বিগত দশকগুলোতে দেশের প্রাপ্তবয়স্কদের হৃদরোগ চিকিৎসায় অভূতপূর্ব উন্নতি হয়েছে। হৃদরোগে অস্ত্রোপচারে সাফল্য অর্জনের পাশাপাশি রোগীদের বিদেশনির্ভরতাও কমেছে। তবে শিশুদের হৃদরোগের চিকিৎসায় অগ্রগতি তুলনামূলক কম। দেশে পেডিয়াট্রিক কার্ডিওলজিস্টের সংকট যেমন রয়েছে, তেমনি চিকিৎসা ব্যয়ও বেশি। কয়েক দফায় প্রাপ্তবয়স্কদের হার্টের স্টেন্টের (রিং) দাম কমালেও শিশুদের ক্ষেত্রে যে ধরনের স্টেন্ট ব্যবহার করা হয় সেটির দাম কমানোর ক্ষেত্রে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। যার কারণে শিশুদের হৃদরোগের চিকিৎসার খরচ তুলনামূলক বেশি। ফলে অনেক শিশু চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত থাকছে।
খাতসংশ্লিষ্টরা জানায়, শিশুদের জন্য যে দেশগুলো স্টেন্ট তৈরি করে তারা বাংলাদেশে রফতানি করতে আগ্রহী না। কারণ বাংলাদেশে এর চাহিদা অনেক কম। দামও তুলনামূলক বেশি হওয়ায় এটি অনেকের নাগালের বাইরে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে অবস্থাসম্পন্ন অভিভাবক তাদের সন্তানের হার্টের চিকিৎসা দেশের বাইরে করে। তবে প্রান্তিক পর্যায়ের পরিবারগুলো তাদের শিশুদের চিকিৎসা ব্যয় বহন করতে পারে না। ফলে অনেক সময় চিকিৎসা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। এতে রোগ আরো জটিল আকার ধারণ করে ও শিশুর সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা কমে যায়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কার্ডিওলজিস্ট বণিক বার্তাকে বলেন, ‘শিশুদের হার্টের গুরুত্বপূর্ণ রক্তনালি, বিশেষ করে করোনারি আর্টারি সংকুচিত বা ব্লক হয়ে গেলে তাদের স্টেন্ট লাগানোর দরকার হয়। সাধারণত জন্মগত ত্রুটি, সার্জারির জটিলতা বা কাওয়াসাকি রোগের কারণে এ সমস্যা হয়। স্টেন্ট রক্তপ্রবাহ স্বাভাবিক রাখতে সাহায্য করে। তবে শিশুদের জন্য যে ধরনের স্টেন্ট ব্যবহার করা হয় তা দেশে সহজলভ্য না। দামও তুলনামূলক বেশি। প্রাপ্তবয়স্কদের হার্টে যে ধরনের স্টেন্ট ব্যবহার করা হয় সেগুলো বিভিন্ন সাইজ ও মডেলের পাওয়া যায়। শিশুর সমস্যার ধরন অনুযায়ী আমরা তুলনামূলক ছোট স্টেন্ট ব্যবহার করে থাকি। তবে এমন রোগীও আছে যাদের অভিভাবক এর ব্যয় বহন করার সামর্থ্য রাখেন না। যাদের আর্থিক অবস্থা ভালো তারা দেশের বাইরে গিয়ে চিকিৎসা করায়। আমাদের কাছে এমন অনেক অভিভাবক আসেন যারা সন্তানের চিকিৎসা করানোর জন্য সম্পদও বিক্রি করে দেন।’
দেশে হৃদরোগে আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। শিশু হৃদরোগ নিয়ে কাজ করা দাতব্য সংস্থা কিডস হার্ট ফাউন্ডেশনের তথ্যানুসারে, দেশে প্রতিদিন প্রায় আট হাজার শিশু জন্ম নেয়। তাদের মধ্যে অন্তত ২০০টি শিশু হৃদরোগ নিয়ে জন্মাচ্ছে। অর্থাৎ বছরে হৃদরোগ নিয়ে জন্মগ্রহণ করা শিশুর সংখ্যা প্রায় ৭৩ হাজার। বর্তমানে দেশে হৃদরোগে আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা প্রায় পাঁচ লাখ।
গত ৩০ নভেম্বর প্রকাশিত বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হেলথ অ্যান্ড মরবিডিটি স্ট্যাটাস সার্ভে (এইচএমএসএস) ২০২৫-এর প্রতিবেদন অনুসারে, শূন্য থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশু হৃদরোগীর সংখ্যা শহরের তুলনায় গ্রামে বেশি। এক বছরের কম বয়সী প্রতি এক হাজার হৃদরোগীর মধ্যে ২৩৮ শিশু শহরে এবং ২২৬ শিশুর গ্রামে বাস। এক থেকে চার বছরের মধ্যে গ্রামে হাজারে ১৬৬ জন হৃদরোগসহ অন্যান্য রোগে আক্রান্ত, যা শহরে হাজারে ১৫৯ জন। প্রতিবেদনে বলা হয়, জরিপের আগের ৯০ দিনে হাজারে একজন শিশু হৃদরোগ নিয়ে জন্ম নিয়েছে।
চলতি বছর একটিমাত্র প্রতিষ্ঠান শিশুদের হৃদরোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত সরঞ্জামাদি আমদানির জন্য নিবন্ধিত হয়। সেটি হলো ‘রহমান মেডিকেল সার্ভিস’। প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী মো. মিজানুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘শিশুদের জন্য সুনির্দিষ্টভাবে যে ধরনের স্টেন্ট ব্যবহার করা হয়, সেগুলোর চাহিদা বাংলাদেশে অনেক কম। বছরে ৮-১০টি আমদানি করার প্রয়োজন হয়। এত কমসংখ্যক স্টেন্টের জন্য রফতানিকারকরা আমাদের দেশে ডিলার নিয়োগ করতে চায় না। আর দাম বেশি হওয়ায় ব্যবসায়ীরা ঝুঁকি নিয়ে আনতেও চান না। আমাদের এখানে মার্কেট সাইজ অনেক ছোট। আমরা অন্যান্য পণ্য আমদানি করার সময় কয়েকটা স্টেন্টও কিনে আনি। আবার অনেক সময় ভারত থেকেও আনা লাগে। কারণ সেখানকার মার্কেট সাইজ বড়। সেখানে বাইরের কোম্পানিগুলো ডিলার নিয়োগ করে। চাহিদা বেশি থাকায় চিকিৎসা ব্যয়ও সেই দেশে কম।’
প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য তিনটি কোম্পানির করোনারি স্টেন্ট দেশে আমদানি করা হয়। কোম্পানিগুলো হলো মেডট্রোনিক, বোস্টন সায়েন্টিফিক ও অ্যাবোট। চলতি বছরের ১ অক্টোবর সরকার এসব কোম্পানির ১০ ধরনের স্টেন্টের দাম কমায়। এর মধ্যে মেডট্রোনিকের স্টেন্টের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো হয়েছে। তাদের রিজলিউট অনিক্স স্টেন্টের দাম ১ লাখ ৪০ হাজার ৫০০ টাকা থেকে কমিয়ে ৯০ হাজার ও অনিক্স ট্রুকরের দাম ৭২ হাজার থেকে কমিয়ে ৫০ হাজার টাকা করা হয়। বস্টন সায়েন্টিফিকের প্রোমাস এলিট এখন ৭৯ হাজারের বদলে ৭২ হাজার, প্রোমাস প্রিমিয়ার ৭৩ হাজারের বদলে ৭০ হাজার, সিনার্জি ১ লাখ ১৭ হাজার থেকে ৯০ হাজার, সিনার্জি শিল্ড ১ লাখ ২০ হাজার থেকে ৯০ হাজার ও সিনার্জি এক্সডির দাম ১ লাখ ৮৮ হাজার থেকে কমিয়ে ১ লাখ টাকা করা হয়েছে। আর অ্যাবটের জায়েন্স প্রাইম ৬৬ হাজার ৬০০ টাকা থেকে কমিয়ে ৫০ হাজার টাকা করা হয়েছে। একই কোম্পানির জায়েন্স আলপাইন ১ লাখ ৪০ হাজার ৫০০ ও জায়েন্স সিয়েরা ১ লাখ ৪০ হাজার টাকা থেকে কমিয়ে ৯০ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের পরিচালক ড. মো. আকতার হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘শিশুদের জন্য আলাদা করে কেউ সেভাবে হার্টের স্টেন্ট বা রিং আমদানি করে না। কারণ এগুলো দাম বেশি, যা বেশির ভাগ রোগীর অভিভাবকের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে। তবে শিশুদের স্টেন্ট আমদানির জন্য চলতি বছর একটি কোম্পানি নিবন্ধিত হয়েছে। দাম এখনো নির্ধারণ করা না হলেও আমরা ধারণা করছি ৪-৫ লাখ টাকার মতো খরচ হবে। এত টাকা দিয়ে চিকিৎসা করার সামর্থ্য তো সবার নেই। তবে আমদানিকারকরা যদি চায়, শিশুদের হৃদরোগ চিকিৎসার অন্যান্য সরঞ্জাম আমদানিতে অবশ্যই অধিদপ্তর সব ধরনের সহযোগিতা করবে।’