রেল পরিচালনায় ভুল নীতিতে চলছে দেশ

পণ্য পরিবহন করে ২০২৪-২৫ অর্থবছর প্রায় ১ লাখ ৭৮ হাজার কোটি রুপি (স্থানীয় মুদ্রা) আয় করেছে ভারত। আর ভারতীয় রেলের মোট আয়ের ৬৭ শতাংশের বেশি এসেছে পণ্য পরিবহন খাত থেকে।

দেশটিতে রেলে যাত্রী পরিবহনে যে অর্থ খরচ হয়, তার একটা বড় অংশ ভর্তুকি দেয়া হয় পণ্য পরিবহন থেকে প্রাপ্ত রাজস্ব দিয়ে। এর প্রভাবে রেলের আয় ও ব্যয়ের মধ্যে সামঞ্জস্য ধরে রেখেছে দেশটি। প্রতি ১০০ টাকা আয় করতে গিয়ে ভারতীয় রেলের খরচ হয় ৯৮ টাকার সামান্য বেশি।

ভারতের মতো প্রতি ১০০ টাকা আয়ের বিপরীতে ৯৮ টাকার মতো খরচ করে পাকিস্তান রেলওয়ে। ২০২৪-২৫ অর্থবছর পাকিস্তান রেলওয়ে ৯ হাজার ৩০০ কোটি রুপি (স্থানীয় মুদ্রা) আয় করে। আয়ের ৩৩ শতাংশের বেশি আসে পণ্য পরিবহন খাত থেকে। দেশটির রেলওয়ে ব্যবস্থায় আয় ও ব্যয়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে পণ্য পরিবহন থেকে প্রাপ্ত রাজস্ব।

চীন, জার্মানি বা যুক্তরাষ্ট্রের মতো বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে রেলওয়ে চলে মূলত ব্যবসার নিয়মে। তাদের মূল মন্ত্র হলো মালবাহী ট্রেন থেকে লাভ করে সেই টাকা দিয়ে যাত্রীসেবায় ভর্তুকি দেয়া। এজন্য তারা পণ্য পরিবহনের জন্য আলাদা রেললাইন (ডেডিকেটেড করিডোর) ব্যবহার করে এবং বড় বড় কারখানা ও বন্দরের সঙ্গে সরাসরি রেলের সংযোগ রাখে। তারা শুধু টিকিট বিক্রি নয়, বরং রেল স্টেশনের জায়গায় শপিং মল বা অফিস বানিয়েও প্রচুর আয় করে।

ঊনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝিতে ব্রিটিশদের হাত ধরে ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশে রেলওয়ে ব্যবস্থা প্রবর্তন হয়। পৌনে দুইশ বছরের পথপরিক্রমার ভারত ও পাকিস্তান রেলওয়ে বাণিজ্যিকভাবে সাফল্য দেখালেও উল্টোপথে হাঁটছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। প্রতি ১০০ টাকা আয় করতে বাংলাদেশ রেলওয়ে ব্যয় করছে ২০৯ টাকা (২০২৪-২৫ অর্থবছরের হিসাব)। উল্লিখিত হিসাব বছরে রেল আয় করে ১ হাজার ৮৪৬ কোটি। আয়ের সিংহভাগই আসে যাত্রী পরিবহন খাত থেকে। মালামাল (কনটেইনারসহ) পরিবহন করে আয়ের পরিমাণ মাত্র ৫ শতাংশ। ইঞ্জিনসহ প্রয়োজনীয় রোলিংস্টক সংকটের কারণে পণ্য পরিবহন খাত থেকে রেলের আয় ধারাবাহিকভাবে কমছে বলে জানিয়েছেন সংস্থাটির কর্মকর্তারা। যদিও পরিবহন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রোলিংস্টক সংকট নয়, বাংলাদেশ রেলওয়ের বিজনেস মডেলেই পণ্য পরিবহন খুব একটা গুরুত্ব পাচ্ছে না।

বিশেষজ্ঞদের এ বক্তব্যের প্রতিফলন পাওয়া যায় রেলের দৈনন্দিন ট্রেন পরিচালনার তথ্যে। ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে দৈনিক আটটি কনটেইনার ট্রেন চলাচলের নির্ধারিত সময়সূচি থাকলেও লোকোমোটিভ সংকটে গত মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) কোনো ট্রেন চালানো সম্ভব হয়নি। গতকাল বুধবার সন্ধ্যা পর্যন্তও কোনো কনটেইনার ট্রেন চালাতে পারেনি সংস্থাটি। গত মার্চে ৫৯টি কনটেইনার ট্রেন পরিচালনা করেছিল বাংলাদেশ রেলওয়ে। বিপরীতে চলতি এপ্রিলে এখন পর্যন্ত ৪৭টি কনটেইনার ট্রেন চলেছে। এ মাসে ৫০টির বেশি কনটেইনার ট্রেন চলার সম্ভাবনা নেই বলে মনে করছেন রেলের কর্মকর্তারা।

এর কারণ জানতে চাইলে বাংলাদেশ রেলওয়ের সহযোগী প্রতিষ্ঠান কনটেইনার কোম্পানি অব বাংলাদেশ লিমিটেডের (সিসিবিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মিয়াজাহান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘‌ইঞ্জিনের (লোকোমোটিভ) অভাবে কনটেইনার ট্রেনগুলো নিয়মিত চালানো সম্ভব হচ্ছে না। মূলত প্যাসেঞ্জার ট্রেনগুলো শিডিউল অনুযায়ী সচল রাখার ওপর বিশেষ জোর দেয়ায় মালবাহী বা কনটেইনার ট্রেনের জন্য ইঞ্জিন পাওয়া দুষ্কর হয়ে পড়েছে। এছাড়া আসন্ন কোরবানি ঈদ উপলক্ষে বাড়তি যাত্রীসেবার প্রস্তুতি হিসেবে বেশকিছু ইঞ্জিন বর্তমানে মেরামতের জন্য ওয়ার্কশপে রয়েছে, যা ঈদের আগে ফেরার সম্ভাবনা নেই। ফলে ঈদের পর লোকোমোটিভের কিছুটা উন্নয়ন ঘটলেও তার আগে পরিস্থিতির পরিবর্তনের আশা কম।’

ইঞ্জিন সংকটের প্রভাব শুধু কনটেইনারে নয়, বরং সার ও উত্তরবঙ্গগামী তেলবাহী ট্রেনের ওপরও পড়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘‌২০২৪ সালে যেখানে আমরা এক লাখ টিইইউএস কনটেইনার পরিবহন করেছিলাম, সেখানে ২০২৫ সালে তা নেমে আসে ৬৯ হাজার টিইইউএস কনটেইনারে।’ কনটেইনার যথাসময়ে গন্তব্যে পৌঁছাতে না পারায় এবং দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষায় থেকে বাধ্য হয়ে অনেক রফতানিকারক রেলপথ ছেড়ে সড়কপথ বেছে নিচ্ছেন বলে মনে করছেন তিনি।

রেলের বিজনেস মডেলে পণ্য পরিবহন প্রয়োজনীয় গুরুত্ব না পাওয়ার প্রভাব পড়ছে সড়কের ওপর। সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তরের এক সমীক্ষায় উঠে এসেছে, দেশে মোট পণ্য পরিবহনের ৯৬ শতাংশ হয় সড়কপথে। রেলপথে পরিবহন হয় ৩ শতাংশ পণ্য। আর নৌপথে পণ্য পরিবহন হয় মাত্র ১ শতাংশ।

যদিও দেশের ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতার কারণে সড়কপথের ওপর পণ্য পরিবহনের এ অতিনির্ভরতা থেকে বেরিয়ে আসার কথা বলছেন পরিবহন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, খাদ্য নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়াতে রেল ও জলপথের অমিত সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হবে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. সামছুল হক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘রেলওয়ের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড হওয়ার কথা ছিল পণ্য পরিবহন বা ফ্রেইট সার্ভিস। কারণ যাত্রী পরিবহনের তুলনায় ফ্রেইট থেকে রিটার্ন বা আয়ের হার অনেক বেশি। পণ্যবাহী ট্রেনের জন্য স্টেশনে বাড়তি কোনো সুবিধার প্রয়োজন হয় না। বিশ্বের অন্যান্য দেশে কনটেইনার ট্রেন থেকে প্রাপ্ত আয় দিয়ে যাত্রীসেবায় বড় অংকের ভর্তুকি দেয়া হয় এবং ভাড়ায় ভারসাম্য আনা হয়। কিন্তু বাংলাদেশে রেলওয়েকে লোকসানি প্রতিষ্ঠান হিসেবেই জিইয়ে রাখা হচ্ছে। দায়বদ্ধতা এড়াতে প্রায়ই বলা হয়, “রেল সেবা দিতে এসেছে, লাভ করতে নয়।” অথচ প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই রিপোর্টে সবসময়ই মুনাফার কথা বলা হয়, যা এক ধরনের অনৈতিক ও স্ববিরোধী অবস্থান।’

বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রেলের উন্নয়নে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ হয়েছে। প্রায় ৩৯ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করে নির্মাণ করা হচ্ছে ঢাকা-পদ্মা সেতু-যশোর রেলপথ। চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেলপথে বিনিয়োগ হয়েছে ১৩ হাজার কোটি টাকার বেশি। প্রায় ১৭ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ হয়েছে যমুনা রেল সেতু নির্মাণে। রেলপথ ও সম্পর্কিত অবকাঠামো উন্নয়ন ও আধুনিকায়ন এবং ইঞ্জিন ও কোচ সংগ্রহেও বিপুল অর্থ ব্যয় হয়েছে। যদিও আওয়ামী লীগের ১৫ বছরের বেশি শাসনামলে রেল ধারাবাহিকভাবে লোকসান করে গেছে। সদ্য গঠিত বিএনপি সরকারের নির্বাচনী ইশতাহারেও রেলকে জাতীয় অর্থনীতির মেরুদণ্ড হিসেবে গড়ে তোলা, যাত্রী ও মালবাহী করিডোর নির্মাণসহ রেল নিয়ে রয়েছে একগুচ্ছ প্রতিশ্রুতি।

রেলের আয় ও ব্যয়ের মধ্যে ভারসাম্য আনা এবং পণ্য পরিবহন বৃদ্ধিতে করণীয় সম্পর্কে গতকাল একাধিকবার ফোন ও হোয়াটসঅ্যাপে ক্ষুদে বার্তা পাঠিয়েও রেলপথমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম ও প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশীদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

পরে যোগাযোগ করা হলে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব ফাহিমুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘রেলের জন্য কিছু ইঞ্জিন কেনার প্রক্রিয়া চলছে। এগুলো বহরে যুক্ত হলে কনটেইনার ট্রেন পরিচালনার সমস্যা অনেকটাই কেটে যাবে।’

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মতো পণ্য পরিবহনের আয় দিয়ে যাত্রীসেবায় ভর্তুকি দেয়ার কোনো পরিকল্পনা আছে কিনা, এমন প্রশ্নে রেল সচিব বলেন, ‘‌রেলের বিজনেস মডেলে আমূল পরিবর্তনের লক্ষ্যে কাজ চলছে। সরকারের লক্ষ্য হলো পণ্য পরিবহনে রেলের ‘মোডাল শেয়ার’ ২০ শতাংশে উন্নীত করা। এ লক্ষ্য অর্জনে বর্তমানে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে।’

আরও