টমেটো ও আলুর পোস্ট হারভেস্ট লস এক-তৃতীয়াংশ ধানে ১০.২৪%

উপস্থাপিত তথ্যমতে, বোরো ধানের ক্ষেত্রে প্রাক-সংগ্রহ পর্যায়ে ক্ষতির হার দশমিক ৩৭ শতাংশ। সংগ্রহের সময় এ হার ১ দশমিক ৮৯ শতাংশ, মাঠে স্তূপ করে রাখার সময় দশমিক ৮৩ শতাংশ এবং পরিবহনে দশমিক ৫৩ শতাংশ।

দেশে উৎপাদিত টমেটো ও আলুর প্রায় এক-তৃতীয়াংশ সংগ্রহ-পরবর্তী বিভিন্ন পর্যায়ে নষ্ট (পোস্ট হারভেস্ট লস) হয়ে যায়। ধানের ক্ষেত্রেও উৎপাদন থেকে শুরু করে সংগ্রহ, পরিবহন, মাড়াই, পরিষ্কার ও শুকানো পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ে ক্ষতির হার প্রায় ১০ দশমিক ২৪ শতাংশ। মাছের ক্ষেত্রে এ হার ২২ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত। সংরক্ষণ অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা, আধুনিক প্রযুক্তির স্বল্প ব্যবহার এবং দুর্বল ব্যবস্থাপনার কারণে কৃষিপণ্যের এ ক্ষতি হচ্ছে। এতে একদিকে কৃষকের বিক্রিযোগ্য পণ্যের পরিমাণ ও আয় কমছে, অন্যদিকে ব্যাহত হচ্ছে খাদ্য ও পুষ্টিনিরাপত্তা নিশ্চিত করার সম্ভাবনাও।

বিশ্ব খাদ্য দিবস উপলক্ষে গতকাল রাজধানীর বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলে আয়োজিত এক সেমিনারে উপস্থাপিত প্রবন্ধে এ তথ্য তুলে ধরা হয়। প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের উদ্ভিদ প্রজনন বিভাগের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও বিভাগীয় প্রধান ড. খোন্দকার মো. ইফতেখারুদ্দৌলা। তিনি জানান, উপস্থাপিত পরিসংখ্যানগুলো বিভিন্ন সময়ে পরিচালিত গবেষণা থেকে সংকলিত; এগুলো নতুন কোনো গবেষণার ফল নয়।

প্রবন্ধে উল্লেখ করা হয়, বিভিন্ন গবেষণায় দেশে আলুর সংগ্রহ-পরবর্তী ক্ষতির হার ২১ দশমিক ৮ থেকে ৩১ শতাংশ এবং টমেটোর ক্ষেত্রে ২৮ থেকে ৩২ দশমিক ৯ শতাংশ পর্যন্ত পাওয়া গেছে। অর্থাৎ উৎপাদিত এসব কৃষিপণ্যের উল্লেখযোগ্য অংশ ভোক্তার কাছে পৌঁছানোর আগেই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

ধানের ক্ষেত্রেও ক্ষতি কম নয়। আউশ মৌসুমে ধানের মোট ক্ষতির হার ১০ দশমিক ৪২ শতাংশ, আমনে ১০ দশমিক ৪ শতাংশ এবং বোরোতে ১০ দশমিক ২৮ শতাংশ। তিন মৌসুমের গড় ক্ষতির হার প্রায় ১০ দশমিক ২৪ শতাংশ। উৎপাদন-পরবর্তী বিভিন্ন ধাপে এ ক্ষতি হয়। বিশেষ করে মাড়াই ও শুকানোর সময় উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ধান নষ্ট হয়।

উপস্থাপিত তথ্যমতে, বোরো ধানের ক্ষেত্রে প্রাক-সংগ্রহ পর্যায়ে ক্ষতির হার দশমিক ৩৭ শতাংশ। সংগ্রহের সময় এ হার ১ দশমিক ৮৯ শতাংশ, মাঠে স্তূপ করে রাখার সময় দশমিক ৮৩ শতাংশ এবং পরিবহনে দশমিক ৫৩ শতাংশ। এছাড়া মাড়াইয়ের সময় ৩ দশমিক ১৬ শতাংশ, পরিষ্কারের সময় দশমিক ৩৯ শতাংশ এবং শুকানোর সময় ৩ দশমিক ১৪ শতাংশ ক্ষতি হয়।

শুধু আলু, টমেটো ও ধান নয়; অন্যান্য ফল ও সবজির ক্ষেত্রেও সংগ্রহ-পরবর্তী ক্ষতির হার বেশি। বিভিন্ন গবেষণায় কলার ক্ষতির হার ২০ থেকে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত পাওয়া গেছে। কোনো কোনো গবেষণায় এ হার ৩৪ দশমিক ৬ শতাংশ এবং ২০ থেকে ২৬ দশমিক ৬ শতাংশ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। আমের ক্ষেত্রে ক্ষতির হার ২৭ দশমিক ২ থেকে ৩৭ শতাংশ, পেঁপেতে ৩৯ দশমিক ৯ থেকে ৪১ দশমিক ৪ শতাংশ ও আনারসে ৪৩ শতাংশ। ফুলকপির ক্ষতি ২২ থেকে ৩৪ দশমিক ৪ শতাংশ এবং বেগুনের ক্ষেত্রে ২০ দশমিক ৪ থেকে ৩২ শতাংশ। সামগ্রিকভাবে ফল ও সবজির সংগ্রহ-পরবর্তী ক্ষতির হার ২৫ থেকে ৪০ শতাংশ বলে প্রবন্ধে উল্লেখ করা হয়।

এ বিপুল ক্ষতির বিপরীতে দেশে কৃষিপণ্যের উৎপাদনও কম নয়। প্রবন্ধে উপস্থাপিত ২০২৪-২৫ অর্থবছরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে আলুর উৎপাদন ছিল ১ কোটি ১৮ লাখ ৮০ হাজার টন। একই সময়ে সবজি উৎপাদিত হয়েছে ৬২ লাখ ৮০ হাজার টন। কিন্তু সংরক্ষণ, পরিবহন ও বাজারজাতের বিভিন্ন পর্যায়ে ক্ষতির কারণে উৎপাদিত পণ্যের পুরোটা ভোক্তার কাছে পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে না। এতে কৃষকের বিক্রিযোগ্য পণ্য ও আয় কমার পাশাপাশি বাজারে খাদ্য সরবরাহের ওপরও প্রভাব পড়ছে।

বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের উদ্ভিদ প্রজনন বিভাগের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও বিভাগীয় প্রধান ড. খোন্দকার মো. ইফতেখারুদ্দৌলা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমরা এখনো স্বল্পোন্নত দেশ। আধুনিক প্রযুক্তি ও অবকাঠামোগত সক্ষমতা তেমন নেই। আমাদের আধুনিক স্টোরেজ বা কোল্ড চেইন সুবিধাও সীমিত। ফসল উত্তোলন থেকে শুরু করে অধিকাংশ কাজই ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে হয়। আবার রাস্তার পাশে রোদের মধ্যে ভ্যানের ওপর ফলমূল, শাকসবজি ও মাছ বিক্রি হয়। সঠিক সংরক্ষণ, পরিবহন ও ব্যবস্থাপনার অভাবে এসব পণ্য নষ্ট হয়ে যায়। হাওরাঞ্চলে পানিতে ডুবে ধান নষ্ট হয়। আবার কেটে আনার পর স্তূপ করে রাখা ধানও পচে যায়। এসব ক্ষতি কমাতে আধুনিক প্রযুক্তি ও অবকাঠামোগত সুবিধা বাড়ানোর বিকল্প নেই।’

কৃষিপণ্যের পাশাপাশি মাছের সংগ্রহ-পরবর্তী ক্ষতিও খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। প্রবন্ধে উপস্থাপিত তথ্যমতে, সামুদ্রিক মাছের শারীরিক ক্ষতির হার দশমিক ৮২ শতাংশ। সংগ্রহ-পরবর্তী ক্ষতির কারণে এসব মাছের বাজারমূল্যজনিত ক্ষতির হার ৬ দশমিক ৪১ শতাংশ। এছাড়া ছোট মাছের সংগ্রহ-পরবর্তী ক্ষতির হার ২৫ দশমিক ৪৫ এবং কার্পজাতীয় মাছের ক্ষেত্রে ১৮ দশমিক ২ শতাংশ।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ বিভাগের অধ্যাপক মোহা. ইয়ামিন হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমাদের দেশে মাছের সংগ্রহ-পরবর্তী ক্ষতি ২২ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত। বৈশ্বিকভাবে তুলনা করলে মাছের এ ক্ষতি ৫ থেকে ৭ শতাংশের বেশি নয়। মাছ ধরার সময় থেকেই ক্ষতির শুরু। জেলেদের অনেকেরই মাছের দেহে আঘাত না লাগিয়ে উন্নত পদ্ধতিতে ধরার বিষয়ে প্রশিক্ষণ নেই। তাছাড়া মাছ কাটা, রান্না এবং রান্নার পর খাবার পর্যায়েও অপচয় হয়। এসব ক্ষতি কমাতে মাছ ধরার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের প্রশিক্ষণ এবং মাছ সংরক্ষণ ও পরিবহনে কোল্ড চেইন ব্যবস্থা উন্নত করা জরুরি।’

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) ২০২৩ সালের এক প্রতিবেদনেও বাংলাদেশের কৃষিপণ্যের সংগ্রহ-পরবর্তী ক্ষতির বিষয়টি উঠে আসে। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশে উৎপাদিত আলুর ২৫ শতাংশের বেশি সংগ্রহ-পরবর্তী পর্যায়ে নষ্ট হয়। আমের ক্ষেত্রে এ হার ৩০ শতাংশ, পেঁয়াজের ক্ষেত্রে ২৫ শতাংশের বেশি এবং টমেটোর ক্ষেত্রে প্রায় ৪০ শতাংশ।

কৃষি অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞদের মতে, সংরক্ষণ অবকাঠামোর ঘাটতি, কোল্ড চেইন সুবিধার সীমাবদ্ধতা, প্রযুক্তির অপর্যাপ্ত ব্যবহার এবং অসচেতনতা এসব ক্ষতির অন্যতম কারণ। তবে ক্ষতি কমাতে শুধু অবকাঠামো নির্মাণ যথেষ্ট নয়; কৃষকের আর্থিক সক্ষমতা ও ব্যবহারিক চাহিদা বিবেচনায় নিয়েই প্রযুক্তি ও সংরক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এএইচএম সাইফুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বাংলাদেশে সামগ্রিকভাবে কৃষির সংগ্রহ-পরবর্তী ক্ষতি এক-তৃতীয়াংশের মতো। পচনশীল পণ্যে এ ক্ষতি বেশি, অপচনশীল পণ্যে কম। আমাদের কুলিং সিস্টেম ও স্টোরেজ সুবিধা খুবই সীমিত। প্রযুক্তিগত সক্ষমতাও কম। এ ক্ষেত্রে সক্ষমতা বাড়াতে হবে। প্রযুক্তি ও অবকাঠামো এমনভাবে উন্নত করতে হবে, যাতে কৃষকরা তা ব্যবহারের সামর্থ্য রাখেন। উচ্চ প্রযুক্তির ব্যবহার ব্যয় বাড়িয়ে দিলে কৃষকের পক্ষে তা গ্রহণ করা কঠিন হবে। তাই কৃষকের চাহিদা ও সক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে উন্নয়ন পরিকল্পনা করতে হবে।’

সাইফুল ইসলামের মতে, সংগ্রহ-পরবর্তী ক্ষতির পাশাপাশি খাদ্য নষ্ট ও অপচয়ের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। কৃষিপণ্যের সংগ্রহ-পরবর্তী ক্ষতি ১০ থেকে ২০ শতাংশে নামিয়ে আনতে পারলে উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি পুষ্টি ও খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করাও সহজ হবে। এজন্য অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি জনসচেতনতা বাড়ানো এবং খাদ্য অপচয় বন্ধে কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. সেলিম খানের সভাপতিত্বে বিশ্ব খাদ্য দিবস উপলক্ষে আয়োজিত সেমিনারে প্রধান অতিথি ছিলেন কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ। তিনিও কৃষিপণ্যের উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্য নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেন, ‘বিশ্বজুড়ে খাদ্যসংকটের পাশাপাশি খাদ্যের গুণগত মান ও পুষ্টি নিশ্চিত করার বিষয়টি ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। তাই কৃষিতে উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্য উৎপাদনের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। তরুণ প্রজন্মের খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন আসছে। চালের পাশাপাশি শাকসবজি ও ফলমূলের প্রতি তাদের আগ্রহ বাড়ছে। এ বাস্তবতায় কৃষি উৎপাদনের ধরন ও পরিকল্পনায় পরিবর্তন এনে পুষ্টিসমৃদ্ধ খাদ্যের জোগান বাড়াতে হবে।’

কৃষকের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা এবং তাদের সুরক্ষায় সরকার কাজ করছে উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, ‘কোন মৌসুমে কী পরিমাণ কৃষিপণ্য উৎপাদিত হবে এবং বাজারে সেসব পণ্যের চাহিদা কতটা, তা নির্ধারণে তথ্যভিত্তিক পরিকল্পনা ও কার্যকর ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। এর মাধ্যমে উৎপাদন ও বাজারের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো সম্ভব হবে। সেই সঙ্গে আধুনিক প্রযুক্তি, গবেষণা ও উদ্ভাবন কাজে লাগাতে পারলে কৃষিকে আরো উৎপাদনশীল, লাভজনক ও টেকসই খাতে পরিণত করা যাবে।’

আরও