বাংলাদেশে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার কার্যকারিতা যাচাইয়ে প্রশিক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণবিধি প্রয়োজন

প্রতিনিধি দলের আটটি কোম্পানিরই নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে সক্ষমতা রয়েছে। বিশেষত সৌরবিদ্যুৎ ও ব্যাটারিতে জ্বালানি সংরক্ষণ প্রযুক্তি নিয়ে তারা কাজ করে। এদের মধ্যে সৌর প্যানেল প্রস্তুতকারক, আবাসিক ও শিল্প খাতে জ্বালানি সরঞ্জাম স্থাপনকারী ও সমাধান প্রদানকারী এবং প্রশিক্ষণ, গবেষণা ও উন্নয়ন-সংক্রান্ত প্রতিষ্ঠান রয়েছে।

বাংলাদেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগের সম্ভাবনা যাচাইয়ে আটটি অস্ট্রেলীয় কোম্পানির প্রতিনিধি দল নিয়ে ঢাকায় এসেছেন অস্ট্রেলিয়ান ট্রেড অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট কমিশনের (অস্ট্রেড) দক্ষিণ এশিয়ার ট্রেড অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট কমিশনার মারে স্পেন্স। সৌরবিদ্যুৎ ও ব্যাটারিতে জ্বালানি সংরক্ষণ প্রযুক্তিতে সক্ষম এসব কোম্পানি স্থানীয় অংশীদার খুঁজছে। বাংলাদেশের শিল্প খাতের বিদ্যুৎ সংকট মোকাবেলায় সৌরবিদ্যুতের সম্ভাবনা, বিনিয়োগের সুযোগ, ব্যাটারি সংরক্ষণ প্রযুক্তি ও গুরুত্বপূর্ণ খনিজের সরবরাহ ব্যবস্থা বহুমুখীকরণ নিয়ে বণিক বার্তার সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি।

আপনার কাজ ও বাংলাদেশের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা সম্পর্কে জানতে চাই।

আমি অস্ট্রেডে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ কমিশনার হিসেবে কাজ করছি। আমরা মূলত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ব্যবসায়িক যোগাযোগ স্থাপনে সহায়তা করি। পাশাপাশি অস্ট্রেলিয়ায় বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং অস্ট্রেলিয়া থেকে পণ্য ও সেবার সরবরাহ বাড়াতেও কাজ করে থাকি। আমি ভারতের বেঙ্গালুরুতে অবস্থান করলেও দক্ষিণ এশিয়ার দায়িত্ব আমার ওপর। এ অঞ্চলের মধ্যে ভারত, বাংলাদেশ, শ্রীলংকা এবং আরো তিনটি ছোট বাজার রয়েছে। আমার কাজের মূল ক্ষেত্র জ্বালানি। এর মধ্যে খনিজ সম্পদ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং নির্মাণ খাতের সবুজ প্রযুক্তি অন্তর্ভুক্ত।

বাংলাদেশে আটটি অস্ট্রেলীয় কোম্পানির প্রতিনিধি দল নিয়ে এসেছেন। কোম্পানিগুলো কী ধরনের বিনিয়োগের সুযোগ খুঁজছে?

প্রতিনিধি দলের আটটি কোম্পানিরই নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে সক্ষমতা রয়েছে। বিশেষত সৌরবিদ্যুৎ ও ব্যাটারিতে জ্বালানি সংরক্ষণ প্রযুক্তি নিয়ে তারা কাজ করে। এদের মধ্যে সৌর প্যানেল প্রস্তুতকারক, আবাসিক ও শিল্প খাতে জ্বালানি সরঞ্জাম স্থাপনকারী ও সমাধান প্রদানকারী এবং প্রশিক্ষণ, গবেষণা ও উন্নয়ন-সংক্রান্ত প্রতিষ্ঠান রয়েছে। বিশ্বের বৃহত্তম শিল্প পর্যায়ের ব্যাটারি সংরক্ষণ ব্যবস্থার মালিক ও পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিও এসেছেন। তারা বাংলাদেশের পরিচ্ছন্ন জ্বালানি খাতের সুযোগ যাচাই ও স্থানীয় অংশীদার খুঁজছে। একই সঙ্গে অস্ট্রেলিয়ার প্রযুক্তি, উদ্ভাবন ও কারিগরি জ্ঞান কাজে লাগিয়ে এ খাতে অবদান রাখার সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখছে।

কোম্পানিগুলো কী পরিমাণ বিনিয়োগ করতে পারে?

এখনই নির্দিষ্ট বিনিয়োগের পরিমাণ বলা সম্ভব নয়। প্রতিটি কোম্পানির পরিকল্পনা আলাদা। প্রথমে বাজারের আকার, পণ্যের দাম, সেবা, অবকাঠামো ও গুণগত মান সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা প্রয়োজন। স্থানীয় অংশীদারত্বের পাশাপাশি প্রযুক্তির লাইসেন্স প্রদান, যৌথ উদ্যোগ কিংবা শতভাগ মালিকানায় ব্যবসা পরিচালনার মতো মডেলও বিবেচনায় রয়েছে। এসব উদ্যোগে স্থানীয় উৎপাদনের সুযোগও থাকতে পারে। প্রকল্পের ধরন ও সম্ভাবনা যাচাইয়ের পর কোম্পানিগুলো বিনিয়োগের পরিমাণ নির্ধারণ করতে পারবে। আপাতত তারা বাংলাদেশের বাজারে সময়, শ্রম ও জ্ঞান বিনিয়োগে আগ্রহী।

শিল্প খাতের বিদ্যুৎ সংকট দ্রুত ও কম খরচে মোকাবেলায় কোন প্রযুক্তি কার্যকর হতে পারে?

ছাদে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন একটি সহজ সমাধান হতে পারে। বাংলাদেশে জমির প্রাপ্যতা বড় চ্যালেঞ্জ হওয়ায় ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের সম্ভাবনা বেশি। এরই মধ্যে স্থাপিত সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থাগুলোর কার্যকারিতা যাচাইয়ে প্রশিক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণবিধি চালুর বিষয়টি বিবেচনা করা প্রয়োজন। কোথায় সমস্যা রয়েছে, তা চিহ্নিত করে বিদ্যমান ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং নতুন সমাধান চালু করা সম্ভব। এতে দ্রুত সুফল পাওয়া যেতে পারে।

অস্ট্রেলীয় কোম্পানিগুলো বাংলাদেশে বিনিয়োগ নাকি সরঞ্জাম রফতানিতে আগ্রহী?

অস্ট্রেলিয়ায় উৎপাদন ব্যয় বাংলাদেশের তুলনায় বেশি। ফলে সেখানে পণ্য তৈরি করে বাংলাদেশে রফতানির মডেল অর্থনৈতিকভাবে কার্যকর হবে বলে মনে করি না। বরং প্রযুক্তি বাংলাদেশে স্থানান্তর করে কম খরচে উৎপাদনের সুযোগ রয়েছে। তবে কোন ব্যবসায়িক মডেল কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট প্রকল্প ও বাজার পরিস্থিতির ওপর।

বৃহৎ পরিসরের ব্যাটারি সংরক্ষণ প্রযুক্তি কীভাবে গ্রিডের ওপর চাপ কমাতে পারে?

নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে বিদ্যুৎ গ্রিডের সক্ষমতা নিশ্চিত করা অপরিহার্য। সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন গ্রিডের ধারণক্ষমতা ছাড়িয়ে গেলে সমস্যা তৈরি হতে পারে। অস্ট্রেলিয়ায় প্রতি তিনটি বাড়ির একটিতে সৌরবিদ্যুতের পাশাপাশি ব্যাটারি রয়েছে। ব্যাটারি কেনা ও স্থাপনে সরকার ৩০ শতাংশ ভর্তুকি দেয়ায় দেশটিতে পাঁচ লাখের বেশি গৃহস্থালি ব্যাটারি স্থাপন করা হয়েছে। বাংলাদেশেও ভর্তুকি ও প্রণোদনার মাধ্যমে এ ধরনের উদ্যোগ নেয়া সম্ভব। দিনের বেলায় উৎপাদিত বিদ্যুৎ ব্যাটারিতে সংরক্ষণ করে রাতে ব্যবহার করা গেলে গ্রিডের ওপর চাপ কমবে এবং বিদ্যুতের ব্যয় সাশ্রয় হবে। তবে শিল্প খাতের বড় প্রকল্প বাস্তবায়নে বিদ্যুৎ সরবরাহ ও সংরক্ষিত বিদ্যুৎ গ্রহণের উপযোগী গ্রিড অবকাঠামো থাকতে হবে।

বাংলাদেশে বিনিয়োগযোগ্য পরিচ্ছন্ন জ্বালানি প্রকল্প চিহ্নিত করতে কী উদ্যোগ নেয়া হয়েছে?

এপ্রিলে অস্ট্রেলিয়ার ডিকিন ইউনিভার্সিটি, নবায়নযোগ্য জ্বালানিবিষয়ক বিশেষজ্ঞ এবং স্মার্ট এনার্জি কাউন্সিলের প্রতিনিধিদের নিয়ে বাংলাদেশ সফর করেছিলাম। তখন সরকারের কর্মকর্তা, বিদ্যুৎ খাতের প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোর সঙ্গে বৈঠক হয়। উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার ও সম্প্রসারণ কীভাবে ত্বরান্বিত করা যায়, তা যাচাই করা। এরই ধারাবাহিকতায় প্রকাশিতব্য প্রতিবেদনে এ খাতের ১০টি সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র চিহ্নিত করা হয়েছে। কোন কোন ক্ষেত্রে প্রকল্প নেয়া যেতে পারে ও অস্ট্রেলীয় কোম্পানিগুলো কীভাবে অবদান রাখতে পারে, তার একটি রোডম্যাপ এতে তুলে ধরা হয়েছে।

গুরুত্বপূর্ণ খনিজের সরবরাহ ব্যবস্থা বহুমুখীকরণে বাংলাদেশ কীভাবে বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে পারে? এক্ষেত্রে অস্ট্রেলিয়ার ভূমিকা কী?

বিগত পাঁচ বছরে ভূরাজনৈতিক পরিবর্তন, যুদ্ধ ও সংঘাতের কারণে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটেছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যাটারি ও সংরক্ষণ প্রযুক্তিতে লিথিয়াম, গ্রাফাইট, সিলিকা ও ভ্যানাডিয়ামের মতো খনিজ গুরুত্বপূর্ণ। অস্ট্রেলিয়ায় এসব খনিজের বড় মজুদ ও সরবরাহ রয়েছে। বাংলাদেশে এসে আমি স্পষ্টভাবে যে বার্তাটি পাচ্ছি, তা হলো এখানে বিনিয়োগ প্রয়োজন। অন্যদিকে অস্ট্রেলিয়াও তার খনিজ সম্পদের উন্নয়নে বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে চায়। আমাদের এমন অনেক প্রকল্প রয়েছে, যেখানে বিভিন্ন কোম্পানি বা দেশ বিনিয়োগ করতে পারে। এর মাধ্যমে এসব গুরুত্বপূর্ণ খনিজ উত্তোলন করে বিশ্বের অন্যান্য দেশের জন্য নির্ভরযোগ্য সরবরাহকারী হয়ে উঠতে চাই আমরা। এসব প্রকল্পে বিনিয়োগ আকর্ষণে আমরা আগ্রহী। এর মাধ্যমে খনিজ সরবরাহের সক্ষমতা বাড়ানো সম্ভব হবে। তবে পুরো বিষয়টির কেন্দ্রে রয়েছে বহুমুখীকরণ। অর্থাৎ কোন উৎস থেকে খনিজ সংগ্রহ করা হচ্ছে এবং কোথা থেকে প্রযুক্তি নেয়া হচ্ছে, সেক্ষেত্রে বিকল্প রাখা জরুরি। এতে কোনো একটি দেশ বা সরবরাহকারীর ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা তৈরি হবে না। তাই এ খাতে আমরা নির্ভরযোগ্য অংশীদার খুঁজছি।

অস্ট্রেলীয় কোম্পানিগুলোর সঙ্গে কাজ করতে বাংলাদেশের বিনিয়োগকারী ও শিল্পোদ্যোক্তাদের প্রতি আপনার বার্তা কী?

বাংলাদেশে অনেক সম্ভাবনাময় প্রকল্প রয়েছে, যেগুলো বাস্তবায়নে স্থানীয় বিনিয়োগকারীদের সহযোগিতা প্রয়োজন। আমরা পণ্য, কারিগরি জ্ঞান, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবন নিয়ে আসতে পারি। তবে প্রকল্প বাস্তবায়ন ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে বাংলাদেশে বিনিয়োগ প্রয়োজন।

আরও