ব্যবসার পরিবেশ সহজ হলে উদ্যোক্তারাও এগিয়ে আসবেন

—মোস্তফা কামাল

চেয়ারম্যান ও এমডি, মেঘনা গ্রুপ

সরকার সব সময় বলে ব্যবসা-বাণিজ্য সহজ করবে, সময় কমাবে, সেবা সহজীকরণ করবে। কিন্তু আমরা বহু বছর ধরে ভিন্ন অভিজ্ঞতা পাচ্ছি।

একজন সচিব এসে বলেন, আগে ১৫০টি ধাপ ছিল, সেটি কমিয়ে ৭০টি করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে আমরা দেখছি, তিতাসসহ জ্বালানি খাতের বিভিন্ন কোম্পানি এবং সরকারি দপ্তরে ব্যবসা পরিচালনা সহজ হওয়ার পরিবর্তে দিন দিন আরো কঠিন হয়ে যাচ্ছে।

আমি নিজে এমন সমস্যার ভুক্তভোগী। আমার মতো আরো অনেক শিল্পপতি বছরের পর বছর টাকা জমা দিয়ে বসে আছেন। আমি ২০১৯ সালে গ্যাস সংযোগের জন্য টাকা জমা দিয়েছি। তখনকার দায়িত্বশীলরা বলেছিলেন, যারা টাকা জমা দেবেন, তাদের সংযোগ দেয়া হবে। অনেকের কাছ থেকেই টাকা নেয়া হয়েছে। আমার কাছ থেকেও নেয়া হয়েছে। কিন্তু আজও আমি সেই সংযোগ পাইনি। আমার প্রায় ১৪০ কোটি টাকা এখনো জমা পড়ে আছে।

এবার কুমিল্লা ইকোনমিক জোনের কথা বলি। এটা শুধু আমার ব্যক্তিগত সমস্যা নয়, আরো অনেক উদ্যোক্তার একই অবস্থা। আমরা ইউরোপ, বিশেষ করে ইতালি থেকে যন্ত্রপাতি এনেছি। একটি গ্লাস ফ্যাক্টরি, একটি স্টিল ফ্যাক্টরি এবং আরো কয়েকটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছি। কিছু প্রতিষ্ঠানে হয়তো গ্যাসের প্রয়োজন নেই, কিন্তু যেগুলোতে প্রয়োজন, সেখানে আমরা এখনো গ্যাস পাচ্ছি না।

বেজা আমাদের বলেছিল, তারা গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি, রাস্তা—সব ধরনের অবকাঠামোগত সেবা নিশ্চিত করবে। আমাদের কাজ হবে শুধু শিল্প স্থাপন করা। বিদেশী বিনিয়োগকারীদেরও একই প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল।

আমার মেঘনা ইন্ডাস্ট্রি ইকোনমিক জোনে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, চীনসহ ১৫টি বিদেশী কোম্পানি বিনিয়োগ করেছে। এসব প্রতিষ্ঠানে প্রায় ১২ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। যদিও সব বিনিয়োগ এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়ন হয়নি, তারপরও এটি দেশের জন্য একটি বড় অর্জন।

আমি আইএফসি, ওয়ার্ল্ড ব্যাংক, ইতালির সাসসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠান থেকে প্রায় ৬০০ মিলিয়ন ডলার ঋণ নিয়েছি।

গত মাসের ২০ তারিখে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে একটি বৈঠকে যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল। সেখানে পররাষ্ট্রমন্ত্রী, অর্থমন্ত্রী, বাণিজ্যমন্ত্রী, বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরসহ অনেকেই উপস্থিত ছিলেন। সেখানে চারটি স্টিল মিল নিয়ে আলোচনা হচ্ছিল। সেই সুযোগে আমি আমার সমস্যার কথাও তুলে ধরি।

আমি বলেছি, আমার অবস্থা প্রায় দেউলিয়া হওয়ার পথে। যদি দেশীয় ব্যাংকের ঋণ হতো, তাহলে সরকারের কাছে সময় বাড়ানোর আবেদন করতে পারতাম। পাঁচ বছরের জায়গায় ১০ বছর চাইতে পারতাম। কিন্তু এখানে আইএফসি, ওয়ার্ল্ড ব্যাংক বা অন্যান্য আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের ঋণ। সেখানে সেই সুযোগ নেই।

আমার ৫৭টি শিল্পপ্রতিষ্ঠানে প্রায় ৬৫ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। একটি বড় প্রকল্প বন্ধ হয়ে গেলে তার প্রভাব অন্য প্রকল্পগুলোর ওপরও পড়বে। জ্বালানি সংযোগ পাওয়ার পরও ট্রায়াল রান করতে হবে, যার জন্যও বড় অংকের ব্যয় হবে। অথচ বিদেশী প্রযুক্তিবিদদের সময়সীমা এরই মধ্যে ১৮ মাস পার হয়ে গেছে। আমি তাদের আর ধরে রাখতে পারছি না।

এটাই আমাদের বাস্তব চিত্র। সবাই বলে—শিল্প করুন, ব্যবসা করুন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করুন। কিন্তু বাস্তবে কীভাবে করব?

আমরা বিদেশী বিনিয়োগকারীদের নানা প্রতিশ্রুতি দিয়ে দেশে নিয়ে আসি। কিন্তু তারা বাস্তব পরিস্থিতি দেখে আমাদেরই প্রশ্ন করে। এগুলো তো আর লুকিয়ে রাখা যায় না। তারা আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম পড়ে, বাংলাদেশের খবরও জানে।

বর্তমানে আমরা প্রতি মাসে প্রায় দেড় লাখ টন চিনি বাজারে সরবরাহ করছি। দেশের অন্য অনেক চিনিকল বন্ধ থাকায় আমাদের উৎপাদনই বেশি চলছে। তারপরও দেশের কোথাও কোনো মুদি দোকানে সমস্যা পাওয়া গেলে দায় এসে পড়ে আমাদের ওপর। আমাদের সমস্যার শেষ নেই। এখন মনে হয়, শরীরের সব জায়গায় একসঙ্গে ব্যথা। কোথায় ওষুধ দেব, বুঝে উঠতে পারি না।

উদ্যোক্তারা যে মন্ত্রণালয়েই যান, সেখানেই নতুন নতুন জটিলতার মুখোমুখি হন। অনেক সময় মনে হয়, প্রতিটি সংস্থা শুধু নিজেদের দক্ষতা দেখানোর প্রতিযোগিতায় নেমেছে।

সবশেষে সরকারের কাছে, নীতিনির্ধারকদের কাছে আমার একটি অনুরোধ। আমাদের মতো বড় উদ্যোক্তারা অন্তত সচিব বা মন্ত্রীদের সঙ্গে দেখা করার কিছু সুযোগ পাই। কিন্তু নতুন যে তরুণ উদ্যোক্তারা আসছেন, তাদের তো সেই সুযোগও নেই। তারা কীভাবে নিজেদের সমস্যার কথা তুলে ধরবেন?

আমরা সবাই ডুয়িং বিজনেস, ব্যবসা সহজীকরণ—এসব নিয়ে অনেক কথা বলি। বলা হয়, অনেক সংস্কার হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে কিছুই বদলায়নি। বরং দিন দিন ব্যবসা পরিচালনা আরো কঠিন হয়ে যাচ্ছে। এ দুর্ভোগ থেকে কীভাবে মুক্তি মিলবে, সেটি নিয়েই আমি নিজেও হতাশ।

অনেক সময় পরিবার বা পরিচিতজন আমাকে বলেন,”এত বাধা-বিপত্তির পরও কীভাবে একের পর এক শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে যাচ্ছ?”

আমি শুধু চাই, ব্যবসা করার পরিবেশটা সত্যিকার অর্থে সহজ হোক। তাহলে উদ্যোক্তারাও এগিয়ে আসবেন, বিনিয়োগ বাড়বে, কর্মসংস্থানও সৃষ্টি হবে।

আরও