আমলাতান্ত্রিক জটিলতাই ব্যবসা করার ক্ষেত্রে প্রথম ও প্রধান সমস্যা

দেশের প্রথম দিককার লিড সনদপ্রাপ্ত পোশাক কারখানা প্লামি ফ্যাশনসের প্রতিষ্ঠাতা ফজলুল হক। গত ২ আগস্ট এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসকের দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতা, শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা, বিনিয়োগ, ব্যাংকিং, জ্বালানি ও ব্যবসার পরিবেশ নিয়ে বণিক বার্তার অন্তর্দৃষ্টিতে কথা বলেছেন তিনি

বাংলাদেশে ব্যবসার ক্ষেত্রে এখন সবচেয়ে বড় বাধা কী?

সবচেয়ে বড় সমস্যাটা বের করা আসলেই মুশকিল। নির্দিষ্ট করে একটির কথা বলা কঠিন, কারণ যখন যে সংকট আসে, সেটিকেই বড় মনে হয়। তবে এ মুহূর্তে বড় সংকটের কথা বললে জ্বালানি আসবে, এরপর হয়তো ব্যাংক খাত। কিন্তু ব্যবসার শুরু থেকে এখন পর্যন্ত যে সমস্যাটি রয়ে গেছে, সেটি হলো আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও দীর্ঘসূত্রতা। জন্ম থেকেই জ্বলছি, বাকি জীবনও জ্বলতে হবে—ব্যাপারটা অনেকটা এ রকম।

বাংলাদেশে আমরা অনেক প্রতিকূলতার মধ্যেই ব্যবসা-বাণিজ্য করি। শুধু আমি নই, সবাইকেই করতে হয়। আমাদের অবকাঠামোও দীর্ঘদিন দুর্বল ছিল। আমরা যখন ব্যবসা শুরু করি, তখন একটি টেলিফোন বা ফ্যাক্স লাইন পাওয়াও ছিল চরম দুঃসাধ্য। এত প্রতিকূলতার পরও ব্যবসায়ীরা কাজ চালিয়ে গেছেন। কিন্তু আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতা ও জটিলতা এখনো রয়ে গেছে। আমার কাছে এটি সর্বকালীন সমস্যা। তাই সাময়িক বড় সংকটগুলোর বাইরে চিন্তা করলে আমলাতান্ত্রিক জটিলতাই ব্যবসা করার ক্ষেত্রে ১ নম্বর স্থায়ী বাধা।

এ সমস্যা থেকে বেরিয়ে আসতে পারব না?

এটা খুব মুশকিল। বর্তমান সরকার ব্যবসা সহজীকরণ এবং নিয়ন্ত্রণমুক্তকরণে গুরুত্ব দিচ্ছে। এখানে আসার আগে আমরা অর্থ উপদেষ্টার সঙ্গে একটা অনানুষ্ঠানিক বৈঠকে ছিলাম। উনিও বলছিলেন, যেকোনো সমস্যা আছে তাকে জানালে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সমাধান দেবেন। কিন্তু মূল বিষয় হলো উপদেষ্টা পর্যায়ের ব্যক্তিদের সঙ্গে হয়তো আমার বা অন্য বড় ব্যবসায়ীদের যোগাযোগ আছে। ফোন করলে হয়তো তিনি দু-একদিন সমাধান করে দেবেন, কিন্তু এভাবে কতবার সম্ভব?

এটি তো কোনো প্রাতিষ্ঠানিক বা আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থা হতে পারে না?

একদমই নয়। প্রাতিষ্ঠানিক সুবিধা এভাবে ব্যক্তিভিত্তিক ফোনে হতে পারে না। ব্যাংক বা এনবিআরের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্ক থাকলে দু-একদিন হয়তো ছোটখাটো সমস্যার সমাধান পাওয়া যায়, কিন্তু বারবার ফোন করা সম্ভব নয়। এবারের বাজেটে ব্যবসা সহজীকরণ ও নিয়ন্ত্রণমুক্ত করার কথা বেশ গুরুত্ব দিয়ে বলা হয়েছে। সরকারের নীতিনির্ধারকরাও বিভিন্ন জায়গায় এটি জোরালোভাবে বলছেন এবং তদারকির জন্য টাস্কফোর্সও করা হয়েছে। তবে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মানসিকতার পরিবর্তন না হলে শুধু টাস্কফোর্স দিয়ে কাঙ্ক্ষিত সেবা পাওয়া অসম্ভব। ব্যবসায়ীদের কাজ বা নথিপত্রে যদি অনিয়ম থাকে, তবে তা দ্রুত জানিয়ে দিলেই হয়। কিন্তু আমার সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা রয়েছে—গত মাসেই একটি কারখানা পরিদর্শনের ফাইল কেবল প্রক্রিয়া শুরু হতেই ৩২ দিন সময় লেগেছে। অনুমোদন করল না অননুমোদন হলো, ওটা আমি বলছি না। কাজ শুরু হতেই এক মাসের বেশি চলে গেছে। এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, অহরহই এমনটা ঘটছে।

অবশ্য অভিযোগ সমাধানের জন্য সরকারের টাস্কফোর্স গঠনের উদ্যোগটিকে আমরা সাধুবাদ জানাই। তবে আমলাতান্ত্রিক হয়রানি বন্ধে রাজনৈতিক নেতৃত্বের আরো কঠোর হওয়া প্রয়োজন। সাধারণ ব্যবসায়ীরা প্রায়ই আতঙ্ক ও বিব্রতবোধ থেকে প্রতিবাদ করতে পারেন না। প্রতিবাদ করলে পরবর্তী সময়ে আরো বেশি হয়রানির শিকার হওয়ার ভয় থাকে। কাগজে-কলমে সাধারণ ব্যবসায়ীদের অভিযোগ দেয়ার সুযোগ থাকলেও বাস্তব অর্থে তাদের পক্ষে এ পথ নেয়া মোটেও সহজ নয়।

আপনি গ্যাসের কথা বলছিলেন। গ্যাস সংকটে উৎপাদন কমলেও শ্রম বা ঋণের মতো ব্যয় কমেনি। এমন পরিস্থিতিতে উদ্যোক্তারা কী করছেন?

কারখানা সাময়িকভাবে বন্ধ রেখে কিছু খরচ কমানো সম্ভব হলেও শ্রমিকের বেতন আর ব্যাংকের সুদের চাকা থামানো যায় না। এর মধ্যে আবার গ্যাসের বিল অপরিবর্তিত থাকে। যেমন পুরো আগস্ট মাসজুড়ে তীব্র গ্যাস সংকট ছিল, কিন্তু সেপ্টেম্বরে যখন আগস্টের বিল আসবে, তখন দেখবেন অন্যান্য স্বাভাবিক মাসের মতোই গড় বিল এসেছে। অনেক সময় কম গ্যাসের চাপে লাইনে বাতাস ঢোকে এবং বিলে কোনো তফাত হয় না। এটি উদ্যোক্তাদের জন্য ‘বোঝার ওপর শাকের আঁটি’। বিদ্যুতের ক্ষেত্রটি কিছুটা আলাদা; আলো-বাতাস না থাকলে বিল তুলনামূলক কমই আসে।

মাসিক কিস্তি ও বেতন পরিশোধের প্রধান চাপটি মাসের প্রথম দিকেই সামলাতে হয়। যেমন আগামী ৭-৮ তারিখের মধ্যে শ্রমিকের বেতন এবং ১৫-২০ তারিখের মধ্যে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের বিল মেটাতে হবে। উৎপাদন বন্ধ থাকলেও এ ব্যয়গুলো এড়ানোর সুযোগ নেই। সংকটকালীন পরিস্থিতিতে সরকারের সদিচ্ছা দেখানো উচিত। আগস্টে কোন শিল্পে ঠিক কত শতাংশ গ্যাস সরবরাহ করা হয়েছে, তার হিসাব সরকারের কাছে আছে। সেই অনুপাতে যদি বিল নেয়া হয়, তবে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীরা কিছুটা স্বস্তি পাবেন। ব্যবসায়ীরা মনে করবেন সরকার ভুক্তভোগীদের পাশে আছে।

গ্যাসের চাপ না থাকলেও বাতাসের বিলে পরিশোধ করার এই অভিযোগ তো অনেকদিনের?

হ্যাঁ, দীর্ঘদিনের। তবে এবারের মতো তীব্র সংকট আগে কখনো হয়নি। আগে সংকটটি এলাকাভিত্তিক ছিল। এক জায়গায় না থাকলেও অন্য জায়গায় থাকত। এবার পুরো দেশেই সংকট ছড়িয়ে পড়েছে। গ্যাস না থাকায় শুধুই গ্যাসের বিলে ক্ষতি নয়, উৎপাদনের গতিও পুরোপুরি থেমে গেছে। বিশেষ করে টেক্সটাইল ডায়িং বা সিরামিকের মতো কারখানাগুলোতে একটানা ১০ ঘণ্টা প্রক্রিয়াকরণ চালাতে হয়; মাঝে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হলে পুরো ব্যাচের পণ্যের গুণমান নষ্ট হয়ে যায়। এ ক্ষতি অপূরণীয়। অন্তত তিতাসসহ অন্যান্য গ্যাস সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর উচিত প্রকৃত ব্যবহৃত গ্যাসের বিল নেয়া। বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ বিল পরিশোধের সময়সীমা বাড়ানোর দাবি জানিয়েছে, কারণ আগস্টে কারখানাগুলোর কাঙ্ক্ষিত আয় হয়নি। পাশাপাশি ব্যাংক ঋণের ত্রৈমাসিক কিস্তি পরিশোধের সময়ও পিছিয়ে দেয়া প্রয়োজন।

আমার মনে হয় বন্ধ কারখানা চালু করার যে উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে তা পিছিয়ে দেয়া দরকার। আগে যে কারখানাগুলো চালু আছে, যারা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে, নিশ্চিত করতে হবে সেগুলো যেন বন্ধ না হয়। সেগুলো যদি বন্ধ হয়ে যায়, আপনি আবার বন্ধ কারখানা চালু করলেন, লাভের লাভ কিছুই হলো না। আবার বন্ধ কারখানা চালু করলেই সেই কারখানাটা যে আবার স্বাভাবিকভাবে চলতে পারবে, সেটাও কিন্তু খুব বড় একটা প্রশ্নবোধক চিহ্ন এখানে আছে।

যে কারখানাগুলো চালু আছে, সেগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস-বিদ্যুৎ কীভাবে দেয়া যায়, বিদ্যুৎ উৎপাদন কীভাবে বাড়ানো যায়, গ্যাসের সরবরাহ কীভাবে বাড়ানো যায়, কোনো কোনো খাতকে অগ্রাধিকার দিয়ে রেশনিং করা যায় কিনা—এ বিষয়ে জরুরি পরিকল্পনা থাকা দরকার।

সবুজ কারখানা তৈরিতে খরচ বেশি হলেও আন্তর্জাতিক ক্রেতারা পণ্যের বাড়তি দাম দেয় না। কিন্তু বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে এর একটি প্রয়োজনীয়তাও আছে। সামগ্রিকভাবে সবুজ শিল্পের যৌক্তিকতা কীভাবে দেখেন?

যৌক্তিকতা অনেক রয়েছে। আমরা ছিলাম সবুজ কারখানার অগ্রদূত। বাংলাদেশে যখন প্রথম দিককার সবুজ কারখানা করা শুরু হয়, তখন ক্রেতাদের তরফ থেকে কোনো ধরনের চাপ বা বাধ্যবাধকতা ছিল না। বাংলাদেশে তখন কেউ সবুজ কারখানার কথা চিন্তাও করেনি, কোনো ক্রেতাও চিন্তা করেনি। আমরা রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির পরপরই এ উদ্যোগ নেই। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের যে নেতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি হয়েছিল, তা থেকে বেরিয়ে আসার জন্য নতুন কিছু করার প্রয়োজন ছিল। শ্রীলংকার মাস হোল্ডিংসের পরিবেশবান্ধব কারখানা আমাদের অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিল। সেই উদ্যোগের ধারাবাহিকতায় আজ বাংলাদেশে প্রায় ৩০০টি নিবন্ধিত পরিবেশবান্ধব কারখানা রয়েছে, যা বিশ্বে সর্বোচ্চ। এটি বিশ্ববাজারে আমাদের ব্র্যান্ড ইমেজ পুনর্গঠন এবং কারখানার সামগ্রিক সুরক্ষামান নিশ্চিতে বড় ভূমিকা রেখেছে।

কিন্তু প্রত্যাশিত দাম আমরা পাইনি, দামের কথা তখন চিন্তা করিনি। রানা প্লাজার বিপরীতে কিছু করতে হবে—এ অনুপ্রেরণা ছিল। এরপরও যারা করেছে, তারা ব্যবসা করার জন্যই করেছে। অথবা বলা যায়, আমরাও ক্রেতাদের কাছ থেকে এটা আদায় করতে পারিনি। আমাদেরও হয়তো আর্থিক ব্যর্থতা আছে।

কম শ্রমমূল্যের সুবিধা বাংলাদেশ থেকে ধীরে ধীরে কমছে। আমাদের উৎপাদনশীলতা ও খরচ বিবেচনায় রফতানি শিল্প বিশেষ করে পোশাক শিল্প অন্য কোথাও সরে যাওয়ার কোনো সম্ভাবনা দেখছেন?

নিকট ভবিষ্যতে বাংলাদেশ থেকে শিল্প সরে যাওয়ার মতো কোনো সম্ভাবনা আমি দেখছি না। আমাদের মোট রফতানির প্রায় ৮৪ থেকে ৮৫ শতাংশই পোশাক খাতনির্ভর। বর্তমানে আমরা পোশাক রফতানিতে কঠিন সময় পার করছি, প্রবৃদ্ধি প্রায় শূন্যের কাছাকাছি। তবে যেকোনো ব্যবসায় একটা নির্দিষ্ট সময় পরপর এমন চ্যালেঞ্জ আসাই স্বাভাবিক। এটি নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই।

শিল্প সরবে না ভেবে আত্মতুষ্টির সুযোগ নেই। খরগোশ ও কচ্ছপের গল্পের মতো ঘুমিয়ে পড়লে চলবে না। বিশ্ববাজারে প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলো ভেতরে ভেতরে অনেক শক্তিশালী হয়ে উঠছে। রফতানি পরিসংখ্যানে আমরা হয়তো এখনো এগিয়ে আছি, তবে আগামী দিনে বিশ্ববাজারে টিকে থাকতে আমাদের কঠিন প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হতে হবে।

প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী এফবিসিসিআই প্রশাসক হিসেবে আপনার অন্যতম প্রধান কাজ নির্বাচন আয়োজন করা। অর্থ ও প্রভাবমুক্ত স্বাধীন ব্যবসায়ী সংগঠনের নির্বাচনের কতটুকু সম্ভাবনা দেখছেন?

আমরা একটি অর্থ ও প্রভাবমুক্ত ভালো নির্বাচন উপহার দিতে পারব বলে আশাবাদী। এখন আমরাই পারব কিনা, সে নিশ্চয়তা দিতে পারছি না। আমার মেয়াদকাল চার মাস। আমার হাতে আর তিন মাস সময় আছে। এখন পর্যন্ত নির্বাচনের যে প্রধান নির্দেশিকা, যেটাকে ভিত্তি করে নির্বাচন হবে, বাণিজ্য সংগঠন বিধিমালা, সেই বিধিমালাটা এখন পর্যন্ত চূড়ান্ত হয়নি। এটি চূড়ান্ত হওয়ার পর নির্বাচন ও আপিল বোর্ড গঠন করে তফসিল ঘোষণা করা হবে, যা বাস্তবায়নে অন্তত ৯০ দিন সময় লাগবে। সেই হিসাবে আমার চার মাসের মেয়াদে চূড়ান্ত নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্ভব নাও হতে পারে।

কিন্তু যদি আগামী ১০-১৫ দিনেও বিধিমালা করি, আমরা নিশ্চিত যে নির্বাচনের কাছাকাছি পর্যন্ত দায়িত্বে থাকছি এবং তার আগে নির্বাচন বোর্ড, আপিল বোর্ড গঠন হয়ে যাবে, নির্বাচনী কার্যক্রম শুরু হয়ে যাবে। তখন প্রশাসকেরও বিরাট কোনো ভূমিকা থাকবে না, কারণ নির্বাচন প্রক্রিয়া পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ হবে নির্বাচন কমিশনের মাধ্যমে। তো আমাদের সময়কালে যতটুকু সুযোগ আছে, আমরা আমাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা করব।

কিন্তু প্রয়োজন হলে ব্যবসায়ীদের স্বার্থে সরকারের নীতির বিরুদ্ধেও কি এফবিসিসিআই জোরালো অবস্থান নেবে?

সরকারের অনেক নীতির সঙ্গে আমাদের নীতি নাও মিলতে পারে। আমরা সেটার বিরোধিতা করতে পারি। নীতির বিরোধিতা করা, সরকারের বিরোধিতা করা কিন্তু এক না। আমরা হয়তো মনে করব যে সরকার ভুল করছে। আমরা ভুলটা তুলে ধরব।

সরকারের কোনো নীতি যদি ব্যবসায়ী বা অর্থনীতির স্বার্থবিরোধী হয়, তবে তার বিরুদ্ধে জোরালো অবস্থান নেয়া এবং তা সংশোধনে চাপ দেয়ার ক্ষেত্রে অতীতে এফবিসিসিআইয়ের ভূমিকা নিয়ে বেশ আলোচনা রয়েছে...

অতীতে ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর এমন নিষ্ক্রিয়তার প্রধান কারণ ছিল অতিরিক্ত রাজনৈতিকীকরণ। দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে নীতিভিত্তিক অবস্থান নেয়ার চর্চাটা ধীরে ধীরে কমে গিয়েছিল। একটা বাস্তব উদাহরণ দিই। ২০০৪ সালে বিএনপি সরকারের আমলে আমি যখন প্রথম বিকেএমইএর সভাপতির দায়িত্ব নিই, তার কিছুদিন পরই বেনাপোল দিয়ে সুতা আমদানি বন্ধ করে দেয়া হয়। ব্যবসায়ীদের এবং দেশের অর্থনীতির স্বার্থে আমরা যুক্তি উপস্থাপন করে সরকারি নীতির সরাসরি বিরোধিতা করি। পরবর্তী সময়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে পরিস্থিতি ব্যাখ্যার চেষ্টা করলে তিনি শুরুতে বিষয়টি শুনতে চাননি। কিন্তু আমরা হাল ছাড়িনি; বিনীতভাবে যুক্তিনির্ভর বক্তব্য তুলে ধরি। উনি আমাদের যৌক্তিক অবস্থান বুঝতে পারেন এবং পরবর্তী সময়ে নিজেই বেনাপোল দিয়ে আবার সুতা আমদানির পথ উন্মুক্ত করার ঘোষণা দেন। হয়তো সব সময় শতভাগ দাবি আদায় হবে না, তবে প্রতিবাদটি পেশাদারত্ব ও যুক্তির সঙ্গে পৌঁছে দেয়া জরুরি।

একই সঙ্গে সরকারের মানসিকতাও বদলানো প্রয়োজন। কোনো সরকারি নীতির বিরুদ্ধে কথা বললেই তাকে সরকারবিরোধী বা বিরোধী দলের ট্যাগ দেয়া ঠিক নয়। ব্যবসায়ীরা যে সব সময় শতভাগ ঠিক বলবেন তাও নয়, আবার সরকারের সিদ্ধান্তও সব সময় নির্ভুল নাও হতে পারে। তাই ধমক বা দমন-পীড়ন না করে উন্মুক্ত আলোচনার মাধ্যমে যেকোনো বিরোধ সমাধান করা উচিত, যা সরকার ও ব্যবসায়ী উভয়ের জন্যই কল্যাণকর।

তিন-চার দশকের দীর্ঘ ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা থেকে যদি আজ আবার শূন্য থেকে শুরু করতে হতো, তবে কোন খাতে বিনিয়োগ করতেন আর কোনটি এড়িয়ে যেতেন?

পোশাক খাতে প্রতিদিন যে পরিমাণ জটিলতা ও মানসিক চাপ সামলাতে হয়, তা চিন্তা করে মাঝে মাঝে নিজের মনেই এ প্রশ্ন আসে, আবার শুরু করলে কী করতাম? তখন হয়তো মনে হয়, এত জটিল ব্যবসায় না এসে সহজ অন্য কোনো খাত বেছে নিতাম। কিন্তু আবার যদি নিজের কাছে শতভাগ সৎ থাকি, তবে বলতে হয়, একজন সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ হিসেবে আজ যে অবস্থানে আসতে পেরেছি, তা এ পোশাক খাতের কল্যাণেই সম্ভব হয়েছে। যদি আবারো শূন্য থেকে শুরু করতে হয়, তবে পোশাক খাতেই বিনিয়োগ করতাম।

এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক হিসেবে সাধারণ ব্যবসায়ীদের উদ্দেশে আপনার বার্তা কী?

এফবিসিসিআইয়ের সদস্য এবং দেশের ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের প্রতি আমার বিনীত অনুরোধ থাকবে, ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীগত সব মতভেদ দূরে সরিয়ে রেখে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের স্বার্থে একটি সাধারণ প্লাটফর্মে সবাই একতাবদ্ধ হন। আমাদের সবার লক্ষ্য হওয়া উচিত একটি শক্তিশালী, গতিশীল এবং কার্যকরী এফবিসিসিআই গড়ে তোলা। কারণ এফবিসিসিআই হলো দেশের সব ব্যবসায়ীর মূল মুখপাত্র। তাই এফবিসিসিআইয়ের নির্বাচন সুষ্ঠু, স্বচ্ছ ও সার্বজনীনভাবে গ্রহণযোগ্য হওয়া প্রতিটি ব্যবসায়ীর জন্য জরুরি। কে জয়ী হলেন বা পরাজিত হলেন, তার চেয়ে নির্বাচনটি কতটা নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য হলো, সেটিই আসল।

আরও