এভিয়েশন খাত এবং ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে এ খাতের সম্পর্ক নিয়ে আয়োজিত এ কনক্লেভের আলোচনায় উপস্থিত থাকতে পেরে আমি অত্যন্ত আনন্দিত। সরকারের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং এ খাতে সরকারের অগ্রাধিকার; এভিয়েশন খাতকে সরকার কীভাবে দেখছে এবং কীভাবে এ খাতে প্রবৃদ্ধি ঘটাতে চায় সে বিষয়গুলো তুলে ধরব।
আমি আত্মবিশ্বাসী যে আমরা এমন একটি এভিয়েশন খাত গড়ে তুলব, যা দেশকে সমৃদ্ধ করবে। এমন একটি নীতি গড়ে উঠবে যেখানে ব্যবসা করার পথ সুগম হবে এবং একই সঙ্গে যাত্রীদের বিশ্বমানের সেবা নিশ্চিত করবে। বাংলাদেশকে একটি আঞ্চলিক বিমান চলাচল কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। সেজন্য বিমানবন্দর অবকাঠামোর উন্নয়ন করতে হবে। জাতীয় বিমান সংস্থার সক্ষমতা বাড়াতে হবে। এটিকে আধুনিকায়ন করতে হবে। আমাদের আন্তর্জাতিক মানের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং ব্যবস্থা থাকতে হবে। বাইরের কেউ এসে এটি করে দেবে না। আমরা যখন এটি করব, অন্যরা অংশীদার হবে। কিন্তু কেউ আমাদের হয়ে করে দেবে না। নেতৃত্ব আমাদেরই দিতে হবে।
আমাদের বিমানবহর সম্প্রসারণ করতে হবে। এটি আমাদের কাজ। কারণ আমরা এ খাতকে বড় করতে চাই। নেটওয়ার্ক ও রুট সম্প্রসারণের মাধ্যমে যে অর্থনৈতিক সুবিধা পাওয়া সম্ভব, তা কাজে লাগাতে চাই। আর সেগুলো পরিচালনার মতো পর্যাপ্ত বিমান থাকতে হবে। আমরা বোয়িং কিনব, নাকি এয়ারবাস কিনব—এটি বাংলাদেশের নিজস্ব সিদ্ধান্ত। এটি অন্য কারো বিষয় নয়।
আমাদের তৃতীয় টার্মিনালের পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম নিশ্চিত করতে হবে। এটি দেশের জন্য একটি বড় সুযোগ। সরকারের দায়িত্ব নেয়ার প্রথম দিনে আমরা যে পরিস্থিতিতে পেয়েছিলাম, সেখান থেকে খুব দ্রুতগতিতে তৃতীয় টার্মিনাল নিয়ে আলোচনা প্রায় শেষ পর্যায়ে নিয়ে এসেছি। প্রধানমন্ত্রী দায়িত্ব নেয়ার প্রথম দিনেই তৃতীয় টার্মিনাল নিয়ে একটি আলোচনা কমিটি গঠন করেছিলেন। বিমানমন্ত্রী এবং প্রধানমন্ত্রীর তৎকালীন পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হিসেবে আমি নিজেও ওই কমিটির অন্তর্ভুক্ত ছিলাম।
প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ দিয়েছিলেন, বাংলাদেশের জাতীয় এবং জনগণের স্বার্থকে সামনে রেখে যত দ্রুত সম্ভব এ আলোচনা শেষ করতে এবং এমন একটি চুক্তি করতে, যা উভয় পক্ষের জন্য লাভজনক অর্থাৎ একটি ‘উইন-উইন’ চুক্তি যেন হয়। আমি আনন্দের সঙ্গে জানাতে পারি যে আমরা একটি চুক্তি সম্পন্ন করার খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছি।
ডিসেম্বরে তৃতীয় টার্মিনালের একটি সফট ওপেনিং হবে এবং মার্চ-এপ্রিলের মধ্যে এটি পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যক্রমে যাবে। এটি চালু হলে বছরে ১ কোটি ২০ লাখ যাত্রী বাংলাদেশে আসা-যাওয়া করতে পারবেন। এর মাধ্যমে বাংলাদেশকে একটি বড় বিমান চলাচল কেন্দ্রে পরিণত করার প্রক্রিয়া শুরু হবে। তৃতীয় টার্মিনাল ব্যবহারের ক্ষেত্রে আমাদের অপারেশনাল প্রস্তুতি নিশ্চিত করতে হবে। বিমানবন্দর থেকে যাত্রীদের স্থানান্তরের ব্যবস্থা এবং অন্যান্য অপারেশনাল প্রস্তুতি আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে হবে এবং আমরা তা করব।
আমরা আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে আলোচনা করছি, বিনিয়োগের সম্ভাবনাসহ বিভিন্ন বিষয় দেখছি। বিমানমন্ত্রী অত্যন্ত দক্ষ মন্ত্রী। প্রধানমন্ত্রী ব্যক্তিগতভাবে তাকে এ দায়িত্বের জন্য বেছে নিয়েছেন, কারণ তিনি মনে করেন যে তিনি (মন্ত্রী) এটি করতে পারবেন। প্রধানমন্ত্রী তাকে এ কাজ করার জন্য পূর্ণ সমর্থন দিচ্ছেন।
আমাদের রুট নেটওয়ার্ক ও ফ্লাইটের ফ্রিকোয়েন্সি বাড়াতে হবে। কার্গো এবং পরিবহন সক্ষমতাও বাড়াতে হবে। শুধু যাত্রী পরিবহনের উপযোগী বিমান কেনাই যথেষ্ট নয়; আমাদের কার্গো, ফ্লাইটের ফ্রিকোয়েন্সি এবং অন্যান্য বিষয়ও বিবেচনা করতে হবে। ই-কমার্সের এ যুগে বিশ্বজুড়ে পণ্য পরিবহনের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। আমাদের সেই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হবে।
নিজেদের মেইনটেন্যান্স, রিপেয়ার অ্যান্ড ওভারহল অর্থাৎ এমআরও সুবিধা গড়ে তুলতে হবে। স্থানীয় বিমান চলাচল প্রশিক্ষণ কেন্দ্র তৈরি করতে হবে। আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের পাইলট তৈরি করতে হবে। পরবর্তী প্রজন্মের এয়ারলাইনস প্রকৌশলী তৈরি করতে হবে। গ্রাউন্ড স্টাফদের যথাযথ প্রশিক্ষণ দিতে হবে। যাতে আমরা এমন একটি বিমান চলাচল খাত গড়ে তুলতে পারি, যা কার্যকর, প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং সেবার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
নীতিগত ও নিয়ন্ত্রণ পরিবেশের ক্ষেত্রে যতটা সম্ভব আমরা একটি ‘ওপেন স্কাই’ নীতি বজায় রাখব। অবশ্যই, এখানে-সেখানে এমন অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে, যখন আমাদের আকাশসীমা বন্ধ করার প্রয়োজন হতে পারে। তবে সেটি হবে একেবারে চরম পরিস্থিতিতে। আমাদের প্রয়োজন উন্মুক্ত আকাশসীমা।
আমরা দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের মতো হতে চাই। এমন একটি ‘ওপেন স্কাই’ নীতি চাই, যেখানে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা ফ্লাইট দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য এবং এর বাইরের গন্তব্যে যাওয়ার জন্য বাংলাদেশকে প্রবেশদ্বার হিসেবে ব্যবহার করতে পারবে। তাই আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলের একটি পূর্ণাঙ্গ বাজারের সম্ভাবনা এখানে রয়েছে। বর্তমানে এ বাজারের মূল্য সম্ভবত প্রায় ৭০ হাজার কোটি টাকা। আমাদের এ সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় একটি সমৃদ্ধ আঞ্চলিক রুট নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে হবে। কম খরচের এয়ারলাইনসগুলোর সঙ্গে অংশীদারত্ব এবং নতুন গেটওয়ের সম্ভাবনা দেখতে হবে।
পূর্ব এশিয়া, চীন, জাপান, কোরিয়া—এগুলো যাত্রী পরিবহন, পর্যটন, বাণিজ্য ও বিনিয়োগের জন্য বড় সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র। ওই দিকেও মানুষ ও পণ্যের গতিশীলতা বাড়ানোর বিশাল সুযোগ রয়েছে।
আমি বিশ্বাস করি, প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে এ দেশ এগিয়ে যাবে। বাংলাদেশ সমৃদ্ধ হবে এবং ইনশা আল্লাহ ইতিবাচক অর্থে বিশ্বকে চমকে দেবে। বিভিন্ন খাতে, বিভিন্ন উপায়ে আমরা নেতৃত্ব দেব, যেটি হবে ইতিবাচক।
আবার বিমানমন্ত্রীর বিষয়ে বলতে চাই—তার বেসরকারি খাতে কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে। তাই আমলাতান্ত্রিক জটিলতা তাকে আটকে রাখতে পারবে না। সরকার হিসেবে আমরাও একসঙ্গে এসব জটিলতা ভেঙে দেশে ব্যবসার পরিবেশ সহজ করব।