দেশের একমাত্র পূর্ণাঙ্গ আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (জাবি)। শিক্ষার্থীদের আবাসন সংকট নিরসনে অধিকতর উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় নির্মাণ করা হয়েছে ছয়টি আবাসিক হল। এর মধ্যে তিনটি ছাত্র ও তিনটি ছাত্রীদের জন্য। প্রায় ৪৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এসব হলের মধ্যে ছাত্র হলগুলোয় সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ করা হলেও উদ্বোধনের চার বছর পরও ছাত্রীদের তিন হলের স্থায়ী সীমানাপ্রাচীর হয়নি। এতে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন শিক্ষার্থীরা।
ছাত্রীদের হল তিনটি হলো ফজিলাতুন্নেছা হল, বেগম রোকেয়া হল ও বীর প্রতীক তারামন বিবি হল। কাজ শেষে শিক্ষার্থীদের হলগুলোয় ওঠানোর সময় থেকে শুরু করে এখনো সীমানায় রয়েছে অস্থায়ী টিনের বেড়া। দীর্ঘদিন ব্যবহারে এসব বেড়ার বিভিন্ন অংশে মরিচা ধরেছে। কোথাও কোথাও পোস্টার ও লিফলেটে ঢেকে গেছে সীমানা। বাইরে থেকে দেখলে মনে হতে পারে ভবনগুলো এখনো নির্মাণাধীন, যদিও এসব হলে এরই মধ্যে প্রায় তিন হাজার শিক্ষার্থী থাকছেন। বিপরীতে একই প্রকল্পের আওতায় নির্মিত শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ও নবাব সলিমুল্লাহ হলে স্থায়ী সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ করা হয়েছে।
জানা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকতর উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় ছয়টি আবাসিক হল নির্মাণের পরিকল্পনা নেয়া হয় ২০১৮ সালে। ২০১৯ সালে শুরু হয় নির্মাণকাজ। ২০২২ সালে ছয়টি হলের নির্মাণকাজ শেষ হয় এবং ২০২৩ সালে শিক্ষার্থীদের জন্য খুলে দেয়া হয়। প্রকল্পের বিল অব কোয়ান্টিটিজের তথ্যমতে, নতুন ছয় হলে ১ দশমিক ৮০ মিটার উচ্চতার আরসিসি বাউন্ডারি ওয়াল ও দেয়ালের ওপর বারবেড ওয়্যার ফেন্সিং নির্মাণের উল্লেখ রয়েছে। সেখানে কাজের পরিমাণ ১ হাজার ৫০০ রানিং মিটার। প্রতি মিটার আরসিসি ওয়ালের জন্য ১১ হাজার ৫২০ টাকা এবং বারবেড ওয়্যার ফেন্সিংয়ের মোট ১২ হাজার ৪৮৬ টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে। সে হিসাবে প্রতিটি হলে মোট ব্যয় দাঁড়ায় ১ কোটি ৮৭ লাখ ২৯ হাজার টাকা। তিনটি হলের জন্য বাজেট ৫ কোটি ৬১ লাখ ৮৭ হাজার টাকা।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, সীমানাপ্রাচীর নির্মাণের জন্য বরাদ্দ থাকার পরও ছাত্রী হলগুলোয় কাজ হয়নি। একই প্রকল্পে ছাত্র হলের প্রাচীর নির্মাণ করা সম্ভব হলেও ছাত্রী হলের ক্ষেত্রে কেন তা আটকে আছে তারও স্পষ্ট ব্যাখ্যা নেই। ছাত্রীদের অভিযোগ, স্থায়ী সীমানাপ্রাচীর না থাকায় হলের নিরাপত্তা ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। কয়েকশ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত আধুনিক আবাসিক হলের সামনে বছরের পর বছর অস্থায়ী টিনের বেড়া থাকাকে তারা প্রকল্পের অসম্পূর্ণতা হিসেবে দেখছেন। দ্রুত স্থায়ী সীমানাপ্রাচীর নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন তারা।
প্রাচীর নির্মাণের বিষয়ে প্রকল্প পরিচালক নাসির উদ্দিন বলেন, ‘রাস্তা সম্প্রসারণ ও ফুটপাত নির্মাণের আগে হলের সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ সম্ভব নয়। রাস্তার কাজ সম্পূর্ণ হওয়ার পর প্রাচীর নির্মাণের কাজ শুরু হবে।’
অন্যদিকে হল তিনটির শিক্ষার্থীরা দ্রুত প্রাচীর নির্মাণের দাবি জানিয়ে আসছেন। বেগম রোকেয়া হলের আবাসিক শিক্ষার্থী অনুশ্রী রায় বলেন, ‘কয়েকশ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত আধুনিক নারী হলগুলোর সামনে দীর্ঘদিন ধরে জরাজীর্ণ টিনের বেড়া থাকা অত্যন্ত দুঃখজনক। এটি শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের সৌন্দর্য নষ্ট করছে না, নারী শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন তুলছে। প্রায় তিন হাজার শিক্ষার্থীর আবাসস্থলে এমন অস্থায়ী ব্যবস্থা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। দ্রুত স্থায়ী ও মানসম্মত সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ করে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি।’
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেজারার অধ্যাপক সোহেল রানা বলেন, ‘বিষয়টি প্রকল্প অফিসের অধীনে। তারা ধারাবাহিকভাবে এগোচ্ছে হয়তো। আমি দায়িত্বে আসার পর এ কাজের কোনো ফাইল আমার কাছে আসেনি। বিষয়টি সম্পর্কে আমি এখনো জানি না।’ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কাজের ছাড়পত্র দেয়া হয়েছে কিনা, এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এখনো কোনো ছাড়পত্র দেয়া হয়নি।’
প্রো-ভিসি (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মুহম্মদ নজরুল ইসলাম বলেন, ‘রাস্তা ও ফুটপাত সম্প্রসারণের কাজের কারণে প্রাচীর নির্মাণ সম্ভব হচ্ছে না। রাস্তার কাজ শেষ হলে প্রাচীর নির্মাণের কাজ শুরু হবে।’