্রপাত হয়।’

পুলিশের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, প্রতিদ্বন্দ্বী সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা সবচেয়ে বেশি ঘটেছে কুমিল্লা জেলায়। গত ১৯ জানুয়ারি এ জেলার চৌদ্দগ্রাম থানা এলাকার সমেশপুর এবং তেলিপুকুর এলাকায় স্থানীয় জামায়াতে ইসলামীর অফিস ও সমর্থকদের বাড়িতে ভাংচুর এবং অগ্নিসংযোগ করা হয়। পরে এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে শুভপুর ও মুন্সীরহাট বাজারে বিএনপি এবং জামায়াতে ইসলামী সমর্থকদের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এরপর ২০ জানুয়ারি কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম থানার উজিরপুরে ইউনিয়ন জামায়াতে ইসলামীর উঠান বৈঠকে নেতাকর্মীরা বিএনপিকে উদ্দেশ করে উসকানিমূলক বক্তব্য দেয়। এরই জের ধরে বিএনপি নেতাকর্মীরা জামায়াত নেতাকর্মীদের সঙ্গে সংঘাতে লিপ্ত হয়। এ ঘটনায় কিছু চেয়ার এবং একটি গাড়ির সামনের গ্লাস ভাংচুর করা হয়। পাশাপাশি একটি মোটরসাইকেলে আগুন দেয়া হয়। এ সময় তিন-চারজন আহত হন। এ ঘটনার ঠিক দুদিন পর ২২ জানুয়ারি কুমিল্লার হোমনা থানা এলাকার পুরনো বাসস্ট্যান্ড ওভারব্রিজের নিচে বিএনপির দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। স্বতন্ত্র প্রার্থী ইঞ্জিনিয়ার এমএ মতিনের বহরে হামলা ও পাল্টাপাল্টি ধাওয়ায় উভয় পক্ষের অন্তত ১০ জন আহত হন। পরে সেনাবাহিনী এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করে। সেখান থেকে তিনজনকে গ্রেফতার করা হয়। সবশেষ ২৫ জানুয়ারি কুমিল্লা সদরে নির্বাচনী প্রচারণাকে কেন্দ্র করে সংঘাতের ঘটনা ঘটে।

কুমিল্লার পর সবচেয়ে বেশি প্রতিদ্বন্দ্বী সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে লক্ষ্মীপুরে। ১৫ জানুয়ারি এ জেলার চন্দ্রগঞ্জ থানার চরশাহী ইউনিয়নের সৈয়দপুর বটতলা এলাকায় জামায়াতে ইসলামীর কয়েকজন নারী কর্মী বাড়ি বাড়ি গিয়ে চকোলেট বিতরণ এবং নারীদের এনআইডি কার্ডের ছবি ও বিকাশ বা নগদ নম্বর সংগ্রহ করছেন—এমন সংবাদ পেয়ে বিএনপি নেতাকর্মীরা গিয়ে তাদের বাধা দেয়। পরে স্থানীয় জামায়াতপন্থী নেতাকর্মীরা ঘটনাস্থলে এলে দুই পক্ষের মধ্যে বাগবিতণ্ডা ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে বিএনপির চার-পাঁচজন এবং জামায়াতের একজন সমর্থক আহত হন। পরদিন লক্ষ্মীপুরের ওই ইউনিয়নেই জামায়াত-বিএনপি নেতাকর্মীদের মধ্যে আবার সংঘর্ষ হয়। এরপর গত ২২ জানুয়ারি লক্ষ্মীপুরের সদর থানার রিফিউজি মার্কেট এলাকায় জামায়াতে ইসলামী এবং ছাত্রশিবির কর্মীদের লিফলেট দেয়াকে কেন্দ্র করে বিএনপি কর্মীদের সঙ্গে তাদের সংঘর্ষ হয়। এতে উভয় দলের একজন করে আহত হন। পরে ২৫ জানুয়ারি লক্ষ্মীপুরের চন্দ্রগঞ্জে জামায়াতে ইসলামীর সমর্থকরা নির্বাচনী প্রচারের সময় বিএনপি সমর্থক বাধা দিলে উভয় পক্ষের মধ্যে মারামারি হয়। এতে জামায়াত সমর্থক তারেক ইসলাম আহত হয়ে লক্ষ্মীপুর সদর হাসপাতালে চিকিৎসা নেন।

প্রতিদ্বন্দ্বী সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা কুমিল্লা, লক্ষ্মীপুর ও শেরপুরসহ ঘটেছে ২৫টি জেলা ও তিনটি মহানগরে। এর মধ্যে পাবনা জেলার সাঁথিয়া ও চাটমোহর, বগুড়ার নন্দীগ্রাম, ধুনট ও শিবগঞ্জ থানা; টাঙ্গাইলের সদর, বাসাইল ও গোপালপুর; কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া, অষ্টগ্রাম ও সদর; ফরিদপুরের কোতোয়ালি ও ভাঙ্গা; লালমনিরহাটের পাটগ্রাম ও হাতীবান্ধা এবং ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকার মিরপুর মডেল ও খিলক্ষেত থানা এলাকায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। পাশাপাশি মুন্সিগঞ্জের টঙ্গিবাড়ী, পদ্মা সেতু (উত্তর) থানা; সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া; পটুয়াখালীর বাউফল ও গলাচিপা; ময়মনসিংহের গফরগাঁও ও ভালুকা থানা, চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটনের পতেঙ্গা ও বন্দর থানা এলাকায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এর বাইরে নওগাঁর নিয়ামতপুর ও রানীনগর, চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা ও সদর, চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ ও সদর, নেত্রকোনার কেন্দুয়া, নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ; রাজশাহী মেট্রোপলিটনের শাহমখদুম, চাঁদপুরের হাজীগঞ্জ, সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ, বরিশালের মুলাদী, গাইবান্ধার সাঘাটা, মেহেরপুরের সদর, বরিশালের মুলাদী, ফেনীর ছাগলনাইয়া, শরীয়তপুরের পালং এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল থানা এলাকায় প্রতিদ্বন্দ্বী সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।

নির্বাচনের আগে সময় একদমই কম উল্লেখ করে অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক আরো বলেন, ‘যেসব জেলায় বেশি সংঘর্ষ হচ্ছে, সেগুলোকে চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নিতে হবে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে। কর্মীদের সংযত করতে দলের পক্ষ থেকে ব্যবস্থা বলতে যা করা হয়, সেটা হচ্ছে কারণ দর্শানোর নোটিস। এটা তো দুর্বল একটি ব্যবস্থা। এখানে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকেই শক্ত ভূমিকা নিতে হবে। বিবৃতি দিয়ে বা শোকজ করে এসব সহিংসতা নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। এখানে একটাই উপায় সেটা হচ্ছে আইনের কঠোর প্রয়োগ। আইন সবার জন্য সমানভাবে প্রয়োগ করতে হবে। যেসব এলাকায় এ ধরনের সংঘাত বেশি হচ্ছে, সেখানে নির্বাচন কমিশন যদি দুই-একটি আসনে শক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করে, তাহলে দেখা যাবে অনেকেই এ ধরনের কার্যক্রম থেকে বিরত থাকবে।’

নির্বাচনী প্রচারে সব প্রার্থীর সমান অধিকার নিশ্চিত করতে মাঠ পর্যায়ে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কাজ করে যাচ্ছে বলে জানান পুলিশ সদর দপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (গণমাধ্যম ও জনসংযোগ) এএইচএম শাহাদাত হোসাইন। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে সংঘাত-সংঘর্ষের বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা ঘটছে। এসব ঘটনায় জড়িতদের চিহ্নিত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। পাশাপাশি নির্বাচনী প্রচারণায় সব প্রার্থীর সমান অধিকার নিশ্চিত করতে মাঠ পর্যায়ে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কাজ করছে। কেউ প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করলে তাকে চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। সব মিলিয়ে সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য পুলিশ সর্বাত্মক পেশাদারত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে।’

আরও