দেশের ব্যাংকগুলোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাদের (সিইও) কর্মদক্ষতা মূল্যায়নে অভিন্ন ‘কী পারফরম্যান্স ইন্ডিকেটরস’ বা কেপিআই ফ্রেমওয়ার্ক নির্ধারণ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নতুন এ কাঠামোয় ব্যাংকের আর্থিক সক্ষমতা, খেলাপি ঋণ, মুনাফা, সুশাসন, গ্রাহকসেবা ও আর্থিক অন্তর্ভুক্তিসহ মোট পাঁচটি ক্ষেত্রে এমডি-সিইওদের কর্মদক্ষতা পরিমাপে জোর দেয়া হয়েছে। মূল্যায়নের ফলাফল তাদের পারিশ্রমিক, প্রণোদনা, পুনর্নিয়োগ, মেয়াদ বৃদ্ধি ও উত্তরসূরি নির্বাচনের সিদ্ধান্তে প্রভাব রাখবে বলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে জানানো হয়েছে। কেপিআই সূচকের কোনোটিতে ৫০ শতাংশের কম নম্বর পেলে তা ‘শূন্য’ বলে বিবেচিত হবে। আর সামগ্রিক স্কোর ১০০-তে কোনো এমডি ৬৫-এর নিচে পেলে তিনি ‘বিলো অ্যাভারেজ’ বা গড় মানের চেয়ে নিম্নমানের বলে বিবেচিত হবেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ-২ গতকাল এ-সংক্রান্ত নীতিমালার প্রজ্ঞাপন জারি করে। দেশের সবক’টি ব্যাংকের চেয়ারম্যানের কাছে প্রজ্ঞাপনের কপি পাঠানো হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা, সুশাসন ও আর্থিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিতের পাশাপাশি আমানতকারী ও ব্যাংকের স্বার্থ সুরক্ষায় এ কাঠামো প্রণয়ন করা হয়েছে। এর আগে ২০২৪ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি এমডি/সিইও নিয়োগ ও পুনর্নিয়োগ বিষয়ে একটি প্রজ্ঞাপন জারি করেছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক। সেখানে খেলাপি ঋণ কমানো এবং অবলোপনকৃত ঋণ আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের নির্দেশনা দেয়া হয়েছিল। নতুন কাঠামোর মাধ্যমে এসব বিষয়কে আরো সুনির্দিষ্ট ও পরিমাপযোগ্য করা হয়েছে।
প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, বিদ্যমান এমডি/সিইওদের ক্ষেত্রে এ কাঠামোয় প্রথম লক্ষ্যমাত্রার সময় হবে ১ অক্টোবর ২০২৬ থেকে ৩১ মার্চ ২০২৭। পরিচালনা পর্ষদকে ছয় মাস অন্তর রোলিং-ফরওয়ার্ড পদ্ধতিতে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করতে হবে। পুরো মেয়াদের জন্য নির্ধারিত কেপিআই কাঠামো বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদনের জন্য পাঠাতে হবে এবং প্রতিটি মূল্যায়ন শেষে ১৫ দিনের মধ্যে পর্যালোচনা প্রতিবেদন জমা দিতে হবে।
যদিও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জারীকৃত নতুন কেপিআই ফ্রেমওয়ার্কের বিষয়ে ব্যাংক নির্বাহীদের অনেকে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। তারা বলছেন, জারীকৃত প্রজ্ঞাপনটি ব্যাংক এমডিদের জন্য ‘অপমানজনক’। ঋণ অনুমোদন থেকে শুরু করে কর্মকর্তাদের নিয়োগ-পদোন্নতিতে অনেক ব্যাংকের এমডি স্বাধীন নন। এক্ষেত্রে পরিচালনা পর্ষদ ও কোনো কোনো ক্ষেত্রে চেয়ারম্যানই সর্বেসর্বা। এমন বাস্তবতায় শুধু এমডিদের কর্মদক্ষতা মূল্যায়ন করতে গেলে দুর্বল ব্যাংকগুলো এমডিই খুঁজে পাবে না।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিমালার বিষয়ে মতামত জানতে বণিক বার্তার পক্ষ থেকে দেশের অন্তত ছয়টি বেসরকারি ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। তাদের প্রায় প্রত্যেকেই এ বিষয়ে নিজেদের ক্ষোভের কথা জানিয়েছেন। তবে তারা নাম উদ্ধৃত করে বক্তব্য দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন।
কেপিআই নীতিমালার বিষয়ে একটি ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহীর বক্তব্য এমন—বিশ্বের কোনো দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকই এভাবে এমডিদের কেপিআই মূল্যায়ন কিংবা নিয়োগ ও বেতন-ভাতা নির্ধারণের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকে না। কোনো এমডি অনিয়ম-দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত হলে কিংবা ব্যাংক পরিচালনায় ব্যর্থ হলে তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়ার অধিকার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রয়েছে। কিন্তু এভাবে কেপিআই মূল্যায়ন করা হলে এমডি পদে নিয়োগ পেতে কিংবা টিকে থাকতেও অনৈতিক উপায়ের আশ্রয় নিতে হতে পারে। অনিয়ম-দুর্নীতির কারণে যে ব্যাংকগুলো এখন দুর্বল হিসেবে পরিচিতি পাচ্ছে, সেগুলোর ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের যথাযথ নজরদারি ছিল না। অনেক ক্ষেত্রে সেসব ব্যাংকের অর্থ লোপাটে তাদের অনেক কর্মকর্তার সহযোগিতাও ছিল। এমন পরিস্থিতিতে আগে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের পেশাদার হওয়া দরকার।
জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘কেউ কেউ সংক্ষুব্ধ হতেই পারেন। আমরা সামগ্রিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে কেপিআই নীতিমালাটি জারি করেছি। এটি ঠিক, দুর্বল ব্যাংকের এমডিদের পক্ষে কেপিআইয়ের সব শর্ত এখনই পূরণ করা সম্ভব হবে না। এক্ষেত্রে যে ব্যাংক যে পরিস্থিতিতে রয়েছে, সেখান থেকে যাতে আর অবনমন না হয়, সেটিই নিশ্চিত করা হবে।’
কেপিআইয়ের মূল্যায়নটি কে করবে—এ প্রশ্নের জবাবে আরিফ হোসেন খান জানান, নিজ নিজ ব্যাংকের পর্ষদ এমডির কেপিআই মূল্যায়ন রিপোর্ট কেন্দ্রীয় ব্যাংকে পাঠাবে। আমাদের সংশ্লিষ্ট বিভাগ সেগুলো নিরীক্ষা করে দেখবে। ত্রুটিপূর্ণ বা জালিয়াতি হলে পর্ষদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, যদি মূল্যায়নে কোনো শীর্ষ নির্বাহীর পারফরম্যান্স ধারাবাহিকভাবে খারাপ দেখা যায়, তাহলে তার মেয়াদ নাও বাড়তে হতে পারে। আবার খারাপ পারফরম্যান্সের কারণে তাকে অপসারণে পরিচালনা পর্ষদকে নির্দেশ দেয়া হতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের জারীকৃত কেপিআই ফ্রেমওয়ার্কে এমডিদের কর্মদক্ষতা মূল্যায়নের জন্য মোট পাঁচটি ক্ষেত্র নির্দিষ্ট করে দেয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে মূল্যায়নের সামগ্রিক স্কোর বা নম্বর হবে ১০০। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ২৫ শতাংশ করে নম্বর রাখা হয়েছে ব্যাংকের ‘সলভেন্সি অ্যান্ড লিকুইডিটি’ ও ‘অ্যাসেট কোয়ালিটি’তে। সলভেন্সি অ্যান্ড লিকুইডিটি পরিস্থিতি মূল্যায়নের ক্ষেত্রে সিআরএআর, সিইটি-১, অ্যাডজাস্টেড সিআরএআর, এলসিআর, এনএসএফআর ও এডিআর বিবেচনায় নেয়া হবে। আর অ্যাসেট কোয়ালিটি বা সম্পদের গুণগত মান মূল্যায়নের ক্ষেত্রে ব্যাংকের গ্রস ও নিট এনপিএল রেশিও, স্ট্রেসড অ্যাসেটস, প্রভিশন কাভারেজ, বড় ঋণ ও শীর্ষ ২০ ঋণগ্রহীতার কেন্দ্রীভবন এবং শ্রেণীকৃত ও অবলোপনকৃত ঋণ আদায়ের অগ্রগতি পর্যালোচনা হবে।
কেপিআইয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের মুনাফার ওপর রাখা হয়েছে ১০ শতাংশের ভর। এক্ষেত্রে আরওএ, আরওই, এনআইএম, পরিচালন ব্যয়ের তুলনায় পরিচালন মুনাফা, নন-ইন্টারেস্ট ইনকাম ও আমানতের মিশ্রণ বিবেচনা করা হবে। অন্যদিকে সুশাসন ও ইন্টারনাল কন্ট্রোলের জন্য রাখা হয়েছে ২৫ শতাংশ। এতে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন, অডিটে অনিয়ম, এএমএল/সিএফটি কমপ্লায়েন্স, কম্পোজিট রিস্ক রেটিং, রেগুলেটরি রিপোর্টিং, আইসিটি ও টেকনোলজি রিস্ক এবং নেতৃত্বের দক্ষতা মূল্যায়ন করা হবে। অবশিষ্ট ১৫ শতাংশ থাকবে ‘ইনক্লুশন, কাস্টমার অ্যান্ড মার্কেট কন্ডাক্ট’-এর আওতায়। এতে ডিজিটাল লেনদেন, গ্রাহকসেবার মান, সিএমএসএমই ও কৃষি ঋণ, গ্রিন ফাইন্যান্স, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি, নারী হিসাব, গ্রামীণ ঋণ বিতরণ, জালিয়াতি ও আইনি ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা বিবেচনা করা হবে।
মূল্যায়নে কোনো কেপিআইয়ের লক্ষ্যমাত্রা ৫০ শতাংশের কম অর্জন হলে ওই সূচকে কোনো নম্বর পাওয়া যাবে না। আবার গুরুত্বপূর্ণ কেপিআই—এডিআর, গ্রস এনপিএল, নিট এনপিএল, বড় ঋণ ও শীর্ষ ঋণগ্রহীতার কেন্দ্রীভবন, শ্রেণীকৃত ও অবলোপনকৃত ঋণ আদায় এবং সিএমএসএমই, কৃষি, গ্রিন ফাইন্যান্স ও ফাইন্যান্সিয়াল ইনক্লুশন—এর কোনো একটিতে ৫০ শতাংশের কম অর্জন বা শূন্য স্কোর হলে মোট স্কোর থেকে অতিরিক্ত নম্বর কাটা হবে। সামগ্রিক স্কোর ৭৫ বা তার বেশি হলে ‘অ্যাবাভ অ্যাভারেজ’, ৬৫ থেকে ৭৫-এর নিচে হলে ‘অ্যাভারেজ’ ও ৬৫-এর নিচে হলে ‘বিলো অ্যাভারেজ’ হিসেবে মূল্যায়ন করা হবে।
কেপিআই নীতিমালা বিষয়ে জানতে চাইলে ব্যাংক নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান মাসরুর আরেফিন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘কেপিআই ফ্রেমওয়ার্কের বিষয়ে আমার প্রাথমিক মূল্যায়ন ইতিবাচক। ব্যাংকের এমডিদের কর্মদক্ষতা বহুমাত্রিক সূচকে পরিমাপ করার উদ্যোগ সময়োপযোগী। বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে এরই মধ্যে ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি কাঠামো চালু হয়েছে। এ কেপিআই পদ্ধতি সেই বৃহত্তর জবাবদিহিমূলক কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।’
আরো পড়ুন: ব্যাংক এমডিদের কেপিআই নীতিমালা নিয়ে এবিবি চেয়ারম্যান মাসরুর আরেফিনের প্রতিক্রিয়া
সিটি ব্যাংকের দায়িত্বে থাকা এ শীর্ষ নির্বাহী অবশ্য নীতিমালাটি নিয়ে নিজের শঙ্কার কথাও জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘একটা মৌলিক বিষয় মনে রাখা জরুরি। একজন এমডিকে যে ফলাফলের জন্য জবাবদিহি করা হবে, সেই ফলাফল অর্জনের জন্য প্রয়োজনীয় কর্তৃত্বও তার থাকতে হবে। বিশেষ করে সমস্যা আক্রান্ত ব্যাংকের এমডিদের জন্য বিষয়টা তো অনেক সংবেদনশীল। ব্যাংক চালাতে এমডিদের জবাবদিহি বাড়ানো যেমন দরকার, তেমনি পর্ষদের জবাবদিহির বিষয়টাও আমাদের সংস্কৃতিতে অনেক জরুরি।’