বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদন

টিকাদানের অভাবে হামের ‘উচ্চ ঝুঁকি’তে বাংলাদেশ, নতুন করে আরো সাত শিশুর মৃত্যু

বাংলাদেশে চলমান হাম পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)। পরিস্থিতি জাতীয়ভাবে ‘উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ’ বলে মূল্যায়ন করেছে সংস্থাটি।

দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ৫৮টিতে সংক্রমণ ছড়ানো, বিপুল শিশুর আক্রান্ত হওয়া, টিকাদানের অভাবে এ রোগ প্রতিরোধ সক্ষমতায় ঘাটতি এবং হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর আলোকে গত বৃহস্পতিবার প্রকাশিত সংস্থাটির প্রতিবেদনে এ মূল্যায়ন করা হয়।

এদিকে দেশে হামে আক্রান্ত হয়ে কিংবা এ রোগের উপসর্গ নিয়ে নতুন করে আরো সাত শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে গত ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত হামে মোট ৪২ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। আর হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হয়েছে ১৯৮ শিশুর। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হামবিষয়ক গতকালের হালনাগাদ প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে। গতকাল সকাল ৮টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় হামে আক্রান্ত হয়েছে ১৭২ শিশু। আর উপসর্গ নিয়ে ৮৬০ শিশু হাসপাতালে ভর্তি হয়।

ডব্লিউএইচও অবশ্য যে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, তাতে ১৫ মার্চ থেকে ১৪ এপ্রিলের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশে ওই সময়ে মোট ১৯ হাজার ১৬১ সন্দেহভাজন হাম রোগীর তথ্য পাওয়া গেছে। একই সময়ে পরীক্ষা করে নিশ্চিত রোগী পাওয়া গেছে ২ হাজার ৮৯৭। হাম পরিস্থিতির বিস্তারিত বিবরণে পরীক্ষাগারে নিশ্চিত রোগীর সংখ্যা ২ হাজার ৯৭৩ উল্লেখ করা হয়। এ সময় হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হয়েছে ১৬৬ শিশুর। মৃত্যুহার দশমিক ৯ শতাংশ। পরীক্ষাগারে নিশ্চিত হাম-সম্পর্কিত মৃত্যু হয়েছে ৩০ শিশুর। এক্ষেত্রে মৃত্যুহার ১ দশমিক ১ শতাংশ।

দেশের আট বিভাগেই রোগী শনাক্ত হয়েছে উল্লেখ করে ডব্লিউএইচও বলছে, ৬৪ জেলার মধ্যে ৫৮ জেলায়, অর্থাৎ ৯১ শতাংশ জেলায় হামে আক্রান্ত রোগী পাওয়া গেছে। আর তাতে দেখাচ্ছে, সংক্রমণ এখন জাতীয়ভাবে ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে পড়েছে। হাসপাতালে যাওয়া রোগীদের বেশির ভাগই পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু। এ হার ৭৯ শতাংশ। এর মধ্যে দুই বছরের কম বয়সী শিশু ৬৬ শতাংশ এবং নয় মাসের কম বয়সী শিশু ৩৩ শতাংশ।

মোট ১৬৬ শিশুর সন্দেহভাজন মৃত্যুর তথ্য পাওয়ার কথা বলা হয় ডব্লিউএইচওর প্রতিবেদনে। এসব শিশু মূলত টিকা না পাওয়া দুই বছরের কম বয়সী। তাই বর্তমান প্রাদুর্ভাবের একটি বড় উদ্বেগ হলো অনেক শিশু হয় টিকা পায়নি, নয়তো টিকার মাত্র একটি ডোজ পেয়েছে। আবার কিছু শিশু নয় মাস বয়সে টিকার উপযুক্ত বয়সে পৌঁছানোর আগেই আক্রান্ত হয়েছে। অধিকাংশ রোগী, অর্থাৎ ৯১ শতাংশ ১ থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশু; যা কিনা এ বয়সী শিশুদের মধ্যে বড় ধরনের রোগ প্রতিরোধ ঘাটতির ইঙ্গিত দেয়।

ডব্লিউএইচওর প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, এ প্রাদুর্ভাবের আগে বাংলাদেশ হাম নির্মূলের পথে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছিল। হাম প্রতিরোধী টিকার প্রথম ডোজের কাভারেজ ২০০০ সালে ছিল ৮৯ শতাংশ। ২০১৬ সালে তা বেড়ে হয় ১১৮ শতাংশ। দ্বিতীয় ডোজ দেশব্যাপী চালুর পর ২০১২ সালে কাভারেজ ছিল ২২ শতাংশ। ২০২৪ সালে তা বেড়ে হয় ১২১ শতাংশ। একই সময়ে পরীক্ষাগারে নিশ্চিত হাম রোগীর হার দ্রুত কমে এসেছিল। তবে ২০২৪-২৫ সালে দেশে এমআর টিকার জাতীয় পর্যায়ের ঘাটতির কারণে টিকার প্রথম ও দ্বিতীয় ডোজ বা এমআর১ ও এমআর২ কাভারেজ কমে যায়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নিয়মিত টিকাদানের ফাঁক এবং ২০২০ সালের পর নিয়মিত দেশব্যাপী সম্পূরক হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি না থাকা। এসব কারণে সংক্রমণের ঝুঁকিতে থাকা শিশুর সংখ্যা বেড়েছে এবং বর্তমান প্রাদুর্ভাব তৈরি হয়েছে।

সংস্থাটি হামকে জাতীয় পর্যায়ে ঝুঁকি ‘উচ্চ’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। কারণ হিসেবে বলছে, একাধিক বিভাগে সংক্রমণ চলমান, বিপুলসংখ্যক শিশু সংক্রমণের ঝুঁকিতে, রোগ প্রতিরোধের ঘাটতি নথিভুক্ত এবং হাম-সম্পর্কিত সন্দেহভাজন মৃত্যু ঘটেছে।

টিকা না পাওয়া ও আংশিক টিকা পাওয়া শিশুদের মধ্যে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বেশি। এর মধ্যে এমন শিশুরাও আছে, যাদের বয়স টিকা পাওয়ার জন্য এখনো যথেষ্ট হয়নি। এটি অব্যাহত সংক্রমণ এবং গুরুতর অসুস্থতার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।

সামগ্রিকভাবে এ প্রাদুর্ভাব দেখাচ্ছে যে হাম নির্মূলে বাংলাদেশের আগের অগ্রগতিতে ধাক্কা লেগেছে। একই সঙ্গে এটি প্রমাণ করছে, দীর্ঘস্থায়ী সংক্রমণের ঝুঁকিতে বাংলাদেশ এখন আরো বেশি দুর্বল হয়ে পড়েছে। জরুরি ব্যবস্থা না নিলে সংক্রমণ আরো ছড়াতে পারে। তাই নজরদারি শক্তিশালী করা, দ্রুত রোগ শনাক্ত ও মোকাবেলা করা এবং ভালো মানের টিকাদান কার্যক্রমের মাধ্যমে রোগ প্রতিরোধের ঘাটতি পূরণ করা জরুরি।

ডব্লিউএইচওর মতে, সীমান্তবর্তী এলাকায় মানুষের চলাচলের কারণে সীমান্ত পেরিয়ে সংক্রমণ ছড়ানোর উল্লেখযোগ্য ঝুঁকি আছে। ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট ও কক্সবাজারের মতো বড় নগর কেন্দ্র আন্তর্জাতিক যাতায়াত ও ট্রানজিটের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। ফলে দেশের ভেতরে ও বাইরে সংক্রমণ ছড়ানোর আশঙ্কা বাড়ছে, বিশেষ করে যারা টিকা নেয়নি বা পুরোপুরি টিকা পায়নি, এমন ভ্রমণকারীদের মাধ্যমে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলে হাম স্থানীয়ভাবে বিদ্যমান। আঞ্চলিক পর্যায়ে ঝুঁকিকে ‘উচ্চ’ হিসেবে মূল্যায়ন করা হয়েছে।

ডব্লিউএইচও সব পৌর এলাকায় হাম প্রতিরোধী টিকার প্রথম ও দ্বিতীয় ডোজে অন্তত ৯৫ শতাংশ ও টেকসই কাভারেজ বজায় রাখার পরামর্শ দিয়েছে। একই সঙ্গে হাম ও রুবেলা সংক্রমণের ওপর নজরদারি জোরদার করতে বলেছে, যাতে সন্দেহভাজন রোগী দ্রুত শনাক্ত করা যায়।

সংস্থাটি যাতায়াতপূর্ণ সীমান্ত এলাকায় নজরদারি জোরদারের পরামর্শ দিয়েছে। এতে সন্দেহভাজন হাম রোগী দ্রুত শনাক্ত ও মোকাবেলা করা সম্ভব হবে। বিদেশ থেকে আসা হাম রোগীর ক্ষেত্রে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে, যাতে আবার স্থানীয় সংক্রমণ স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠিত না হয়।

হাম মোকাবেলায় জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ের মধ্যে সমন্বয় নিশ্চিত করতে হবে। সব পর্যায়ের মধ্যে স্থায়ী ও কার্যকর যোগাযোগ ব্যবস্থা থাকতে হবে। ডব্লিউএইচও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে টিকা দেয়ার পরামর্শ দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছেন স্বাস্থ্যকর্মী, পর্যটন ও পরিবহন খাতে কর্মরত ব্যক্তি, হোটেল, বিমানবন্দর, সীমান্ত পারাপার, গণপরিবহন কর্মী এবং আন্তর্জাতিক ভ্রমণকারী। উচ্চ যাতায়াতপূর্ণ সীমান্ত এলাকায় অভিবাসী জনগোষ্ঠীকে টিকা দেয়ার পরিকল্পনা নেয়ার পরামর্শও দেয়া হয়েছে।

সংক্রমণের সংস্পর্শে আসা ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের তিনদিনের মধ্যে হাম প্রতিরোধী টিকা দেয়া উচিত। যাদের তিনদিনের মধ্যে টিকা দেয়া সম্ভব নয়, তাদের ক্ষেত্রে সংক্রমণের ছয়দিনের মধ্যে বিশেষ ইনজেকশন দেয়ার কথা বিবেচনা করা যেতে পারে। শিশু, গর্ভবতী নারী এবং রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কম এমন ব্যক্তিদের অগ্রাধিকার দিতে হবে। পাশাপাশি ডব্লিউএইচও টিকা, সিরিঞ্জ ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের পর্যাপ্ত মজুদ রাখার পরামর্শ দিয়েছে।

জ্যেষ্ঠ জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. আবু জামিল ফয়সাল বণিক বার্তাকে জানান, ‘দেশের বর্তমান পরিস্থিতির জন্য আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোরও কিছুটা দায় রয়েছে। তবে এখন সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়া উচিত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার ওপর।’ তার মতে, ব্যাপক টিকাদান কার্যক্রম শুরু হওয়ায় সংক্রমণ বড় আকারে বৃদ্ধির আশঙ্কা কমেছে। তবুও টিকাদান সম্পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত কিছু মৃত্যুর ঝুঁকি থেকেই যায়।

মাঠপর্যায়ে তদারকি জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, ‘স্বাস্থ্য সহকারীরা সঠিকভাবে কাজ করছেন কিনা, তা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন। প্রয়োজনে পরিবার পরিকল্পনা কর্মীদেরও টিকাদান কার্যক্রমে যুক্ত করা যেতে পারে।’

ডা. ফয়সাল আরো বলেন, ‘টিকার কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে কোল্ড চেইন সঠিকভাবে বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে কমিউনিটি পর্যায়ে সম্পৃক্ততা বাড়িয়ে স্থানীয়ভাবে নজরদারি জোরদার করার প্রয়োজন রয়েছে।’ এছাড়া তিনি আরো উল্লেখ করেন, শিশুদের অপুষ্টি এবং মায়ের বুকের দুধ খাওয়ানোর হার কমে যাওয়ায় মৃত্যুঝুঁকি বাড়ছে। তাই টিকাদানের পাশাপাশি পুষ্টি, সচেতনতা এবং সামাজিক বিষয়গুলোয়ও সমান গুরুত্ব দেয়ার আহ্বান জানান এ জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ।

আরও