নিজের বাড়ি ও পাটের গোডাউনে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের অভিযোগে মামলা করেছিলেন ৬৫ বছর বয়সী নুর জাহান বেগম। কিন্তু তাকেই এক সপ্তাহের মধ্যে আরেকটি মামলায় সন্দেহভাজন আসামি হিসেবে গ্রেফতার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
পরিবারের অভিযোগ, রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) সকালে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থানা পুলিশের সদস্যরা ‘ওসি সাহেব কথা বলবেন’, এমন কথা বলে কুষ্টিয়া সদর উপজেলার পাটিকাবাড়ি ইউনিয়নের নলকুলা গ্রামের বাড়ি থেকে নুর জাহান বেগমকে নিয়ে যান। দিনভর তার পরিবারের সদস্যরা তার অবস্থান ও আটকের কারণ জানতে চেষ্টা করলেও স্পষ্ট কোনো তথ্য পাননি। পরে জানতে পারেন, তাকে নাশকতার একটি মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হয়েছে এবং আদালত তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দিয়েছেন।
এখন স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে, যে নারী নিজেই হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের অভিযোগে আদালতে মামলা করেছিলেন, তাকেই মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে একই ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আরেক মামলায় আসামি করা হলো কীভাবে? একই সঙ্গে ৬৫ বছর বয়সী একজন নারীকে তার বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ না জানিয়ে পুলিশের সঙ্গে নিয়ে যাওয়ার পদ্ধতিও প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
নুর জাহান বেগমের মেয়ে সেলিনা আক্তার শিল্পীর অভিযোগ, সামাজিক ও জমি-সংক্রান্ত বিরোধের জেরে প্রায় দুই সপ্তাহ আগে তাদের বাড়ি এবং পাটের গোডাউনে হামলা, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। পরে স্থানীয় কৃষকদলের কার্যালয়েও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে।
তিনি আরো বলেন, এসব ঘটনার পর নুর জাহান বেগম বাদী হয়ে ২১ সেপ্টেম্বর কুষ্টিয়ার আদালতে মামলা করেন। মামলায় ৬২ জনের নাম উল্লেখ করে আরো ১৫ থেকে ২০ জনকে অজ্ঞাত আসামি করা হয়।
শিল্পী জানান, রোববার সকালে কয়েকজন পুলিশ সদস্য তাদের বাড়িতে এসে মাকে জানান, গোডাউন পোড়ানোর মামলার বিষয়ে ওসি তার সঙ্গে কথা বলবেন। এরপর তাকে পুলিশের গাড়িতে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়।
তার ভাষ্য, মাকে কোথায় নেয়া হচ্ছে বা কেন নেয়া হচ্ছে, শুরুতে আমরা কিছুই বুঝতে পারিনি। পরে জানতে পারি, তাকে আদালতে পাঠানো হয়েছে।
আদালত ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ১৫ সেপ্টেম্বর নলকুলা গ্রামের একটি কৃষকদলের কার্যালয়ে ভাঙচুর এবং সেখানে থাকা ব্যক্তিদের মারধরের অভিযোগে ১৬ সেপ্টেম্বর একটি মামলা করা হয়। কৃষকদল নেতা হাবিবুর রহমান বাদী হয়ে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে করা ওই মামলায় ৭৫ জনের নাম উল্লেখ করেন এবং অজ্ঞাতনামা আরো ১০০ থেকে ১২০ জনকে আসামি করা হয়।
ওই মামলাতেই নুর জাহান বেগমকে সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। রোববার বিকেলে তাকে আদালতে সোপর্দ করা হলে আদালত তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। অর্থাৎ, একদিকে নুর জাহান বেগমের করা মামলায় তার বাড়ি ও গোডাউনে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের অভিযোগ তদন্তের বিষয়টি রয়েছে; অন্যদিকে একই সময়ের অন্য একটি ঘটনার মামলায় তাকেই আসামি করা হয়েছে।
নুর জাহান বেগমের ছেলে আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, পুলিশ তার মাকে বাড়ি থেকে নিয়ে যাওয়ার পর পরিবারের সদস্যরা দীর্ঘ সময় তার কোনো খোঁজ পাননি। থানায় গিয়ে জানতে চাইলে পরে তাদের জানানো হয়, তাকে আদালতে পাঠানো হয়েছে।
পরিবারের প্রশ্ন কোন অভিযোগে তাকে বাড়ি থেকে নিয়ে যাওয়া হলো, কখন তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হলো এবং কেন তাকে প্রথমে তা জানানো হলো না। এসব বিষয়ে তাদের কাছে স্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যা নেই।
নুর জাহান বেগমের পরিবারের পক্ষ থেকে কৃষকদলের স্থানীয় কার্যালয় ভাঙচুরের ঘটনাকে পরবর্তী মামলার সঙ্গে সম্পর্কিত বলে দাবি করা হলেও এ বিষয়ে কৃষকদলের পাটিকাবাড়ি ইউনিয়নের সভাপতি আবদুর রহমানের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। এছাড়া, এ মামলার বাদী হাবিবুর রহমানের সঙ্গেও যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তার বাসায় গিয়ে তাকে পাওয়া যায়নি।
এ দিকে, থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এসএম মামুনুর রশিদ দাবি করেন, ঘটনার তদন্তে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা নুরজাহান বেগমের সম্পৃক্ততা পেয়েছেন। সেজন্য তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। সস্ত্রাস বিরোধী আইনে করা ওই মামলার আসামি হিসেবে আদালতের মাধ্যমে তাকে করাগারে পাঠানো হয়েছে।
বয়োবৃদ্ধ ওই নারী কৃষকদলের অফিস ভাঙচুরের ঘটনায় কীভাবে সম্পৃক্ত থাকতে পারেন এ প্রশ্নের জবাবে ওসি বলেন, উনি আসামিদের কৃষকদলের অফিস ভাঙচুর করতে জিনিসপত্র জোগান দিয়ে সহযোগিতা করেছেন।