সাঁকো যেন মৃত্যুফাঁদ। গত ২০ বছরে সাঁকো থেকে পড়ে পঙ্গুত্ববরণসহ আহত হয়েছেন অন্তত ৩০ জন। নোয়াখালী সদর উপজেলার কাদিরহানিফ ইউনিয়নের পূর্ব লক্ষ্মীনারায়ণপুর মুসলিম কলোনিসংলগ্ন খালের ওপর জরাজীর্ণ কাঠের সাঁকোতে এমন ভোগান্তিতে হাজারো মানুষ। স্থানীয়রা বলছেন, বছরের পর বছর শুধু আশ্বাসই পেয়েছেন, কিন্তু খালের ওপর কালভার্ট নির্মাণ হয়নি। তবে এলজিইডি বলছে, গুরুত্ব বিবেচনা করে দ্রুতই কালভার্ট নির্মাণে উদ্যোগ নেবে তারা।
সম্প্রতি সরেজমিনে গেলে স্থানীয়রা জানান, প্রায় ছয় বছর আগে মুসলিম কলোনি এলাকার নোয়াখালী খালের ওপর নির্মিত কাঠের এ সাঁকো থেকে পড়ে পঙ্গু হন ষাটোর্ধ্ব বেলাল উদ্দিন। এক সময় তিনি গাছ কাটা শ্রমিক ছিলেন। এ সাঁকো থেকে পড়ে তার কোমর ও পা ভেঙে যায়। সেই থেকে তিনি পঙ্গুত্ব নিয়েই বেঁচে আছেন।
বেলাল উদ্দিন বলেন, ওই দিন বেশ বৃষ্টি ছিল। সাঁকোটিও নড়বড়ে। কাজে বের হওয়ার সময় সাঁকো থেকে পড়ে যান তিনি। নিচে পড়ে গিয়ে তার কোমর ও পা ভেঙে যায়। পরে স্থানীয়দের সহায়তায় দীর্ঘদিন হাসপাতালে চিকিৎসা নেয়ার পর বেঁচে এসেছেন। কিন্তু চিরতরে পঙ্গুত্ববরণ করতে হয়েছে তাকে। বর্তমানে তিনি স্ট্রেচার দিয়ে কোনোভাবে চলাফেরা করেন। সংসার চালাতে তাকে এখন হাত পাততে হয় স্থানীয়দের কাছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, শুধু বেলাল উদ্দিন নয়, নোয়াখালীর কাদিরহানিফ ইউনিয়নের পূর্ব লক্ষ্মীনারায়ণপুরের মুসলিম কলোনি এলাকার এ সাঁকো থেকে পড়ে শিশুসহ আহত হয়েছেন আরো অন্তত ৩০ জন। স্থানীয়রা বলছেন, ২০ বছরের বেশি সময় এ সাঁকো দিয়েই পারাপার হচ্ছেন তারা। ফলে প্রতিদিনই ঘটছে দুর্ঘটনা। গর্ভবতী মা কিংবা কেউ গুরুতর অসুস্থ হলে সঠিক সময়ে চিকিৎসা নিতে পারছেন না। বৃষ্টির দিনে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে স্কুল-কলেজ শিক্ষার্থী ও বৃদ্ধদের।
নোয়াখালী জেলা শহর মাইজদীর অদূরের এ গ্রামের হাজারো মানুষ দীর্ঘদিন শুধু জনপ্রতিনিধিদের আশ্বাসই পেয়েছেন, পাননি স্বপ্নের একটি কালভার্ট।
লায়লা পারভিন নামে এক গৃহবধূ জানান, কিছুদিন আগে তিনি মা হয়েছেন। ব্যথায় ছটফট করছিলেন বাড়িতে। কিন্তু তাকে নিয়ে হাসপাতালে যাওয়ার কোনো অবস্থা নেই। সাঁকোর এ অবস্থার কারণে অ্যাম্বুলেন্স তো দূরের কথা একটি রিকশা বা ভ্যান পর্যন্ত ঢুকতে পারেনি। পরে তাকে কোলে করে অন্য পাড়ে এনে হাসপাতালে নেয়া হয়েছিল। তিনি বলেন, এ সাঁকোটি নির্মাণ করা হলে এলাকার কয়েক হাজার মানুষের জীবন-মান পরিবর্তন হবে। শহরের কাছাকাছি থেকেও তারা আধুনিক সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
এ সাঁকো দিয়ে প্রতিদিন অন্তত দুই হাজার মানুষ যাতায়াত করে। সাঁকোটি সরু হওয়ায় রিকশা তো দূরের কথা মোটর ও বাইসাইকেল নিয়ে চলাচল করাও মুশকিল। বিভিন্ন সময় সাঁকো থেকে খালে পড়ে বিকল হয়েছে হালকা যানবাহন। সাঁকোটি ভেঙে পড়লে এলাকার মানুষ চাঁদা দিয়ে এটি মেরামত করে। প্রতিবার মেরামত করতে ২ লাখ টাকার বেশি খরচ হচ্ছে।
কামাল হোসেন নামের এক বাসিন্দা জানান, প্রতি বছর অন্তত দুবার সাঁকো মেরামত করতে হয়। তখন পূর্ব এলাকার তথা মুসলিম কলোনি ও আশপাশের দোকানিদের কাছ থেকে চাঁদা নিয়ে তারা মেরামত করেন। মাঝে মাঝে স্থানীয় জনপ্রতিনিধির কিছু আর্থিক সহায়তা পান, এর বেশি কিছু না। কিন্তু দেখা গেছে চেয়ারম্যান, মেম্বার এমনকি সংসদ সদস্যও বার বার আশ্বাস দিয়েছেন সাঁকোর পরিবর্তে একটি কালভার্ট করার। কিন্তু কেউ-ই কথা রাখেননি।
এ বিষয়ে কথা হয়, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের উপজেলা প্রকৌশলী আবুল মনছুর আহমেদ বলেন, এরই মধ্যে একাধিকবার ওই সাঁকো এলাকা পরিদর্শন করা হয়েছে। এটি গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা হয়েছে। গুরুত্ব বিবেচনা করে একটি কালভার্ট নির্মাণে পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।